মৌলভীবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তার তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকায় স্থান পেয়েছেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী, তাদের স্বজন, প্রবাসী, ব্যবসায়ী, বিত্তবান ও কৃষিকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন-এমন ব্যক্তিরাও। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সহায়তা থেকে বঞ্চিত প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষিরা। অনিয়মের অভিযোগে জেলার কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলায় বঞ্চিত কৃষকরা প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি ও স্মারকলিপি দিয়েছেন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি পরিবারকে তিন মাসের জন্য মাসে ১৫ কেজি চাল ও তিন হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ কর্মসূচিতে মৌলভীবাজার জেলার ১২ হাজার ৩০১ জন কৃষককে চূড়ান্ত করা হয়। এর মধ্যে বড়লেখায় ৩০০, জুড়ীতে ১ হাজার ৩৩৬, কুলাউড়ায় ১ হাজার ৫৩৭, রাজনগরে ৩ হাজার ৩৬, সদরে ২ হাজার ৭৬৫, শ্রীমঙ্গলে ১ হাজার ৭৮৭ এবং কমলগঞ্জে ১ হাজার ৫৪০ জনের নাম রয়েছে। অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ৪ হাজার ২০০ হেক্টর বোরো জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ২৭ হাজার ৪৬৩ জন কৃষক প্রায় ৮০ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। গত ২৩ জুন কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ও ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নে সহায়তা বিতরণের পর অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। বঞ্চিত কৃষকদের দাবি, ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নে বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়া ও ইউপি সদস্য ছয়ফুল ইসলামের বিরুদ্ধে তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম করেছেন। তাদের অভিযোগ, তালিকায় দাউদপুর গ্রামের মো. মতিন মিয়ার নাম রয়েছে। তার দুই ছেলে ফ্রান্সে অবস্থান করছেন এবং অপর এক ছেলে সরকারি চাকরিতে কর্মরত। একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী জলিল মিয়া ও তার ভাই খালিক মিয়া, সাতরা গ্রামের নাদির মিয়ার এক ছেলে কানাডায় এবং অন্য ছেলে বিদেশে থাকেন। তারাও সহায়তা পেয়েছেন। এছাড়া ইউসুফ তৈয়বুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদ আহমদ এবং জামাল মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি বোরো মৌসুমে কোনো আবাদ না করলেও সহায়তা পেয়েছেন। অন্যদিকে বরমচাল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে খালেদ নামে এক ব্যক্তি বোরো জমি না থাকাসত্ত্বেও সহায়তা পেয়েছেন। একই ওয়ার্ডের ইমাম তরিকুল ইসলাম আকুল, সাবেক ইউপি সদস্য মহরম আলী এবং ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহিন আহমদ নাছির ও তার ভাই সেলিম আহমদও সহায়তা পেয়েছেন। কুলাউড়া রাউৎগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির সেক্রেটারি আব্দুল মুহিত চৌধুরী রিপন এবং ৫ ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক সালেহ আহমদ সেলিমের নামও রয়েছে। জুড়ী উপজেলার সাগরনাল ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আখলিস মিয়ার চাচাতো ভাই সয়ুব মিয়া, তার মেয়ে নিলিমা ইসলাম, ভাতিজা বাবুল আহমদ ও কমর উদ্দিন, শালা মো. সাজিদুর রহমান এবং ভাগনে বউ ফাহমিদা আক্তারের নাম তালিকায় রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন তারা কেউই কৃষক নয়। রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ ইউনিয়ন বিএনপির ২নং ওয়ার্ড সভাপতি মো. আবুল হোসেন, ৪নং ওয়ার্ড সভাপতি শরাফ উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমসহ এই ইউনিয়নে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর নাম রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছয়ফুল আলম বলেন, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়াসহ সংশ্লিষ্টদের কারণে অনেক প্রকৃত দরিদ্র কৃষক বঞ্চিত হয়েছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে আফতাব মিয়া বলেন, যাচাই-বাছাই কমিটি ৫১৮ জনের তালিকা করলেও বরাদ্দ এসেছে মাত্র ১৯০ জনের জন্য। সদর উপজেলার গিয়াসনগর ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করে বলেন, বিএনপির দলীয় নেতাকর্মীরাই তাদের পছন্দের লোকের নাম দিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তালিকা প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন মহলের চাপের কারণে নির্দেশনা অনুযায়ী তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ছাদু মিয়া বলেন, নিয়মবহির্ভূতভাবে যাদের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে, তাদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, তালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব এককভাবে কৃষি বিভাগের হাতে থাকলে এ ধরনের সমস্যা হতো না। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদুজ্জামান পাভেলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। শওকতুল ইসলাম শকু এমপি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।