জাতীয় নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সব দলের চোখ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত না হলেও সম্ভাব্য রোডম্যাপ অনুযায়ী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তফসিল ঘোষণা হতে পারে। এজন্য ভেতরে ভেতরে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিটি রাজনৈতিক দল। ক্ষমতাসীন বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের বিজয়কে মাঠপর্যায়ে সুসংহত করতে চায়। তবে নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ায় এবং রোডম্যাপ চূড়ান্ত না হওয়ায় এখনই কাউকে সমর্থন দিচ্ছে না দলটি। তফসিল ঘোষণার পরই চূড়ান্ত হবে প্রার্থী তালিকা। যদিও প্রায় প্রতিটি এলাকায় একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী তোড়জোড় শুরু করায় কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে কিছুটা অনৈক্য। জামায়াতে ইসলামী অবশ্য এক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে। এক বছর আগে থেকেই প্রার্থী অঘোষিতভাবে চূড়ান্ত করে মাঠে নামিয়েছে দলটি। আটটি সিটিতে প্রস্তুত তাদের মেয়র প্রার্থীর নাম। তবে সরকার নির্বাচন না দিয়ে সর্বত্র প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় ক্ষুব্ধ তারা। তরুণদের দল এনসিপিও এককভাবেই লড়বে। সাংগঠনিক ভিত্তি তৃণমূল পর্যন্ত মজবুত করতেই তাদের এ কৌশল। ইতোমধ্যে পাঁচ সিটিতে মেয়র এবং শতাধিক উপজেলা-পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। যদিও ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ ও সাদিক কায়েমকে ঘিরে জামায়াতের সঙ্গে তৈরি হয়েছে নীরব দ্বন্দ্ব। আর নির্দলীয় নির্বাচনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কৌশলে ভোটের মাঠে ফিরতে মরিয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারাও।

তফসিলের পর চূড়ান্ত হবে বিএনপি প্রার্থী

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে সম্ভাব্য রোডম্যাপ অনুযায়ী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে নির্বাচনি কর্মযজ্ঞ শুরু হওয়ার কথা। আইন অনুযায়ী এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়। তাই আইনগতভাবে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করার সুযোগ থাকছে না। জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর মাঠপর্যায়ে দলের অবস্থান সংহত করতে ভেতরে ভেতরে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। তবে নির্বাচনি রোডম্যাপ চূড়ান্ত না হওয়ায় এখনই কাউকে দলীয় সমর্থন দেবে না দলটি। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, তফসিল ঘোষণার পরই চূড়ান্ত করা হবে প্রার্থী তালিকা। এরপর স্থানীয়ভাবে একক প্রার্থীতে সমর্থন দেবে দলটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আসন্ন সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একক প্রার্থীকে সমর্থন দিতে মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন দায়িত্বশীল নেতারা। কুরবানির ঈদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের শোডাউনের পর নানা হিসাব-নিকাশ করছেন তারা। ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ জটিলতা এড়াতে এবার দলের ত্যাগী এবং পরিচ্ছন্ন নেতারাই মনোনয়নে অগ্রাধিকার পাবেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য যুগান্তরকে জানান, আগে থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইস্যুতে প্রস্তুতি নেওয়া আছে। নানা কারণে এখনই প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করতে চান না নীতিনির্ধারকরা। তারা বলছেন-তফসিল ঘোষণা হলে আইনি বিধিবিধান মেনে দলীয় প্রার্থী নির্ধারণ বা সমর্থন করা হবে। ফ্যাসিবাদ আমলে ত্যাগী ও এলাকায় জনপ্রিয় নেতাদের এক্ষেত্রে মূল্যায়ন করা হবে।

তারা এমনটাও বলছেন, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। এছাড়া নির্দলীয় নির্বাচন উপহার দিতে চাচ্ছে সরকার। বিএনপি ক্ষমতাসীন দল হওয়ায় বর্তমানে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। সেক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে প্রার্থী ঘোষণা করা নাও হতে পারে। তবে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার আগেই সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করবে বিএনপি। এখন পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইস্যুতে কেন্দ্র থেকে কোনো বার্তা পায়নি তৃণমূল। নেতাকর্মীরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ এলাকায় কাজ করছেন। পোস্টার-ফেস্টুনের মধ্য দিয়ে প্রার্থিতার পূর্বাভাস দিচ্ছেন এবং অঘোষিতভাবেই প্রচারণা চালাচ্ছেন। স্থানীয় সরকার বিভাগে দলীয়ভাবে নিযুক্ত প্রশাসকদের অনেকেই নির্বাচনি প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন যুগান্তরকে।

