সংরক্ষণাগার, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, উন্নত প্যাকেজিং ও সহজ সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা না থাকায় দেশের বিপুল পরিমাণ আম নষ্ট হচ্ছে বলে জানান নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।

তিনি বলেন, এসব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারে আমভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বড় অংশীদার হতে পারবেন।

গত শনিবার (২৭ জুন) সকালে জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।

সোহেল রানা বলেন, চলতি মৌসুমে বড় ধরনের ঝড়ে প্রায় ১৫০ মণ আম ঝরে পড়ে। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত আমের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক সময় মাত্র এক থেকে দুই টাকা কেজি দরে বিক্রির প্রস্তাব পাই। পরে শ্রমিক দিয়ে আম সংগ্রহ করে বিক্রি করলেও কেবল শ্রমিকের খরচই উঠে আসে।

সংরক্ষণাগার থাকলে ঝড়ে পড়া কাঁচা আম দিয়ে আচার, পাকা আম দিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি করা যেত জানিয়ে তিনি বলেন, এতে কৃষক ও উদ্যোক্তা উভয়েরই ক্ষতি কমে আসতো। কাঁচা ও পাকা— দুই ধরনের আমই দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করে বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী বিক্রি করা সম্ভব হতো।

Round tableগোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা

আন্তর্জাতিক বাজারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আলিবাবা ও অ্যামাজনের মতো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ভারত-ফিলিপাইনের আমসত্ত্ব, ম্যাংগো বার, আমের গুঁড়া ও অন্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশেও মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন সহজ করা গেলে দেশীয় উদ্যোক্তারাও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবেন।

আরও পড়ুন

হিমসাগর-ল্যাংড়াকে হটিয়ে ‘সেরা’ আম এখন আম্রপালি

সার্টিফিকেশন পেতে দীর্ঘ সময় লাগলে কৃষক ও উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তাই এ প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার দাবি জানান তিনি।

প্যাকেজিংকে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে সোহেল রানা বলেন, থাইল্যান্ডের প্রক্রিয়াজাত আমপণ্য বিশ্ববাজারে সুপরিচিত। বাংলাদেশের পণ্যের মান ভালো হলেও উন্নত প্যাকেজিং প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রতি বছর ঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে বিপুল পরিমাণ আম নষ্ট হয়। অনেক সময় পানির দামে বড় কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে হয়। আবার বড় কোম্পানিগুলোও সব আম কিনতে পারে না। ফলে হাজার হাজার টন আম মাঠেই নষ্ট হয়। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি এগিয়ে এলে কৃষক ও উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন।

আরও পড়ুন

গবেষণায় রাজশাহীর ফলচাষে নীরব বিপ্লব

সরকারি সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা কিছু প্রশিক্ষণ পেলেও প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামোয় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান না। এখন শুধু প্রশিক্ষণ নয়, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন। উদ্যোক্তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া গেলে ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন তিনি।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াছ মৃধা, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম।

এসএম/এএসএ/ এমএফএ