গল্প কি শহীদুল জহির বলেন, না গ্রামের লোকেরা বলে? বারবারই দেখি, সুহাসিনী গ্রামের লোকেরা বলে যে আবদুল ওয়াহিদ বাঁচার জন্য ঘরের সিলিং বেয়ে ঘরের পাশের ডাবগাছে উঠে যায়। সে রাতে আবদুল ওয়াহিদ আততায়ীদের হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যায়। আবার গল্প বলতে থাকে দক্ষিণ মৈশুন্ডি, পদ্মনিধি লেন, র‍্যাংকিন স্ট্রিট, কলতাবাজার, লক্ষীবাজার বা ভূতের গলির মহল্লাবাসী; কী গল্প বলে মহল্লাবাসী? মহল্লাবাসী বলে, আবদুল করিম সারাদিন বসে ছিল স্যাঁতসেতে বারান্দায় কিংবা আবদুস সাত্তার বসে ছিল ব্যালকনিতে, একা। অর্থাৎ সামষ্টিক মানুষ গল্প বলছে পাঠকের কাছে, আমরা পাঠক। আমরাও একা ও সমষ্টি। সুহাসিনী গ্রামের লোকেরা কিংবা পুরান ঢাকার নারিন্দার ভূতের গলির মহল্লাবাসী—তারা সংখ্যায় অনেক; অনেকে মিলেই একটি গল্প বলছেন বা গল্প নির্মাণ করছেন। একটি গল্প শেষ করে আবার একটি গল্প বলছেন বা লিখছেন। একজন পাঠক যখন পড়ছেন, তখন তার মনে হতে পারে যে শুধু একজন শহীদুল জহির নন, অনেক মানুষ সম্মিলিতভাবে গল্পটি বলতে বলতে রচনা করছে। এতে করে গল্প বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে। আর গল্পের বিষয়-আশয় বা বাস্তবতার ডিটেইল এমন এক প্রায় নিখুঁত ভঙ্গিতে রচিত হচ্ছে, মনে হয়, মহল্লাবাসী বা সুহাসিনী গ্রামের লোকেরা কোনো একটি ঘটনা বা কোনো চরিত্রের গতিবিধি সামনে থেকে তাকিয়ে দেখছে, শুধু দেখাই নয়, উপলব্ধিও করে নিচ্ছে, তারপর তারা তা বলছে। তাদের হয়ে শহীদুল জহির লিখে দিচ্ছেন বা দিয়েছেন। মহল্লাবাসী ও গ্রামবাসী যে ঘটনা বা যেসব চরিত্র নিয়ে কথা বলছে—পুরো ব্যাপারটি দাঁড়িয়ে দেখছেন বা উপলব্ধি করছেন লেখক শহীদুল জহির নিজেও। অথবা এভাবে বলা যায়, মহল্লার লোকেরা বা গ্রামবাসী যা দেখল, যা ভাবল, যা করল, সবকিছুই দেখলেন শহীদুল জহির। শহীদুল জহির হয়তো গ্রামবাসী বা মহল্লাবাসীর মধ্যে ঘাপটি মেরে ছিলেন। মহল্লা বা গ্রামের লোকেরা সম্ভবত টেরই পায়নি যে তাদের মধ্যে একজন শহীদুল জহির পর্যবেক্ষণে বসে আছেন, তিনি সবকিছু দেখে যাচ্ছেন, উপলব্ধি করছেন, পরে নিজের বাসায় ফিরে গিয়ে গল্প লিখছেন; এবং সেসব গল্পের সামনে আমরা পাঠক, আমাদের সামনে মহল্লাবাসী, গ্রামবাসী, তাদের মধ্যে কোনো কোনো চরিত্র এবং এর লেখক শহীদুল জহিরও উপস্থিত আছেন; তাহলে পাঠক হিসেবে আমি বা আমরা কোথায় অবস্থান করছি? বিভ্রম হয়, আমিই কি সুহাসিনী গ্রামের বাসিন্দা, আমিও কি ভূতের গলির কেউ? নাকি আমিই কিছুটা শহীদুল জহির? এই রচনা পাঠ করার মুখোমুখি বসে, আপনি কে? আপনিও কি কিছুটা শহীদুল জহির? আপনিও ভূতের গলির কেউ কিংবা আপনি সুহাসিনী গ্রামের লোক! গল্প অথবা যদি বলি আখ্যান, এই আখ্যানের একজন লেখক আপনিও। আমি ভাবতে থাকি, আপনি দেখেছেন, এক ধুলাওড়া দিনে আবদুল ওয়াহিদ গ্রামে ফিরে এল। যখন সে গ্রাম ছেড়ে যায়, তখন সে যুবক এবং যখন সে বাইশ বছর পর গ্রামে ফিরে এল, তখন তার চেহারা ও জীবন ভেঙে গেছে। স্বপ্ন ভেঙে গেছে। কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে।

