ইতালির রাজধানী রোমে বাংলাদেশি দম্পতি ও তাদের শিশু মেয়ে হত্যার ঘটনায় এক বাংলাদেশি যুবককে সন্দেহভাজন হিসাবে চিহ্নিত করে তার ছবি প্রকাশ করেছে রোম প্রসিকিউটর কার্যালয়। তার বিষয়ে কারও কাছে যদি তথ্য থাকে তবে রোমের এ নম্বরে ৩৩৪৬৯০৩২৯৫ যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়। প্রকাশিত ছবির ব্যক্তি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মো. শাহাদাত হোসেন হিসাবে শনাক্ত করেছেন নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা।

শাহাদাত কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের আবদুল আহাদের ছেলে। তিনি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের পরিচয় ও পারিবারিক যোগাযোগ ছিল বলেও দাবি করেছেন স্বজনরা।

ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে রোমের ক্যাসালোত্তি এলাকার ভিয়া মন্তিলিও সড়কের পার্কসংলগ্ন একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

নিহতরা হলেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের চরকাঁকড়া বিজয়নগরের কামাল উদ্দিন বাবুল, স্ত্রী আরজু বেগম এবং পাঁচ বছর বয়সি মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশা। এ ঘটনায় তাদের ছেলে আমির হোসেন অয়ন আহত হন। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্থানীয়রা বলেন, কামাল প্রথমে একাই ইতালিতে থাকতেন। তখন তার পরিবার কোম্পানীগঞ্জে ছিল। ওই সময় শাহাদাতের সঙ্গে কামালের স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে পরিবার জানতে পারে। এ নিয়ে এলাকায় সালিশও হয়েছিল। পরে প্রায় দুই বছর আগে কামাল তার স্ত্রী ও সন্তানদের ইতালিতে নিয়ে যান। গত বছর কুরবানির ঈদে কামাল পরিবারসহ দেশে এসেছিলেন। সে সময় তাদের বাড়িতে একটি উড়ো চিঠি আসে। চিঠিতে স্বর্ণালংকার ও অর্থ দাবি করা হয় এবং তা না দিলে পরিবারের সদস্যদের হত্যাসহ নারীদের নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি থানায় জানানো হয়েছিল। পরে তারা নির্ধারিত সময়ের আগেই ইতালিতে ফিরে যান।

স্বজনদের দাবি, শাহাদাত প্রায় চার বছর আগে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সেখানে পারিবারিক বিচ্ছেদের পর প্রায় এক বছর আগে তিনি ইতালিতে যান। তাদের অভিযোগ, ইতালিতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও শাহাদাতকে সহায়তা করেছিলেন আরজু।

নিহতদের পরিবারের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মো. ইউনুস সুমন বলেন, দেশে থাকাকালীন শাহাদাতের সঙ্গে কামালের স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণেই কামাল পরিবারকে ইতালিতে নিয়ে যান। কিন্তু ইতালিতেও শাহাদাতের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়নি বলে আমরা জানতে পেরেছি। হত্যাকাণ্ডের পর শাহাদাতের ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্ট সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি।’

ঘটনার পর সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেন তার ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।

নিহত কামালের বাবা সিরাজুল ইসলামও দাবি করেন, এ হত্যাকাণ্ডে কামালের পরিচিত ও একই গ্রামের প্রবাসী শাহাদাত হোসেন জড়িত।

শাহাদাতের বড় ভাই, সৌদি আরব প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন বলেন, ‘চার বছর আগে শাহাদাত সব সম্পত্তি বিক্রি করে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে চলে যায়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। আমি দুই মাস আগে দেশে এসেছি, এর মধ্যেও তার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।’

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুর রহমান রিপন বলেন, ‘বিষয়টি আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। এ বিষয়ে আমার বিস্তারিত জানা নেই।’

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শামসুদ্দিন হায়দার বলেন, ‘শাহাদাত হোসেন চার বছর আগে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর থেকে দলের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল হাকিম বলেন, ‘উড়ো চিঠির মাধ্যমে হুমকির বিষয়টি ভুক্তভোগী পরিবার মৌখিকভাবে পুলিশকে জানিয়েছিল। এরপর পুলিশ নিয়মিত টহলের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছিল।’