সেরা ফুটবলারের পরিচয় গোলসংখ্যায় আটকে থাকে না। কেউ কেউ ম্যাচের গতি বদলে দেন, অদৃশ্য ছোঁয়ায় পুরো লড়াইয়ের চিত্র পালটে দেন। ইউরি টিলেমান্স সেই বিরল ঘরানার ফুটবলার, যার প্রভাব পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বড়।

১৯৯৭ সালের ৭ মে বেলজিয়ামের সিন্ট-পিটার্স-লেউ শহরে জন্ম তার। অল্প বয়সেই ফুটবল হয়ে ওঠে তার অনুভূতি প্রকাশের ভাষা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি সব সময় নিজের খেলাটা আরও ভালো করার চেষ্টা করেছি। অন্য মিডফিল্ডারদের খেলা দেখতাম, তাদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করতাম।’

সেই শেখার পথই তাকে পৌঁছে দেয় আরএসসি অ্যান্ডারলেখটের একাডেমিতে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক। ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলা সবচেয়ে কম বয়সি বেলজিয়ানদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি। চার মৌসুমে অ্যান্ডারলেখটের হয়ে ১৮৫ ম্যাচে ৩৫ গোল করেন। জেতেন দুটি লিগ শিরোপা। ২০১৭ সালে পান বেলজিয়ামের বর্ষসেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি। বয়স কম হলেও তার খেলার পরিণতিবোধ ছিল বিস্ময়কর।

প্রতিভার নতুন পরীক্ষার জন্য পাড়ি জমান মোনাকোতে। এই অধ্যায়টা খুব সহজ ছিল না। মোনাকোর জার্সিতে ৬৫ ম্যাচ খেলে গোল করতে পেরেছিলেন মাত্র ছয়টি।

তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ইংল্যান্ডে। লেস্টার সিটিতে যোগ দিয়েই যেন নিজেকে নতুন করে খুঁজে পান টিলেমান্স। মাঝমাঠের প্রাণ হয়ে ওঠেন তিনি। পাঁচ মৌসুমে ১৯৫ ম্যাচে করেন ২৮ গোল, তৈরি করেন অসংখ্য সুযোগ। সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত আসে ২০২১ সালের এফএ কাপ ফাইনালে। চেলসির বিপক্ষে দূরপাল্লার দুর্দান্ত এক শটে এনে দেন লেস্টার সিটির ইতিহাসের প্রথম এফএ কাপ শিরোপা।

২০২৩ সালে শুরু হয় নতুন যাত্রা, অ্যাস্টন ভিলায়। এখানেও মাঝমাঠের ছন্দের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন তিনি। ক্লাবটির হয়ে ৯০টির বেশি ম্যাচ খেলেছেন। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা ও প্রিমিয়ার লিগে নিজের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করেছেন দলকে। নিজের উন্নতি প্রসঙ্গে টিলেমান্স বলেছেন, ‘আমি মনে করি, লেস্টারের সময়ের চেয়ে এখন আমি আরও পরিণত ফুটবলার। বয়সের সঙ্গে যেমন শিখেছি, তেমনই প্রতিটি মৌসুম আমাকে আরও ভালো খেলোয়াড় বানিয়েছে।’

দূরপাল্লার নিখুঁত পাস, দুই পায়ে সমান দক্ষতা এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডারদের একজন করে তুলেছে। ঝুঁকি নিতে তিনি কখনো পিছিয়ে যান না। তার ভাষায়, ‘আমি সব সময় সামনের দিকে পাস দেওয়ার সুযোগ খুঁজি। কখনো বল হারাব, সেটাও জানি। কিন্তু ঝুঁকি না নিলে ম্যাচ বদলে দেওয়ার পাসও দেওয়া যায় না।’

বয়সভিত্তিক প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ২০১৬ সালে অভিষেক হয় বেলজিয়াম জাতীয় দলে। তখন কেভিন ডি ব্রুইনা, এডেন হ্যাজার্ড ও রোমেলু লুকাকুদের নিয়ে বেলজিয়ামের ‘সোনালি প্রজন্ম’ নিজেদের সেরা সময় কাটাচ্ছিল। সেই তারকাখচিত দলে টিলেমান্স হারিয়ে যাননি। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দলের অন্যতম নির্ভরতার নাম। ২০১৮ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের ঐতিহাসিক তৃতীয় স্থান অর্জনের দলের সদস্য ছিলেন তিনি। খেলেছেন ইউরো, বিশ্বকাপ। গত বছর পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে ৮০টির বেশি ম্যাচ খেলেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল করেছেন, করিয়েছেন অসংখ্য গোল। পরে তার হাতেই তুলে দেওয়া হয় জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব, যা তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।

২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচটি যেন তার পুরো ক্যারিয়ারের প্রতিচ্ছবি। বেলজিয়াম যখন ২-০ গোলে পিছিয়ে, তখনও হাল ছাড়েননি তিনি। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে প্রথমে সমতাসূচক গোল করেন, এরপর অতিরিক্ত সময়ের শেষদিকে জয়সূচক পেনালটি গোলে বেলজিয়ামকে তুলে দেন পরের পর্বে। আবারও প্রমাণ করেন, সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়রা নিজেদের পরিচয় দেন সবচেয়ে বড় মুহূর্তেই।

ক্যারিয়ারে পাঁচ শতাধিক ম্যাচ, আশির বেশি গোল, বেলজিয়ান লিগের শিরোপা, ইংল্যান্ডের এফএ কাপ, ইউরোপের শীর্ষ লিগে দীর্ঘ সাফল্য, বিশ্বকাপ ও ইউরোর অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় দলের নেতৃত্ব-সবই তার অর্জনের অংশ। এতকিছুর পরও তার ক্ষুধা শেষ হয়নি। নিজের কথাতেই, ‘আমি নিজের কাছে অনেক বেশি দাবি রাখি। আমি আরও ভালো হতে চাই, কারণ আমি জানি আমার সেরাটা এখনো পুরোপুরি দেখা যায়নি।’