বর্ষা মৌসুমের পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ১৬ জুন জাতীয় সংসদে তিনি বলেছেন, ‘আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।’ মন্ত্রী বলেন, ‘বাজেট প্রাপ্যতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে নির্বাচনগুলো হবে। এক্ষেত্রে প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে অন্য নির্বাচন হবে। নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও একই সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।’ পরে ৩০ জুন সংসদে মন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন এরইমধ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছে।

জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ-সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু যুগান্তরকে বলেন, ‘গত ১৫ বছর ধরেই আমাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে। মাঝে কিছুদিন নির্বাচন না হওয়ায় একটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। যেহেতু বিএনপি এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে, তাই নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে আছি। এখন সরকার নির্বাচন ঘোষণা করলেই আমরা অংশ নিতে তৈরি। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচনগুলো হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।’

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে আমার। জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছি।’

সারা দেশের ন্যায় ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রস্তুতি শুরু করেছেন। অনেকেই দলীয় অঙ্গসংগঠনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিংবা বিভিন্ন ব্যানারে এলাকার সামাজিক কর্মসূচি পালন করছেন। ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসকও আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান-এমন আলোচনা আছে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন স্থানীয় যুবদল নেতা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকায় কাজ করছি। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক না হলেও সাধারণ মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়েছি। এটা অব্যাহত থাকবে। প্রত্যাশা করি দল আমাকেই মূল্যায়ন করবে।’ ভোলা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মীরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কাজ করছেন। অনেকেই প্রার্থী হতে চান; এটাকে আমরা স্বাভাবিকভাবেই দেখছি। কেন্দ্রের নির্দেশনা পেলে একক প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।’ তিনি বলেন, কে নির্বাচন করবেন আর কে করবেন না, এটা দলই ঠিক করে দেবে।

তবে মাঠপর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াত ও এনসিপির আগাম প্রস্তুতি বিএনপিকে কিছুটা হলেও অস্বস্তির মুখে ফেলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির কয়েকজন ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জানান, জামায়াত এক বছর আগে থেকেই তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে কাজ করছে। অন্যদিকে বিএনপিতে প্রায় প্রতিটি এলাকায় একাধিক প্রার্থী তোড়জোড় শুরু করেছেন। ফলে কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অনৈক্য তৈরি হয়েছে যে, কে কার পক্ষে কাজ করবেন। শেষ পর্যন্ত কে দলীয় সমর্থন পান-তার অপেক্ষায় আছেন তারা। তবে ঐক্যবদ্ধ থাকলে সহজেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলেও মনে করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা।

সৎ ও যোগ্য প্রার্থী চায় জামায়াত

দেশের সব সিটি করপোরেশন, অধিকাংশ পৌরসভা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদসহ সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য অনানুষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে জামায়াতে ইসলামী। সারা দেশে প্রার্থী তালিকায় সৎ, যোগ্য ও মেধাবীদের সমর্থন দিয়ে এগিয়ে রাখতে চায় দলটি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণামতে আগামী ডিসেম্বর থেকে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন আরপিও সংশোধনসহ আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে, সরকার নির্বাচন না দিয়ে সর্বত্র স্থানীয় সরকারের প্রশাসক নিয়োগ করায় ক্ষুব্ধ জামায়াত। জামায়াতের হাইকমান্ডের ধারণা ছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেবে সরকার। কিন্তু তা না করে সবকটি সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদসহ সর্বত্র দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার।

ভিন্ন কৌশলে নির্বাচনের প্রস্তুতি : দলীয়ভাবে নির্বাচন না হলেও আটটি সিটি করপোরেশনে জামায়াত অঘোষিতভাবে তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের নাম প্রস্তুত করে রেখেছে বলে জানা গেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন দলের মহানগর উত্তর শাখার আমির সেলিম উদ্দিন। ঢাকা দক্ষিণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কয়েমের নাম চিন্তায় রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, গাজীপুরে তুরস্কের গাজী উসমান পাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান, বরিশালে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, রংপুরে মহানগর শাখার আমির এ টি এম আজম খান, খুলনায় কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান এবং নারায়ণগঞ্জে মহানগর শাখার আমির মোহাম্মদ আবদুল জব্বার। তারা ব্যক্তিগতভাবে মাঠে নির্বাচনি কার্যক্রমে যুক্ত আছেন।

জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই ঢাকা উত্তর সিটিতে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন তৎপর রয়েছেন। নানা ধরনের সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজ করছেন। ঢাকাকে গ্রিন এবং ক্লিন নগরী হিসাবে গড়ে তুলতে চান তিনি। প্রতিদিনই নানা কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেকে মেয়র প্রার্থী হিসাবেই পরিচয় দিচ্ছেন সেলিম উদ্দিন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে জামায়াত সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমকেও দেখা যাচ্ছে নানা কর্মসূচিতে। অন্যান্য সিটিতেও মেয়র প্রার্থীরা সক্রিয় রয়েছেন। জনগণের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

যদিও দল থেকে রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে এসব সিটি করপোরেশনে প্রার্থিতা নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা চলছে। দেশের ৩৩১টি পৌরসভা এবং দেশের অধিকাংশ উপজেলায় যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা হয়েছে। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান এবং মেম্বর পর্যন্ত প্রার্থিতা চূড়ান্ত পর্যায়ে রেখেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা বিভাগ থেকে জামায়াতের অধিকাংশ প্রার্থী বিজয় পেয়েছে। সে হিসাবে ওইসব এলাকায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা ভালো করবেন বলে মনে করছেন দলের কেউ কেউ।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সভাপতি ও দলের অন্যতম সহকারী জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম যুগান্তরকে বলেন, আমরা আশা করেছিলাম জাতীয় নির্বাচনের পরপরই পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়া হবে। কিন্তু আমরা আশাহত, দেশের জনগণ আশাহত। বিএনপি স্থানীয় সরকারের নির্বাচন না দিয়ে সর্বত্র প্রশাসক নিয়োগ দিচ্ছে। এটা গণতন্ত্র ধ্বংসের আলামত। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, এতে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকারগুলো জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই পরিচালনা করবেন। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে দলীয় লোকদের বিভিন্ন পর্যায়ে বড় বড় পদে বসাচ্ছে। এটা হলো গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয়করণের অপকৌশল। আমরা দলীয়ভাবে প্রশাসক নিয়োগের প্রতিবাদ জানিয়েছি। এখনো দাবি জানাই, দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার জন্য।

এটিএম মাছুম বলেন, দেশের সব সিটি করপোরেশনে জামায়াত চায় সৎ, যোগ্য নেতা নির্বাচিত হোক। ভালো প্রার্থীদের পাশে থাকবে জামায়াত। কিছু প্রার্থী মাঠে আছেন। নির্বাচনের গ্রাউন্ডওয়ার্ক বলতে যা বোঝায় তা তারা করছেন। উপজেলাগুলোতে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং পৌরসভাতে মেয়র, কাউন্সিলর পদে আমরা যোগ্য মেধাবী ও সৎ লোকদের প্রার্থী হিসাবে দেখতে চাই। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বর পর্যন্ত পরিচিত, গণমানুষের সেবায় নিয়োজিত লোকজনকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দেবে জামায়াত।

জোট ছাড়াই লড়বে এনসিপি

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটের অধীনে নয়, বরং এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলের সাংগঠনিক ভিত্তি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত মজবুত করতেই এই কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এখন পর্যন্ত আলাদা পথে হাঁটছে জামায়াত ও এনসিপি। দল দুটি ইতোমধ্যে আলাদাভাবে প্রার্থীও ঘোষণা করছে। এতে ১১ দলীয় জোটে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে ’ঐক্য’ হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।

এ প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, এনসিপি আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রতিটি স্তরে ব্যাপকভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন পর্যন্ত এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত আছে। এজন্য তৃণমূলে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও ঐক্যের ব্যানারে হোক কেউ কেউ চাচ্ছেন। আবার অনেকেই আলাদা নির্বাচনের পক্ষে মতপ্রকাশ করছেন। এ ব্যাপারে দুই দলের মধ্যে কার্যকর কোনো আলোচনা হয়নি। এখনো সময় আছে আলোচনায় বসার।