শহীদুল জহির
শহীদুল জহিরের চরিত্র আবদুল করিম নিঃসঙ্গ। ভূতের গলিতে শুয়ে–বসে থাকা ছাড়া যেন আর তার কোনো কাজ নেই। যদিও আবদুল করিম চায় বা মানুষই চায় মানুষের সঙ্গ। কিন্তু চাইলেই তো আর আজকের দিনের মানুষ মানুষের অপরাপর মানুষের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে পারবে না। আবদুল করিম কৌশল করে মানুষের সঙ্গ পেতে চায়। সে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে নিজেই কিছু কাগজ কিনে নেয় এবং সেই কেনা কাগজ আবার ফেরিওয়ালার কাছেই বিক্রি করে।

কোথায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙল, তার সঙ্গে বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার সুহাসিনী গ্রামের গ্রামীণ নকশাল আবদুল ওয়াহিদের জীবন ও স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার সম্পর্ক কী? অল্প বয়সে সশস্ত্র শ্রেণিসংগ্রামের লড়াইয়ে যারা রাজনীতিতে যুক্ত হয়, বিশেষ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই, সেই নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলে যুক্ত হয় আবদুল ওয়াহিদও। তখন সে সদ্য তরুণ। এবং বালিকা নূরজাহানকে পছন্দ করত, নূরজাহানও পরম আস্থা পেতে চেয়েছিল প্রেমিক চাচাতো ভাই ওয়াহিদের কাছে। একদিন নারকেলগাছের খোড়ল থেকে ওয়াহিদ এক সদ্য ফোটা পাখির বাচ্চা এনে দেয় নূরজাহানকে। বলে, ‘এই নে ময়নার ছাও, বড় হইলে কতা শিখাস...’—তারপর ওয়াহিদ চলে যায় সশস্ত্র শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতিতে। অনেক বছর বাড়িতে ফেরে না। এদিকে বাড়ির সবাই বলে, ‘নূরজাহান, এইডা ময়নার ছাও না, শালিখের ছাও।’ নূরজাহান ওয়াহিদকে বিশ্বাস করে শালিকের বাচ্চাকেই ময়নার বাচ্চা মনে করে পালন করতে থাকে। একদিন, শালিকের বাচ্চাটি তখন পরিপূর্ণ শালিক, নূরজাহান তাও মানতে পারে না, ওটা শালিক। ওটা হয়তো ময়নাই। নূরজাহানের বিয়ে হয়ে যায় ওয়াহিদের বাল্যবন্ধু স্কুল মাষ্টার আবুল হোসেনের সঙ্গে। সময় বদলায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। তখন গত শতাব্দীর আশির দশক অতিক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রাধান্য বিস্তারকারী সেই শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতিতেও ভাটা পড়ে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, ভাঙা চেহারায় আবদুল ওয়াহিদ এক ধুলাওড়া দিনে গ্রামে ফেরে প্রায় বাইশ বছর পর। বাড়িতে কিছুদিন নিঃসঙ্গতার মধ্যে ডুবে থাকলেও এইবার সে সত্য সত্য এক জোড়া ময়না ও একটি গোলাপের ডাল কিনে নিয়ে আসে। গোলাপের ডালের কলপ বাড়ির কাচারির সামনের মাটিতে পুঁতে দেয়। কারণ, এই গোলাপের ডাল মানুষের কথা বুঝতে পারে। ময়না পাখি দুটিকে দুটি আলাদা খাঁচায় রেখে কালো কাপড় দিয়ে ঘিরে দেয়। ময়না দুটিকে কথা শেখায় আবদুল ওয়াহিদ। এক ময়নাকে বলে, ‘ক্যান্দেন ক্যা?’ অন্য ময়না উত্তর দেয়, ‘সুখ নাই জীবনে।’  নিজের নিঃসঙ্গতা অর্থাৎ ব্যর্থ হয়ে ফেরা আবদুল ওয়াহিদ একজন নিঃসঙ্গ মানুষ। শহীদুল জহির ছিলেন অকৃতদার এবং পর্যাপ্ত নিঃসঙ্গ। পাঠক, আপনি যখন এই রচনায় চোখ রাখছেন, একবার ভাবেন, আপনিও কি একজন নিঃসঙ্গ মানুষ? সমষ্টির মধ্যে থেকেও একজন মানুষ, অন্তত এ সময়ের মানুষ, তার নিঃসঙ্গ হয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো পথ কি খোলা আছে চলমান জীবনযাপন ব্যবস্থায়?

