নারী হয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বামী আর সংসার নিয়ে সুখের একটা ঘর বাধবেন। কিন্তু ভাগ্যে যেন তা নেই!
কথাগুলো ঢাকার দোহার উপজেলার পালামগঞ্জ এলাকার আব্দুর রহিমের মেয়ে সীমা আক্তারের। নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন ২০০২ সালে পরিবারের সম্মতিতে পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রবাসী এক ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। বিয়ের দুবছরের মধ্যে ঘর আলো করে জন্ম হয় কন্যা সন্তানের। ২০০৭ সালে এক পুত্র সন্তানের আগমন ঘটে তাদের সংসারে। যে ঘরে দুটি সন্তানের জন্ম সেখানে শুধুই সুখের বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি! বিয়ের পর থেকেই সামান্য বিষয়াদি নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকত। পারিবারিকভাবে একাধিকবার মীমাংসার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টাও করা হয়। কিন্তু কাজ হয়নি। স্বামীর আচরণে তার কোমল হৃদয় বার বার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।
সীমার গায়ের রং কালো বলে খোঁটা দেয় স্বামী। অমানসিক যন্ত্রণা তাকে নানাভাবে পীড়া দিতে থাকে, যা অসহ্য যন্ত্রণায় রূপ নেয়। নিরুপায় সীমা ২০১৮ সালে ১৬ বছরের সংসার জীবনের ইতি টেনে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। বাবা ও ছোট ভাইয়ের তেমন কোনো আয় না থাকায় পরিবারে বোঝা হয়ে থাকতে হয়। এদিকে ১৮ বছর পর্যন্ত ২ সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্ব পড়ে সীমার ওপর। ডিভোর্সের পর সীমা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। প্রতিবেশী বান্ধবী রুপা একসময় সীমাকে পরামর্শ দেয়, এভাবে ঘরে বসে না থেকে কিছু একটা করার জন্য। রুপার পরামর্শে দোহার উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিনের কাছে গিয়ে সীমা তার সমস্যার কথা জানান। তখন তিনি ৩ মাসের বিউটিফিশন কোর্সে ভর্তির পরামর্শ দিলে সীমা ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু করেন। সীমার মনোবল দৃঢ় হতে থাকে। বিষণ্নতা কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে থাকে সে। ট্রেনিং সম্পন্ন করে জয়পাড়া কলেজ মার্কেটে বিউটিফিকেশনের ওপর একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন। এখন নিয়মিত সময় দেন সেখানে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ভর্তি হন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন সীমা উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করছেন।
একটা সময়ে সন্তানরা মাকে ছেড়ে চলে যায় বাবার কাছে। তখন আরও একা হয়ে পড়েন সীমা। সন্তানরা মায়ের কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়ার কষ্টকে বুকে চেপে রাখেন। সীমা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান।
নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানের আয় দিয়ে ভালোভাবেই চলতে পারছেন এখন। এখন তিনি আর পরিবারের বোঝা নন।
সীমা এ বছর উপজেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে অদম্য নারী হিসাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবন সংগ্রামে জয়ী নারী ক্যাটাগরিতে এ বছর অদম্য নারী পুরস্কার তার হাতে তুলে দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাঈদুল ইসলাম।
সীমা বলেন, ‘মানুষ সংসার ঘিরে অনেক স্বপ্ন দেখে। আমিও দেখেছিলাম! কিন্তু সে স্বপ্ন সত্যি হয়নি। আমি নতুন করে বাঁচতে চাই, তবে আমার মতো করে। দীর্ঘ ১৬ বছরের সংসার জীবনে সুখ স্মৃতি বলতে কোনো কিছু ছিল না। আমি যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি তার উপার্জিত আয় থেকে নির্যাতিত ও অসহায় নারীদের কল্যাণে কাজ করতে চাই।’
উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা সাবরিনা লাকী বলেন, ‘সীমা একজন ধৈর্যশীল নারী। সে জীবনে অনেক কষ্ট করেছে। সেজন্য আমরা তাকে ২০২৫ সালের উপজেলার শ্রেষ্ঠ নির্যাতিত অদম্য নারী হিসাবে নির্বাচিত করেছি। সীমা জীবনকে উপলব্ধি করে সামনের দিকে দিকে এগিয়ে যাক।’