আসিফ মাহমুদ বলেন, একক নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসাবে ইতোমধ্যে অনেক প্রার্থী চূড়ান্ত করা হচ্ছে। আমরা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছি। পাঁচ সিটিতে প্রার্থীর নাম ঘোষণা হয়েছে। বাকি সাতটিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এছাড়া উপজেলা ও পৌরসভায় ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম শিগগির ঘোষণা করা হবে। আমরা মনে করি, একক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলের সক্ষমতা যাচাইয়ের পাশাপাশি তৃণমূলে পৌঁছার সুযোগ হবে। তিনি বলেন, সরকার শিগগির স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথা বললেও এখনো তারিখ ঘোষণা করেনি। তবে নির্বাচন কমিশন সম্ভবত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতিটি পদেই নির্বাচন করার নির্দেশনা দিয়েছি। এককভাবে মাঠে নামার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বাছাই প্রক্রিয়ায় থাকছে চমক : এনসিপি সূত্রে জানা যায়, সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউপি নির্বাচনে সদস্য পদেও প্রার্থী দেওয়া হবে। প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায়ও থাকবে চমক। বিএনপি কিংবা অন্যান্য দল থেকে বহিষ্কৃত কিংবা সরে দাঁড়ানো নেতারাও এনসিপিতে যুক্ত হচ্ছেন। নেতাদের নামও আসছে প্রার্থী তালিকায়। দলটির নেতারা মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা ভালো করতে পারবেন। ইতোমধ্যে ৩৩টি পৌরসভার মেয়র, ৬৭টি উপজেলার চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ঘোষণা হয়েছে। এসব এলাকায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। দ্রুতই আরও ১০০ উপজেলা-পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা হবে। নেতারা মনে করেন, মাঠপর্যায়ে এনসিপি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। বিভিন্ন দল থেকে অনেকেই এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন। এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব পদে থাকা এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দলে আনতে বিভিন্ন দলের প্রভাবশালী নেতাকে টার্গেট করা হচ্ছে।

সিটি নির্বাচনে নজর : এদিকে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন ঘিরে ১১ দলীয় জোটে চলছে নানা হিসাবনিকাশ। সম্ভাব্য প্রার্থী নির্ধারণ, জোটগত সমন্বয় এবং দলীয় কৌশলে নির্বাচন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। ঢাকা দক্ষিণে দুই দলের তরুণ দুই প্রার্থী আসিফ মাহমুদ ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে নিয়ে আলোচনা থাকায় অনেকটা নীরব দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে নেতাকর্মীদের মনে।

সাদিক কায়েমকে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী করতে চাইছে জামায়াত। কয়েক মাস আগে জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের দায়িত্বশীল সম্মেলনে প্রার্থী হিসাবে সাদিক কায়েমের নাম প্রস্তাব করা হয়। যদিও দলটির পক্ষ থেকে এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু আরও আগেই এনসিপির মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদকে ঢাকা দক্ষিণের প্রার্থী করা হয়েছে। তার পক্ষে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণাও চালাচ্ছে এনসিপি থেকে। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটিতে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব ও কুমিল্লা সিটির প্রার্থী হিসাবে জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলামের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

কী বলছেন নেতারা : কুমিল্লা সিটি মেয়র নির্বাচনে এনসিপির প্রার্থী তরিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমাদের প্রচার-প্রচারণা চলছে। স্থানীয়ভাবে সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আমরা মনে করেছিলাম নির্বাচিত সরকার এলে সব সমস্যার সমাধান হবে। আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন হবে। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি; বরং দিন দিন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েই চলেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে। ফলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনও আমাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিলে আমি মনে করি, প্রতিটি ইউনিটে এনসিপির সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির সাবেক শীর্ষ এক নেত্রী যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি মনে করি, এনসিপির শীর্ষ নেতারা জামায়াতের হয়েই কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। এনসিপি এখন পুরোপুরি ডানপন্থি একটি দল। দিনশেষে তারা জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচনেই যেতে পারে। এমনটা হলে এনসিপি থেকে আরও শীর্ষ নেতারা অব্যাহতি নেবেন।’