শহীদুল জহিরের চরিত্র আবদুল করিম নিঃসঙ্গ। ভূতের গলিতে শুয়ে–বসে থাকা ছাড়া যেন আর তার কোনো কাজ নেই। যদিও আবদুল করিম চায় বা মানুষই চায় মানুষের সঙ্গ। কিন্তু চাইলেই তো আর আজকের দিনের মানুষ অপরাপর মানুষের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে পারবে না। আবদুল করিম কৌশল করে মানুষের সঙ্গ পেতে চায়। সে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে নিজেই কিছু কাগজ কিনে নেয় এবং সেই কেনা কাগজ আবার ফেরিওয়ালার কাছেই বিক্রি করে। একটা বাজার বাণিজ্যের ছলে মানুষের সঙ্গলাভ-বাসনা আর কি! কথা বলতে সুযোগ আসে মহল্লার অভিভাবকদের থেকেও। কারণ, তাদের বাচ্চারা মারামারি করে রক্তাক্ত হয়, সেই মারামারির অনুঘটক হিসেবে আবদুল করিমই একধরনের গুপ্ত-উদ্যোগ গ্রহণ করে। মানুষের সঙ্গ পেতে চায় নিঃসঙ্গ মানুষ।

নিঃসঙ্গতার কথাই যদি বলি, তাহলে ঝাঁপি খুলে তুলে আনতে পারি নিজেরই কিছু কথা। এই ঈদের রাতে, ঢাকায় তখন লোকজন খুব স্বাভাবিকভাবেই কম। কী করি কী করি অবস্থা! কোথায় যাই? বন্ধুরা তো প্রায় সবাই সংসারী। কার বাসায় যাই, কোথায় যাই ধরনের অবস্থা। ভাবলাম, শহীদুল জহিরের বাসায় যাই। যাব যে, তার সঙ্গে তো আমার পরিচয়ই নেই।

শহীদুল জহিরের লেখায় নিঃসঙ্গ মানুষ খুব শক্তিশালী চরিত্র হিসেবে হাজির হয়েছে। আবদুল আজিজ ব্যাপারী একটি চরিত্র, ভূতের গলির বাসিন্দা। পুরো বাড়িতেই একা বাস করে। অবশ্য মাঝেমধ্যে তার কাছেও মহল্লাবাসী আসে। সম্ভবত নিঃসঙ্গতার ঘেরাটোপ থেকে বের হওয়ার জন্য আজিজ ব্যাপারী ও মহল্লাবাসী মিলিত হয়ে অথবা যার যার মতো একটা গল্পের ঘোর তৈরি করে, তাদের গল্পে বারবার সুবোধ-স্বপ্না নামের দম্পতি আসে আর ব্যাপারীর বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে বসবাস শুরু করে এবং তারা অর্থাৎ সুবোধ-স্বপ্নারা উঠানের কুয়ায় ডুবে মারা যায় কিংবা সুবোধ-স্বপ্না নামের কেউ কোনোদিন আসেইনি ভূতের গলিতে বা আবদুল আজিজ ব্যাপারীর বাড়িতে; কিন্তু আমরা দেখেছি, তারা এসেছিল এবং ইতিহাসের তিনটি আলাদা আলাদা সময়ে, আকস্মিক কুয়ার মধ্যে পড়ে মারা গিয়েছিল কিংবা তাদের হত্যা করা হয়েছিল—এসব আখ্যান কি সত্যি? নাকি আবদুল আজিজ ব্যাপারী বা শহীদুল জহিরের নিঃসঙ্গতা দূর করার উপায় বিশেষ! উঠানের যে কুয়ার মধ্যে ইতিহাসের তিনটি আলাদা আলাদা সময়ে তিন জোড়া দম্পতি, তিন জোড়া সুবোধচন্দ্র দাস ও স্বপ্নারানী দাস মরে গেল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা দেখলাম কী? উঠানে কোনো কুয়াই ছিল না। কুয়া নেই, তাহলে সুবোধ-স্বপ্না গেল কোথায়? মহল্লাবাসী বলে, ‘সব বানাইন্না গল্প। হালারপুত গল্পের হুগার ভিত্রে হান্দাইছে!’

