জাতীয় উদ্যোন লাউয়াছড়ায় মূল্যবান গাছ, বাঁশ ও বেদ চুরি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। আগের চেয়ে এখন কমে গেছে বনের ঘনত্ব। দখল হয়েছে বনভূমির অনেক স্থান। ফলে খাদ্য, পানি,আবাস্থল সংকটে জাতীয় উদ্যোন ছেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে বন্যপ্রাণী। বন উজার বন্ধ না হলে সংরক্ষিত বনের প্রাণী বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়, গত আট মাসে প্রায় ১০০ বন্যপ্রাণী লোকালয়ে প্রবেশ করেছে।

বনবিভাগ বলছে, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বনাঞ্চালের সংকটার্পূণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। খাদ্য সংকট, পানির অভাব ও বন উজাড় হওয়ার কারণে বন্য প্রাণী লোকালয়ে প্রবেশ করছে। তবে মানুষ আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়েছেন। আগে বন্য প্রাণী লোকালয়ে প্রবেশ করলে আতংকিত হয়ে এদের মেরে ফেলা হত। এখন এগুলো বন্ধ হয়েছে। লোকালয়ে বন্যপ্রাণী দেখলে মানুষ বনবিভাগ ও প্রাণী সংরক্ষণের কাজ করা সংগঠনকে জানাচ্ছে।

এলাকাবাসী জানান, কখনো বসতঘরের সিলিং, আবার কখনো চা বাগান থেকে উদ্ধার হচ্ছে বিশাল অজগর। হাওর এলাকার ধানক্ষেত আর বাড়ির আশেপাশেও দেখা মিলছে অজগরের। শুধু অজগর নয় এর সাথে রয়েছে ফনী মনসা সাপ, সঙ্কিনীসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপেরও দেখা মিলছে।

কথা হলে শ্রীমঙ্গলের পরিবেশ কর্মী রাজদীপ দেব দীপ বলেন, ‍“মানুষের অবাধ বিচরণ এবং বনের গহীন থেকে বড় বড় বৃক্ষ নিধন হওয়ায় বন্য প্রাণীরা নিরাপদ আবাস স্থল হারিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। যা বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ।”

শ্রীমঙ্গলের অপর পরিবেশ কর্মী মৃদুল দেব বলেন, “পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ রোপণ হচ্ছে না। গাছ লাগানোর চেয়ে উজাড় হচ্ছে বেশি। এতে বনে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যটকদের আনাগোনায় শৃংখলা না থাকায় বন্য প্রাণীরা আতংকিত হয়ে বন ছেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে।”

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরের দৃশ্য

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে লোকালয় থেকে উদ্ধার হচ্ছে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী লোকালয়ে আসা বন্যপ্রাণীর দেখা মিললেই খোঁজ পরে স্বপন দেব সজলের। সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা গেলে এসব প্রাণীর ঠাঁই হয় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে আর অসুস্থ হলে সেবা মেলে স্বপন দেব সজলের বাবা সীতেশ রঞ্জন দেবের গড়া বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন শ্রীমঙ্গলের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, বাবা সীতেশ রঞ্জন দেবের কাছ থেকে বন্যপ্রাণীদের উদ্ধারের কলাকৌশল শেখেন তিনি। এখন নিজের ভাতিজা রাজদীপ দেব দীপকে সঙ্গে নেন প্রাণী উদ্ধারে। গত ৮ মাসে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা শুধু অজগর সাপই উদ্ধার করা হয়েছে ১৬টি। উদ্ধার করা অন্য বন্যপ্রাণীদের মধ্যে রয়েছে বিরল জাতের ক্যান্টর কুকরি সাপ, চিতা বিড়াল, সোনালী বিড়াল,লজ্জাবতী বানর, শঙ্খচিল, সবুজ ফনিমনসা সাপসহ ১০০টি বন্যপ্রাণী।”

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এই পর্যটনকেন্দ্রে বেড়াতে আসেন অসংখ্য পর্যটক

শ্রীমঙ্গলের পরিবেশ কর্মী শিমুল তরফদার বলেন, “দৈত্যাকার অজগরসহ একের পর এক বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনায় শ্রীমঙ্গলে বাড়ছে আতঙ্ক। বন উজাড়, লাউয়াছড়া বনের গহীন অংশ দখল করে চাষাবাদ, বনে খাদ্য সংকটসহ নানা কারণে নিরাপদ আবাস ছেড়ে লোকালয়ে আসছে এসব প্রাণী। ”

মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার বলেন, “বনের প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিতে গভীর বনে দখল উচ্ছেদ করার পাশাপাশি খাদ্য সংকট মেটাতে অধিক পরিমানে ফলজ বৃক্ষ রোপণের ব্যবস্থা করতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে রিসোর্ট নির্মাণে বন জঙ্গল উজাড় হচ্ছে। এইসব বিষয়ে সবাইকে সচেতন না হলে অচিরেই প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হবে।”