আজ সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৭১তম বার্ষিকী। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের আদিবাসী সাঁওতালরা গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে সাঁওতাল বিদ্রোহের শহীদদের স্মরণে র্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ইতিহাসের নানা দিক উন্মোচিত হলেও পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণ ও বীরত্বপূর্ণ অবদান বারবারই আড়ালে থেকে গেছে। শুধু সাঁওতাল বিদ্রোহ নয়, উপমহাদেশের প্রায় সব আদিবাসী বিদ্রোহেই নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। পুরুষদের সাহস ও মনোবল জোগাতে যেমন নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি প্রতিরোধযুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। ফুলো মুরমু ও ঝানো মুরমুর নেতৃত্ব সেই ইতিহাসেরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভারতের ঝাড়খণ্ডের ভগনাডিহি, দুমকাসহ বিভিন্ন স্থানে ফুলো ও ঝানো মুরমুর আবক্ষ ভাস্কর্য আজও সেই বীরত্বগাথার সাক্ষ্য বহন করছে। ইতিহাসে আদিবাসী সাঁওতাল নারীদের অবদান দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকলেও এসব স্মারক সেই সত্যকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে সমগ্র ভারতবর্ষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই দুর্ভিক্ষের অভিঘাতে বহু সাঁওতাল নিজ নিজ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। একই সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও বিভিন্ন শ্রমনির্ভর কাজে আদিবাসীদের নিয়োজিত করতে শুরু করে। ফলে ধীরে ধীরে সাঁওতালরা ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম আদিবাসী জনগোষ্ঠী হলো সাঁওতাল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৮৩২ সালে সাঁওতালদের ‘দামিন-ই-কোহ’ অঞ্চলে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। ফারসি ভাষায় ‘দামিন-ই-কোহ’ অর্থ পাহাড়ের প্রান্তদেশ। সাহেবগঞ্জ, গোড্ডা, দুমকা, দেওঘর, পাকুড় এবং জামতাড়ার কিছু অংশ নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত হয়। পাশাপাশি বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, ভাগলপুর, বরাভূম, মানভূম, পালামৌ ও ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত সাঁওতালদেরও সেখানে বসবাসের সুযোগ দেয়া হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের দেশীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব, ফুলো ও ঝানো মুরমুর নেতৃত্বে সাঁওতাল সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ব্রিটিশ শাসকদের দেশীয় সহযোগীদের মধ্যে ছিল জমিদার, জোতদার, মহাজন, দারোগা এবং উচ্চবর্ণের প্রভাবশালী শ্রেণী। সাঁওতালরা নিজেদের শ্রমে পাহাড়ি বনভূমি পরিষ্কার করে আবাদযোগ্য জমি তৈরি করলেও পরে নানা কৌশলে সেই জমি তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত খাজনা আদায়, ঋণের ফাঁদ, ব্যক্তিগত নির্যাতন এবং নানা ধরনের ধারাবাহিক শোষণ তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন প্রায় ৪০০টি গ্রামের সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা করেন। এই বিদ্রোহে ফুলো ও ঝানো মুরমুর নেতৃত্বে প্রায় এক হাজার নারী যোদ্ধার একটি বাহিনী গড়ে ওঠে। সিধু মুরমুর স্ত্রী সুমি মুরমুও সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সিধু ও কানুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাঁওতাল নারীরা গ্রামে গ্রামে সংগঠিত হন। বিদ্রোহের চেতনা তাদেরও সমানভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল। নারীরা শুধু পুরুষ যোদ্ধাদের সহায়ক হিসেবেই কাজ করেননি; অনেক ক্ষেত্রেই তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। বিদ্রোহীদের জন্য খাদ্য সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং রাতের অন্ধকারে ব্রিটিশ শিবিরে আকস্মিক হামলা চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি-এসব ক্ষেত্রেই তাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। যুদ্ধের খবর ও নির্দেশনা ছড়িয়ে দিতে নারীরা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে শালগাছের পাতা ও ডাল পাঠাতেন। সাঁওতালি ভাষায় এই সংকেতকে ‘গিরা’ বলা হতো। এর মাধ্যমে বিদ্রোহের ডাক এবং যুদ্ধের সময়সূচি গোপনে পৌঁছে দেয়া হতো। আবার অনেক নারী বাজারে জ্বালানি কাঠ বা ফল বিক্রেতার ছদ্মবেশে ঝুড়ির নিচে তীর-ধনুক, পাথরসহ বিভিন্ন যুদ্ধসামগ্রী লুকিয়ে যোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। গুলতিতে ব্যবহারের জন্য পাথরও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রসামগ্রী। সাঁওতাল পরগনা ও বীরভূমের স্পেশাল কোর্টের নথিতে আরও কয়েকজন নারীর নাম ও তাদের ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। অভিযোগ ছিল, তারা ব্রিটিশদের নির্মিত রেললাইন ধ্বংস, যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা, যুদ্ধের জন্য তীর তৈরি এবং লুণ্ঠিত সামগ্রী বহনে অংশ নিয়েছিলেন। এসব অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তারও করা হয়। ক্ষুব্ধ সাঁওতাল নারীরা দলবদ্ধভাবে রেললাইন উপড়ে ফেলা, কোম্পানির গুদাম থেকে খাদ্যশস্য উদ্ধার এবং পুরুষ যোদ্ধাদের কাছে গোপন তথ্য পৌঁছে দেয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নির্ভীকভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। অভিযুক্তদের মধ্যে সিংগি, বারকি, সোনা ও মণির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন ব্রিটিশ আদালতের বন্দি তালিকায় রাধা ও হীরা নামের দুই বীর নারীর নাম স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত রয়েছে। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় বন্দি হন। বন্দি হওয়ার পরও তারা ব্রিটিশ শাসকদের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি বা নতি স্বীকার করেননি। ভগনাডিহি অঞ্চলে আজও লোকমুখে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, ফুলো ও ঝানো মাত্র ২১ জন সাঁওতাল নারীকে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে ছদ্মবেশে ব্রিটিশ শিবিরে প্রবেশ করেন এবং তিনজন উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ সেনাকে হত্যা করেন। ঘটনাটি লিখিত ইতিহাসে সর্বত্র সমভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলেও সাঁওতাল লোকস্মৃতিতে এটি তাদের অসাধারণ সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে বেঁচে আছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সমগ্র সাঁওতাল সমাজে নতুন উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। রাধা, হীরা, সিংগি, বারকি ও সোনাসহ অনেক নারীকে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের পর বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে কয়েকজন নারী পরবর্তীকালে মুক্তিও পান। ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, সিধু ও কানু গ্রেপ্তার হওয়ার পর আন্দোলনে নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। সেই সময় গ্রামের মাঝিদের (মোড়ল) স্ত্রীরা, অর্থাৎ মাঝিয়ানরা, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গ্রামের প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এটি প্রমাণ করে যে, সাঁওতাল বিদ্রোহে নারীরা কেবল সহযোদ্ধাই ছিলেন না; প্রয়োজনে নেতৃত্বও দিয়েছেন। ফুলো ও ঝানো মুরমুর সাংগঠনিক দক্ষতায় প্রায় এক হাজার নারী যোদ্ধার একটি সুসংগঠিত বাহিনী গড়ে ওঠে। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এটি নারীদের সংগঠিত প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। সাঁওতাল সমাজে ডাইনি-সংক্রান্ত বিশ্বাস আজও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। বিদ্রোহের শেষ পর্যায়ে যখন সাঁওতাল যোদ্ধারা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন এবং গ্রামে গ্রামে মহামারির প্রকোপ দেখা দিয়েছিল, তখন সেই বিপর্যয়ের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের দায়ী করা হয়। তাদের ‘ডাইনি’ আখ্যা দিয়ে নানা ধরনের নিপীড়ন ও কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হয়। ফলে বহিরাগত শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের পাশাপাশি সমাজের অভ্যন্তরীণ কুসংস্কারও নারীদের জন্য আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আজ, সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৭১তম বার্ষিকীতে ফুলো মুরমু, ঝানো মুরমু, সুমি মুরমু, রাধা, হীরা, সিংগি, বারকি, সোনা, মণিসহ অসংখ্য পরিচিত ও অপরিচিত নারী সংগ্রামীর অবদান নতুন করে স্মরণ করা জরুরি। তাদের ইতিহাস কেবল সাঁওতাল সমাজের নয়, সমগ্র উপমহাদেশের প্রতিরোধ সংগ্রামের এক অমূল্য সম্পদ। ইতিহাসের মূলধারায় তাদের যথাযথ স্থান নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাদের বীরত্বগাথা তুলে ধরাই হবে সাঁওতাল বিদ্রোহের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। [লেখক: কলামিস্ট]
রাজনীতি
সাঁওতাল বিদ্রোহে নারীর বীরত্ব

শেয়ার করুন