হ্যাঁ, শহীদুল জহিরের লেখায় প্রচুর গালি পাওয়া যায় চরিত্রদের সংলাপে। পুরান ঢাকায় আদতে ওগুলো যতখানি গালি, তার চেয়ে বলা ভালো, জনভাষা। জনভাষার ব্যবহারে আখ্যান শক্তিশালী হয়। শহীদুল জহিরও সেটি করেছেন।

বলছিলাম, শহীদুল জহিরের আখ্যানে নিঃসঙ্গ মানুষ শক্তিশালী হয়ে ধরা পড়েছে। একেবারে নিজের মতো একটা বুননশৈলীই শহীদুল জহিরের গদ্যভাষাকে বাকি কথাসাহিত্যিকের থেকে আলাদা করেছে। দারুণ মনোগ্রাহী করেছে। ভাষা-বর্ণনায় বারবার পাঠের স্বাদু উপযোগিতা তৈরি করেছে। আধুনিক মানুষ বা ‘মানুষ মূলত একা’; এটা নিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে জহিরের লেখায়।

নিঃসঙ্গতার কথাই যদি বলি, তাহলে ঝাঁপি খুলে তুলে আনতে পারি নিজেরই কিছু কথা। এক ঈদের রাতে, ঢাকায় তখন লোকজন খুব স্বাভাবিকভাবেই কম। কী করি কী করি অবস্থা! কোথায় যাই? বন্ধুরা তো প্রায় সবাই সংসারী। কার বাসায় যাই, কোথায় যাই ধরনের অবস্থা। ভাবলাম, শহীদুল জহিরের বাসায় যাই। যাব যে, তার সঙ্গে তো আমার পরিচয়ই নেই। শুধু তাঁর গল্প বা উপন্যাস পড়েছি। বারবার পড়েছি। একদিন শহীদুল জহিরের অফিশিয়াল ফোন নম্বরে কল করেছিলাম। যিনি ফোন ধরেন, তাকে বলি, ‘হ্যালো, আমি শহীদুল জহিরকে চাচ্ছি।’ ফোনের ওপার থেকে জানতে চান, ‘কোন শহীদুল জহির?’

এখন মনে হচ্ছে, না, কোনো ঈদের রাতে আমি বেইলিতে যাইনি, শহীদুল জহির নামেও কারও সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি, আমাদের দেখা হবেও না আর কোনোদিন। যেনবা শহীদুল জহিরের গল্পেরই এক ভঙ্গিতে বেঁচে আছি। সত্যি কি বেঁচে আছি আমি বা আমরা? সিক্সটিজে আছি? নাইনটিজে আছি? নাকি এই ২০২৬ সালেই আছি?

বলি, ‘লেখক শহীদুল জহির।’

‘শহীদুল জহির বলে এখানে কেউ চাকরি করেন না।’

এরপর ফোনে আর কথা আগায়নি। ফোন কি আমি ভুল মানুষকে করেছি? এবং সামনাসামনি আমি তাঁকে দেখিনি কখনো। মুখটা চিনি, বইয়ের ফ্ল্যাপের ছবি থেকে। এইটুকু সম্বল করেই এক ঈদের রাতে বেইলি রোডের সরকারি আবাসনে, ছয়তলায়, দরজায় কড়া নাড়ি। চারদিকে ঈদের গমগমানি শব্দ। শহীদুল জহির কি এই রাতে তাঁর বাসায় থাকবেন? কোনো ফোন বা নোটিশ তো করিনি আগে থেকে। তারও আগে, কখন আমি প্রথম শহীদুল জহিরের গল্প পড়ি? রাজশাহী থেকে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক গদ্যকাগজ প্রাকৃত প্রকাশ করলেন,  সেখান থেকে ১০ কপি প্রাকৃত পাঠালেন আমার তখনকার খুলনার ঠিকানায়। আমি বন্ধুদের কাছে ৯ কপি বিক্রি করে দিলাম। প্রাকৃততেই প্রথম পড়ি ডুমুরখেকো মানুষের গল্প, লেখকের নাম শহীদুল জহির। তারপর তো ঢাকায় চলে আসি। কিন্তু শহীদুল জহিরকে কোত্থাও দেখা যায় না। হয়তো নাইনটিজে বসেই তিনি সিক্সটিজে আত্মগোপন করেছেন।

তো ছয়তলা ভবনের নিচে দারোয়ানকে যখন বলি, ‘এই বিল্ডিংয়ে কি শহীদুল জহির থাকেন?’ প্রৌঢ় দারোয়ান উল্টো আমাকেই প্রশ্ন করেন, ‘কোন শহীদুল জহির?’ বললাম, ‘ওই যে লেখক। যুগ্ম সচিব বা ওই টাইপের কিছু, আমলা।’

দারোয়ান আমাকে কিছুটা বিস্মিত করেই, প্রশ্ন করার ভঙ্গিতেই উত্তর দেন, ‘ওহ্! অকৃতদার শহীদুল জহির?’

এইটা ঠিক, আমি দারোয়ানের মুখে ‘অকৃতদার শহীদুল জহির’ শুনব, এমনটা ভাবিনি। মজা পেলাম। তো আমি ছয়তলার দরজায় কড়া নাড়ি, ভাবছি শহীদুল জহির তো এক্ষুনি বের হবেন, আমাকে কি সহজভাবে নেবেন? তাছাড়া আগে থেকে কোনো ফোনও করে আসিনি।

ঈদের রাতের চাকচিক্যময় পরিবেশ আমলাপাড়া বেইলি রোডে। তুলনামূলক চুপচাপ এই ছয়তলা। দরজা খুললেন আবদুল করিম কিংবা আবদুস সাত্তার কিংবা আবদুল আজিজ ব্যাপারী বা আবদুল ওয়াহিদ কিংবা আবদুল মজিদ বা মফিজুদ্দিন। বললাম, ‘আপনিই তো শহীদুল জহির?’

মাথা নাড়লেন, তিনি আমাকেও চিনলেন। বললাম, ‘আমি আপনার ছবি দেখেছি বইয়ের ফ্ল্যাপে, গোঁফ ছিল, এখন নেই।’ ‘আপনি আমাকে চিনলেন কীভাবে?’ শহীদুল জহির বললেন, ‘পত্র–পত্রিকায় আপনার ছবি দেখেছি।’

মনে রাখতে হবে, যে ঈদের রাতে আমি শহীদুল জহিরের বাসায় উপস্থিত, তখনো গুগল-ফেসবুক-ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাপারটাই ছিল না। হতে পারে, ২০০০ সাল বা ২০০১ সালের কথা। কাজেই কেউ কাউকে দেখেই হুট করে চিনে ফেলার সুযোগ আজকের মতো ছিল না তখন। ঘণ্টা তিনেক আমাদের আড্ডা চলল। আমাদের কথাবার্তার গন্তব্য মূলত তাঁর লেখা চরিত্রদের দিকে ধাবিত তখন। আমার বন্ধুদের কথা জিজ্ঞাসা করেন তিনি, বন্ধুদের কার কার লেখা আমার কেমন লাগে, জানতে চান। কিন্তু ঘুরে ফিরে আমি হয়তো ঢুকে পড়ি সে রাতের পূর্ণিমায়, জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতায়, মুখের দিকে দেখি’তে বা আগারগাঁও কলোনির দিকে, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ইতিহাসের দিকে বান্দরের দুধ খাওয়া পোলা চান মিয়ার দিকে বা নয়নতারার দিকে। নয়নতারা নামে একটি শক্তিশালী নারী চরিত্র আছে সে রাতের পূর্ণিমাতে।

