নেতা-নেত্রীদের নামে গুণকীর্তন ছিল না। ছিল না অযথা তোয়াজ, স্তুতিগান, বেফাঁস মন্তব্য কিংবা খিস্তিখেউড়। বরং সরকারি দলের সংসদ-সদস্যরা নিজেদের মন্ত্রীদের কাঠগড়ায় তুলেছেন হরহামেশাই। জাতীয় সংসদের এরকমই এক ব্যতিক্রমী বাজেট অধিবেশন এবার দৃষ্টি কেড়েছে সবার। অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মাদকের ভয়াবহতা, সীমান্ত হত্যাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারি দলের সদস্যরাও যেমন মন খুলে কথা বলেছেন; তেমনই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসাবে এক দল আরেক দলের সমালোচনায় ছিল সোচ্চার। মাঝেমধ্যে এই সমালোচনা উত্তাপ ছড়ালেও সীমা লঙ্ঘন করেনি কোনো পক্ষই। তবে কারও কারও মতে, আলোচনায় উপেক্ষিত ছিল বাজেটের মূল বিষয়। দুই পক্ষের সংসদ-সদস্যরাই বাজেটের দিক নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার তুলনায় রাজনৈতিক এবং আর্থসামাজিক বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। অনেকে আবার নিজের নির্বাচনি এলাকার নানা দাবিদাওয়ার পাশাপাশি কিছু অপ্রাসঙ্গিক বিষয় তুলে এনেও অধিবেশনে কিছুটা উত্তাপ ছড়িয়েছেন। এছাড়া প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাইয়ের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি হিসাবে ‘ট্যাগ’ দেওয়া এবং ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেও বক্তব্য শেষ করেছেন কেউ কেউ।

বিশ্লেষকদের মতে, গত দেড় দশকে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ক্ষমতাসীন দলের বেশির ভাগ সদস্য সব সময় সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বা তার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতেন। এমনকি ওই সময়ে বিরোধী দলের সদস্যদেরও নিজেদের দায়িত্ব ভুলে সরকারপ্রধানসহ ক্ষমতাসীনদের গুণকীর্তন করতে দেখা গেছে। সরকারের কোনো নেতিবাচক দিক যেন সেসময় কারও চোখেই পড়ত না। অনেক সময় অতিরিক্ত বন্দনা করতে গিয়ে মন্ত্রীদের নিয়ে গান পরিবেশন এবং কবিতা আবৃত্তির মতো ঘটনাও ঘটেছে গত দেড় দশকের সংসদে। এর বাইরে নেতা-নেত্রীদের নিয়ে অযথা তোয়াজ, স্তুতিগান, বেফাঁস মন্তব্য, এমনকি খিস্তিখেউড়ের ঘটনা ছিল অহরহ। তবে এখন সময় বদলেছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গঠিত এবারের সংসদে এসেছে নতুনত্ব। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ-সদস্যরা মন খুলে কথা বলেছেন। কথা বলতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েননি বিরোধী দলের সদস্যরা। সরকারি দলের একাধিক সদস্য নিজেদের মন্ত্রীদের নিয়ে তির্যক সমালোচনা করেছেন। এজন্য সরকারের শীর্ষপর্যায়ে তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ছোটখাটো কিছু বিষয় বাদে প্রথম অধিবেশনের মতো এবারের দ্বিতীয় এবং বাজেট অধিবেশন ছিল এককথায় ব্যতিক্রম ও প্রাণবন্ত।

