কিছু মানুষের পরিচয় কোনো পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাদের পরিচয় তৈরি হয় কর্মে, সততায়, নিষ্ঠায় এবং মানুষের হৃদয়ে অর্জিত ভালোবাসায়। সিলেটের সংবাদপত্র জগতের সুপরিচিত মুখ, আলমগীর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ইসমাঈল হোসেন ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। শুক্রবার সকালে তিনি কানাডায় ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, সিলেটের সংবাদপত্র অঙ্গন এবং দেশের সংবাদপত্র বিপণন ব্যবস্থার জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি।
ইসমাঈল হোসেন ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন, ভদ্র, বিনয়ী ও সদালাপী। মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ ছিল তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাংবাদিক, সম্পাদক, পরিবেশক, হকার কিংবা পাঠক সবার কাছেই তিনি ছিলেন একজন আপন মানুষ। তিনি কখনো আলোচনার কেন্দ্র হতে চাননি; বরং নীরবে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। অথচ সংবাদপত্র পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল অসামান্য।
সংবাদপত্র শুধু ছাপা হলেই তার কাজ শেষ হয় না। ভোরের আলো ফোটার আগেই সেটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠকের হাতে পৌঁছে দিতে হয়। এই কঠিন কাজটির সঙ্গে যারা যুক্ত থাকেন, তাদের ভূমিকা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। ইসমাঈল হোসেন ছিলেন সেই নেপথ্যের অন্যতম দক্ষ কারিগর। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তিনি জানতেন কোন সংবাদপত্র কোথায় বেশি পড়া হয়, কোন খবর পাঠকের আগ্রহ বাড়াবে এবং কীভাবে একটি পত্রিকার প্রচার বৃদ্ধি করা যায়।
দেশের শীর্ষস্থানীয় বহু জাতীয় দৈনিক তার হাত ধরেই সিলেট অঞ্চলের পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। সংবাদপত্র বিপণনকে তিনি শুধু ব্যবসা হিসাবে দেখেননি; এটিকে তিনি একটি দায়িত্ব এবং সেবার অংশ হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। সংবাদপত্রের প্রতি তার ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা তাকে আলাদা মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল।
আমার নিজের দেখা, দৈনিক সংবাদের প্রয়াত সম্পাদক বজলুর রহমান, যুগান্তরের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, বর্তমান সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহজাহান সরদারসহ দেশের বহু খ্যাতিমান সাংবাদিক তাকে আন্তরিক স্নেহ করতেন এবং তার মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। কারণ তারা জানতেন, মাঠপর্যায়ে পাঠকের রুচি, সংবাদপত্রের বাজার এবং বিক্রির বাস্তব চিত্র সম্পর্কে ইসমাঈল হোসেনের অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। যুগান্তরের সঙ্গে ইসমাঈল হোসেনের ছিল এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক। আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যুগান্তর প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সিলেটে পত্রিকাটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়। এ সাফল্যের পেছনে ইসমাঈল হোসেনের নিরলস পরিশ্রম, দূরদর্শিতা ও আন্তরিক ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সময় পেলেই তিনি যুগান্তর সিলেট ব্যুরো অফিসে আসতেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন, নতুন নতুন সংবাদ নিয়ে আলোচনা করতেন এবং সিলেটের কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করলে পাঠকের আগ্রহ বাড়বে, সে বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দিতেন। ভালো ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশে তিনি সব সময় উৎসাহ জোগাতেন। আমি নিজেও বহুবার যুগান্তর অফিসে গিয়ে তাকে সবার সঙ্গে প্রাণখোলা আড্ডায় মেতে থাকতে দেখেছি। সংবাদপত্রকে তিনি শুধু একটি পণ্য হিসাবে দেখেননি; তিনি এটিকে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিশ্বাস করতেন।
গল্পের ফাঁকে তিনি প্রায়ই যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের সঙ্গে তার নানা স্মৃতির কথা বলতেন। তার বর্ণনা থেকে বোঝা যেত, দীর্ঘ কর্মজীবনের সততা ও নিষ্ঠার কারণে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়েও তিনি সম্মান ও স্নেহের পাত্র ছিলেন। একবার তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান তাকে নিয়ে একটি পাঁচতারকা হোটেলে মধ্যাহ্নভোজ করেছিলেন। ঘটনাটি তিনি অহংকারের সঙ্গে নয়, বরং কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার স্মৃতি হিসাবে বলতেন। তার এসব গল্পে ফুটে উঠত একজন কর্মনিষ্ঠ মানুষের প্রতি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা ও সম্মান। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমের প্রসারে মুদ্রিত সংবাদপত্র নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। কিন্তু সংবাদপত্রের যে দীর্ঘ ঐতিহ্য, সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ইসমাঈল হোসেনের মতো মানুষদের অবদান কখনো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তারা নীরবে কাজ করেছেন, সংবাদপত্রকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন এবং সংবাদপত্র শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার কর্ম, সততা, আন্তরিকতা, হাসিমাখা মুখ এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে। সংবাদপত্রের জগতে তার মতো নিবেদিতপ্রাণ মানুষের অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়। নতুন প্রজন্মের সংবাদপত্রকর্মী ও পরিবেশকদের জন্য তার কর্মজীবন হতে পারে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
আমরা ইসমাঈল হোসেনকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তার অবদান সংবাদপত্রের ইতিহাসে হয়তো আলাদা অধ্যায় হিসাবে লেখা হবে না, কিন্তু যারা তার সঙ্গে কাজ করেছেন, যারা তার আন্তরিকতা, প্রজ্ঞা ও কর্মনিষ্ঠার সাক্ষী ছিলেন, তাদের হৃদয়ে তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন।
মহান আল্লাহতায়ালা ইসমাঈল হোসেনের সব ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন, তার কবরকে জান্নাতের বাগানগুলোর একটি বাগানে পরিণত করুন, তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ধৈর্য ধারণের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : আকাশ চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট








