ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওঁরাও সম্প্রদায়ের মানুষ বিকাশ খা খা। সংসারে আটজনের ভার তাঁর ওপর। চাষের জন্য নিজের কোনো জমি নেই। এক জোড়া মহিষ ছিল, তা দিয়ে অন্যের জমিতে চাষ করে সংসার চালান। একটি মহিষ বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) পরিত্যক্ত কূপে পড়ে মারা গেছে। এখন সংসার কীভাবে চলবে, সেই চিন্তা করে কূল পাচ্ছেন না বিকাশ।

বিকাশের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের শাহানাপাড়া গ্রামে। গতকাল শনিবার বিকেলে গ্রামে বিএমডিএর পরিত্যক্ত বোরহোলে পড়ে যায় তাঁর হালের মহিষটি। দেখেই জ্ঞান হারান বিকাশ। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু ততক্ষণে প্রায় ৮০ ফুট গভীরে পড়ে যাওয়া মহিষটি আর বেঁচে নেই। তাই উদ্ধার অভিযান স্থগিত করে রাত ৮টায় ফিরে যায় ফায়ার সার্ভিসের দল।

জানতে চাইলে গোদাগাড়ী ফায়ার স্টেশনের ইনচার্জ রফিকুজ্জামান বলেন, বিএমডিএর গভীর কূপে পড়ে মহিষটি মারা গেছে। তাঁরা চেষ্টা করলে কূপটা পানি দিয়ে ভরে দিলে মহিষের মরদেহ ভেসে উঠত। তখন তাঁরা উদ্ধার করতে পারতেন, কিন্তু মহিষের মালিক বলেছেন, মৃত মহিষ উদ্ধার করে কোনো লাভ নেই। সে জন্য তাঁরা অভিযান স্থগিত ঘোষণা করে চলে এসেছেন।

এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে বিএমডিএর এমন একটি পরিত্যক্ত বোরহোলে পড়ে যায় দুই বছরের শিশু সাজিদ। এ ঘটনায় সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রায় ১৬ ঘণ্টার উদ্ধার অভিযান শেষে ফায়ার সার্ভিস সাজিদের মরদেহ উদ্ধার করে। এরপর তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার এ ধরনের সব বোরহোল বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেন। তখন কিছু বোরহোল বন্ধ হয়। কিন্তু শাহানাপাড়া গ্রামের সরল এক্কার বাড়ির পাশের এই কূপ বন্ধ হয়নি।

গতকাল রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, গর্তটি প্রায় ৮০ ফুট গভীর। এর ব্যাসার্ধ প্রায় চার ফুট। মাটি যাতে ধসে না পড়ে, সে জন্য এর চারপাশে বাঁশের চাটাই দেওয়া আছে। এর ভেতরেই পড়ে আছে মহিষ। গ্রামের লোকজন টর্চলাইটের আলো ফেলে মহিষটিকে দেখার চেষ্টা করছেন।

মহিষের মালিক বিকাশ খা খা জানান, তাঁর দুটি মহিষ ছিল। দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এই মহিষ কিনেছিলেন। এই মহিষ দিয়ে তিনি হালচাষ করে সংসার চালান, কিস্তি দেন। কিস্তি শোধ হওয়ার আগেই তাঁর মহিষের এমন পরিণতি হলো।

বাড়িতে থাকা অন্য মহিষটির পাশে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছিলেন বিকাশের মা মিনতি এক্কা। তিনি জানান, তাঁর স্বামী প্রতিবন্ধী। বাড়িতে তাঁরা মোট আটজন। এই মহিষই তাঁদের সংসার টানত। এখন তাঁদের কী হবে, তা ভেবে পাচ্ছেন না। তাঁরা মহিষের ক্ষতিপূরণ চান।

বিকাশের মেয়ে মন্দিরা খা খা বলেন, ‘আমার বাবা গরিব মানুষ। মহিষের এ দশা দেখে আমার বাপ না-বাঁচা হয়ে গিয়েছিল। একটুও জ্ঞান ছিল না। কারণ, এই মহিষ দিয়েই আমার বাপ সংসার চালাচ্ছে। আমার বাপ এখন কী করবে? নাই জমি, নাই টাকাপয়সা। কীভাবে চলব?’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত বছরের শেষের দিকে মালিগাছা গ্রামের বাশির উদ্দিন বাবুসহ কয়েকজন ব্যক্তি আব্দুর রহিম নামের এক ব্যক্তির জমিতে গভীর নলকূপ বসানোর চেষ্টা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত গভীর নলকূপ বসানো না হলেও তাঁরা কূপটি বন্ধ করেননি। তাঁদের গাফিলতিতে এ দুর্ঘটনা ঘটল।

যোগাযোগ করা হলে বাশির উদ্দিন বাবু জানান, তাঁরা কয়েকজন মিলে ওই জমিতে গভীর নলকূপ বসানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। খননের পর সেখানে পানির স্তরও পাওয়া যায়। তখন বিএমডিএ তাঁদের কাগজপত্র জমা দিতে বলে। কিন্তু পরে জমির মালিক আব্দুর রহিম আর কাগজপত্র নিয়ে যাননি। সে কারণে গভীর নলকূপটি স্থাপন করা হয়নি। তাঁরা আশায় ছিলেন, আজ না হয় কাল, সেখানে গভীর নলকূপ হবে। এ জন্য খনন করা কূপটি বন্ধ করেননি।

বরেন্দ্র অঞ্চলে এখন ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট। তাই নতুন করে আর গভীর নলকূপ স্থাপন না করার ঘোষণা দিয়েছে বিএমডিএ। তারপরও শাহানাপাড়ায় গভীর নলকূপের জন্য এই কূপ খননের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. আবুল কাশেম জানান, তিনি বিষয়টি জানতেন না। এ ব্যাপারে তিনি খোঁজখবর নিয়ে দেখবেন।