এখন মনে হচ্ছে, না, কোনো ঈদের রাতে আমি বেইলিতে যাইনি, শহীদুল জহির নামেও কারও সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি, আমাদের দেখা হবেও না আর কোনোদিন। যেনবা শহীদুল জহিরের গল্পেরই এক ভঙ্গিতে বেঁচে আছি। সত্যি কি বেঁচে আছি আমি বা আমরা? সিক্সটিজে আছি? নাইনটিজে আছি? নাকি এই ২০২৬ সালেই আছি?

বাংলা ভাষায় শহীদুল জহিরের চেয়ে শক্তিশালী লেখক এই মুহূর্তে হাজির করতে পারবে কেউ বা হরেদরে গল্প-উপন্যাস লিখিয়েরাও কেউ কি শহীদুল জহিরের মতো গদ্যভাষাকে নিজের আয়ত্বে এনে ব্যবহার করতে পারার ক্ষমতায় পৌঁছেছেন? পারলে এটা পেরেই দেখাতে হবে। বয়ানের মহাজনী ও যুগপত ফাঁপা বাগাড়ম্বর নয়, এটা করে দেখাবার, লিখে দেখাবার প্রশ্ন। বাংলা ভাষায়, সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির—এই বাক্যকে অস্বীকার করবেন, এমন কী আছে কার ঝুলিতে?

বলছিলাম, শহীদুল জহিরের গল্প বা আখ্যান কি শহীদুল জহিরই বলেন, নাকি সম্মিলিতভাবে গ্রামের লোকেরা বলে? সেই আখ্যান বা গল্পকথা লোকশ্রুতির মতো হয়ে ওঠে দিনে দিনে। লোকশ্রুতির মধ্যে একটুআধটু মিথ মিথ রূপকল্প দানা বাঁধে। নাকি নারিন্দায়, যেখানে জহিরের জন্ম, সেই ভূতের গলির লোকেরা গল্প বলে? না, যে পাঠক গল্পটি পড়তে থাকেন, গল্পটি তাঁর দেখা গল্প হয়ে যায়? তখন গল্পটি কি তাঁরই গল্প? আখ্যান কি তারই আখ্যান? জনপদের আখ্যান? জনপদের গল্প? জনসমষ্টির গল্প? এমন করে নির্মাণ করেন, মারাত্মক শক্তিশালী আখ্যান রচয়িতা শহীদুল জহির। ভাষার বুনন একেবারে তাঁর নিজের মতো, যা অন্য কারও সঙ্গে মিলবে না। দারুণ ভঙ্গি। চরিত্রদের ভেতরে তিনি নিজে যেভাবে প্রবেশ করেন, পাঠককেও তাঁর সঙ্গে প্রবেশ করিয়ে নেন। এ এক মজার খেলা। আলালের ঘরের দুলাল থেকে বঙ্কিম হয়ে ত্রিশের তিন বাড়ুজ্য বা মানিক-তারাশঙ্কর-বিভূতি হয়ে তো দেশভাগ, তারপর কমলকুমার, অমিয়ভূষণ বা এদিকে ওয়ালীউল্লাহ-হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক-ইলিয়াস-মাহমুদুল হক-কায়েস আহমেদ; বাংলা ভাষার সম্পদ তারা। অতঃপর দেখি, বাংলাদেশে, বাংলা ভাষায় শহীদুল জহির একদম নতুন দিগন্তের কথক। তাই তাঁকে নিয়ে তর্কবিতর্কও থেমে নেই। বাংলা কথাসাহিত্যকে একটা অভিনব উচ্চতায় রেখে গেলেন তিনি, আমি চাই, কেউ তাঁকে অতিক্রম করুক। কেউ লিখে শহীদুল জহিরকে অতিক্রম করলে বাংলা সাহিত্যেরই ভান্ডার সমৃদ্ধ হবে। তবে লেখালেখি ব্যতিরেকে একজন বড় লেখককে শুধু বয়ান করেই খারিজ করা যায় কী? তাহলে তো স্মর্তব্য সেই অমর বাণী, 'বরং নিজেই তুমি লেখো নাকো একটি কবিতা—' লিখে প্রমাণ করো যে, তুমি পারো।