তবে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমানকে নিয়ে এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) সংসদ-সদস্য হান্নান মাসউদের বিতর্কিত মন্তব্য, ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়ার দাবি, নিজের জন্মের ১০ বছর আগে বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ দাবি, বোরকা নিয়ে মন্তব্য, মাওলানা মামুনুল হকের প্রসঙ্গ তুলে কেউ কেউ পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করেছেন। বাজেট আলোচনার সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের অনুপস্থিতির বিষয় নিয়েও অনেক সদস্য যৌক্তিক সমালোচনা করেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের অধিবেশনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমান এবং বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। অধিবেশনের ফাঁকে তারা কুশলাদি বিনিময় করেছেন, কথা বলেছেন। বিরোধী দলের নেতা অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তার নির্বাচনি এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সংসদনেতার সহায়তা কামনা করেন। সংসদনেতাও এতে সায় দিয়ে বলেন, বিরোধী দলের নেতার নির্বাচনি এলাকার উন্নয়নের দায়িত্ব তিনি নিজে দেখভাল করবেন। এমনকি বাজেট পাশের আগে বিরোধী দলের নেতার অধিকাংশ প্রস্তাব সমর্থন করেন সংসদনেতা; যা সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন এক বার্তা। সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক ছিল সরকারি দলের একাধিক সদস্য বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে নিজেদের মন্ত্রীদের তির্যক ভাষায় সমালোচনা করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, নিজ দলের সংসদ-সদস্যদের পক্ষ থেকে মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনার মাধ্যমে এক ধরনের জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি হবে। বর্তমান সংসদ সেদিকেই এগোচ্ছে বলে তারা মনে করেন।

বাজেট পাশের দিন রাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নৈশভোজ আয়োজনের দীর্ঘদিনের রীতি বাতিল করেও এক অনন্য নজির গড়েন সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কারণ, ওই আনুষ্ঠানিকতা বাতিল করে তিনি সরকারের অর্ধকোটি টাকারও বেশি সাশ্রয় করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, মন্ত্রী, এমপি, সচিবসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানে আয়োজিত ওই নৈশভোজের বেশির ভাগ খাবারই অপচয় হতো।

এবারের অধিবেশন এককথায় আগামী প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় দাবি করে হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান বুধবার যুগান্তরকে বলেন, বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা ২১ বার বিরোধী দলের নেতার বক্তব্য কোট করেছেন। একইভাবে বিরোধী দলের নেতাও তার বক্তব্যে সংসদনেতার প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখিয়েছেন। কাউকে হেয় না করে যৌক্তিক আলোচনার যে সংস্কৃতি এবারের অধিবেশনে দেখা গেছে, তা আগামী প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বুধবার যুগান্তরকে বলেন, অতীতে দেখা গেছে সরকারপ্রধানসহ মন্ত্রীরা যেন ধর্মগুরুর মতো। সবাই শুধু তাদের বন্দনা করতেন। এবারের সংসদ প্রথম থেকেই ব্যতিক্রম ছিল। অযথা তোয়াজ, স্তুতি বা বন্দনা দেখা যায়নি। বরং মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে সরকারি দলের একাধিক সদস্য বক্তব্য দিয়েছেন, এটি অবশ্যই ভালো দিক। তিনি আরও বলেন, মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য সংসদীয় কমিটির যেমন গুরুত্ব রয়েছে, তেমনই সংসদেও সমালোচনার ধারা চালু থাকা উচিত। এতে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। সংসদ কার্যকর ও শক্তিশালী হবে। মন্ত্রীরা তাদের কাজে সতর্ক থাকবেন। একধরনের জবাবদিহির চিন্তা মাথায় রেখে তারা পথ চলবেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ১১ জুন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নিয়ম অনুযায়ী বাজেট পাশের আগে এর বিভিন্ন দিক নিয়ে সংসদ-সদস্যরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর অনুষ্ঠিত সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন সরকারী দল, বিরোধীদল ও স্বতন্ত্রসহ ২৯১ জন সংসদ-সদস্য। মোট ৪৫ ঘণ্টা ৫১ মিনিটের এ আলোচনায় সরকারি দলের ২০০ জন সংসদ-সদস্য ৩২ ঘণ্টা ৩ মিনিট এবং বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র ৯১ জন সংসদ-সদস্য ১৩ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট বক্তব্য দেন। আলোচনা শেষে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পাশ করে। এর আগে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় সরকারি দলের ১৮ জন এবং বিরোধী দলের ৭ জনসহ ২৫ জন সংসদ-সদস্য অংশ নেন। এ আলোচনা চলে ৩ ঘণ্টা ৩ মিনিট। সব মিলিয়ে জাতীয় বাজেট ও সম্পূরক বাজেট-দুই আলোচনায় এবার ৩১৬ জন সংসদ-সদস্য ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট বক্তব্য দেন।