শহীদুল জহির অনূদিত হচ্ছেন ইংরেজিতে। সেই সূত্রে অন্য ভাষার পাঠকেরাও তাঁকে ছুঁতে পারছেন বা বুঝতে পারছেন। দিন শেষে লেখা উপস্থিত থাকে পাঠকের সামনে। মুখে মুখে তো ফুঁ মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় যেকোনো কিছুকেই, করে দেখানোর যোগ্যতা সবার অর্জনে আসে না, শহীদুল জহিরের ভেতরে সেই যোগ্যতা বিদ্যমান। তিনি যে নতুন দিগন্তের গদ্যভাষার কারিগর, নির্মাণ করেই তা দেখিয়েছেন। দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তাঁর রচনাশৈলীতে।

শহীদুল জহিরের গল্প-উপন্যাস বা আখ্যানের চরিত্রেরা মূলত সমাজের প্রান্তিকবর্গের বাসিন্দা। কখনো তারা শহরের বস্তির বাসিন্দা, কখনো মহল্লার খুবই সাধারণ মানুষ বা সুহাসিনী গ্রামের সাধারণ মানুষ। তবে ১৯৭১–এর মুক্তিযুদ্ধ বড় ফ্যাক্টর হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে শহীদুল জহিরের বিভিন্ন লেখায়। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ এই জনপদের সবচেয়ে বড় ও রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র রাজনৈতিক ঘটনা। সবচেয়ে আত্মত্যাগী ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতায় অনেক ক্ষতি মেনে নিতে হয়েছে প্রায় সমগ্র জাতিকেই। যুদ্ধের সময়ের বাঙালির অসহায়ত্ব যেমন খুঁটে খুঁটে তুলে এনেছেন শহীদুল জহির, অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজাকারদের চরিত্র চিত্রণেও যথেষ্ট মনোযোগিতা দেখিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ তো শহীদুল জহির নিজেই দেখেছেন, কারও কাছে শোনা গল্প লেখেননি। বাংলাদেশ যেমন মুক্তিযোদ্ধার লড়াইয়ের ইতিহাসের গর্বের আনন্দ-বেদনার দেশ, আবার যুদ্ধের সময় অখণ্ড পাকিস্তান-বাসনা ও ধর্মের জিগির তুলে, পাকিস্তানিদের দোসর হয়ে চরম মানবতা-বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত  থাকা রাজাকার-বাস্তবতাও সেই ইতিহাসের অনিবার্য অংশ। স্বাধীন দেশে, দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের বাস্তবতায় অনেকেই বর্তমানে রাজাকারগিরির প্রতি সমর্থন করা প্রসঙ্গে প্রকাশ্যতঃ অস্বস্তিবোধ করেন। কেন করেন? কী এর হেতু?

হতে পারে, নৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের কারণেও, কেউ কেউ শহীদুল জহিরের লেখ্যশিল্পকর্মের প্রাপ্য মান্যতা দিতে নারাজ। অথচ, সময়ের অগ্রসর পাঠক ক্রমশ শহীদুল জহিরের আখ্যানে বুঁদ হয়ে উঠছেন। অনূদিত শহীদুল জহির বহির্বিশ্বের অন্য ভাষার পাঠকের মুখোমুখি ছড়িয়ে পড়ছেন তাঁর রচনার শক্তিতেই। বাংলা ভাষায় শহীদুল জহিরের চেয়ে শক্তিশালী লেখক এই মুহূর্তে হাজির করতে পারবে কেউ বা হরেদরে গল্প-উপন্যাস লিখিয়েরাও কেউ কি শহীদুল জহিরের মতো গদ্যভাষাকে নিজের আয়ত্বে এনে ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতায় পৌঁছেছেন? পারলে এটা পেরেই দেখাতে হবে। বয়ানের মহাজনী ও যুগপত ফাঁপা বাগাড়ম্বর নয়, এটা করে দেখাবার, লিখে দেখাবার প্রশ্ন।

বাংলা ভাষায়, সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির—এই বাক্যকে অস্বীকার করবেন, এমন কী আছে কার ঝুলিতে?