নারায়ণগঞ্জের বন্দরের সোনাকান্দা ত্রিবেনীপুল এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বংশপরম্পরায় ঢোল, তবলা-বায়া, খোল, নালসহ নানান বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে আসছেন। যা বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দিন দিন তাদের এই ক্ষুদ্র শিল্পটি যেন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। একসময় এই ক্ষুদ্র শিল্পটির জমজমাট অবস্থা থাকলেও এখন আর সেই আগের অবস্থা নেই।

প্রযুক্তির তালে ও নানা রকমের প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে কারিগর ও দোকান মালিকরা এই পেশা থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। নতুন করে এই শিল্পে কোনো কারিগর তৈরি হচ্ছে না। যারা এখনো এই শিল্পের সঙ্গে রয়ে গেছেন তারাও কোনোরকম টিকে রয়েছেন। তাদের পরে এই শিল্পের হাল ধরার মতো কেউ থাকছে না।

কারিগর ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্দরের সোনাকান্দার এই ত্রিবেনীপুল এলাকায় বাদ্যযন্ত্রের দোকান আছে চারটি। এসব দোকানে কারিগর আছেন প্রায় ২০ জন। এছাড়া বাড়িতেও অনেকে বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে থাকেন।

সন্তানদের নিজ পেশায় আনতে চান না ঢোল-তবলা তৈরির কারিগররা

তবলা-বায়া, খোল, নাল, পাখোয়াজ, ঢোল, ঢোলক, ঢোলকি, খঞ্জরি, ঘুমোট, কঙ্গ, বঙ্গ, বিগ ড্রাম, চাই ড্রাম, তরকা, খমকসহ অর্ধশতাধিক ধরনের বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয়ে থাকে এই ত্রিবেনীপুল এলাকায়। আর এখানে তৈরি তবলা-বায়াসহ বাদ্যযন্ত্র ছায়ানট, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, সায়েন্স ল্যাবরেটরিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে আগের মতো চাহিদা নেই।

এখনও যারা এই ক্ষুদ্র শিল্পটির সঙ্গে জড়িত আছেন তারা তাদের বাবা-দাদাদের থেকে এই পেশায় এলেও তাদের সন্তানেরা আর এই পেশায় আসছেন না। সেইসঙ্গে নতুন করে আর কেউ এই ঢোল-তবলা তৈরি করাও শিখছেন না। এছাড়া অনুষ্ঠানগুলোতেও ঢোল-তবলা বাদকের চাহিদা থাকছে না। অনেকে আবার ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে গানের সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছেন। ফলে তাদের ঢোল-তবলা বাদকের প্রয়োজন পড়ছে না।

১৯৯০ সাল থেকে এই ক্ষুদ্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত নির্মল মিউজিক সেন্টারের মালিক দুলাল চন্দ্র দাস। তিনি নিজেও একজন কারিগর। ঢোল-তবলা তৈরি করার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন।

সন্তানদের নিজ পেশায় আনতে চান না ঢোল-তবলা তৈরির কারিগররা

দুলাল চন্দ্র দাস বলেন, ‘বর্তমানে এখানে কিছুই নেই। কারিগর সংকট, চামড়া সংকট ও খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এখন সবাই গিটারের প্রতি আসক্ত, বেচাকেনা অনেক কম। এখানে কারিগর আসতে চাই না। আমরা পোষাতে পারছি, না কারিগরদেরও পোষাচ্ছে না। মূল্য পাওয়া যায় না। কোনোরকম পেটের দায়ে এখনো করে যাচ্ছি। আমার বয়স হয়ে গেছে, এই পর্যন্তই শেষ। আমার পরে আর কেউ আসবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন এই ক্ষুদ্র শিল্পটা বিলুপ্তির পথে। যারা এই ব্যবসা করতো তারা এখন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের দিকে ঝুঁকছে। এখানে লাভ কম। এখন ইলেক্ট্রিক তবলা বের হয়েছে, যেখানে বাজনা ফিক্সড করা থাকে। আবার অনেকে গান গাইতে গিয়ে ইন্টারনেট থেকে সার্চ দিয়ে বের করে গান গেয়ে ইউটিউবে ছেড়ে দিচ্ছে।’

তবলা তরঙ্গ মালিক অরবিন্দু দাস বলেন, ‘কোনো লাভ নেই। কোনোমতে দিন চলে যাচ্ছে। আমি করছি, আমার ছেলেরা এখানে আসে নাই। আমি মরছি কিন্তু ছেলেদের মারতে চাই না।’

সন্তানদের নিজ পেশায় আনতে চান না ঢোল-তবলা তৈরির কারিগররা

‘শ্রী লোকনাথ যন্ত্র সঙ্গীত’র মালিক স্বপন কুমার দাস বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংস্কৃতিকে চাঙ্গা করতে চাচ্ছেন। তবে আমাদের এখানে যে গ্যাপ তৈরি হয়ে গেছে সেটা পূরণ করতে সময় লেগে যাবে। এখন আমাদের এই কর্ম করতে গিয়ে পেট চালাতেই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমার বাবা-দাদারা এই কাজ করছে, আমরাও করছি। আমাদের ছেলেদের এই কাজ শিখাবো না। এখন আর এখানে সম্মান নেই। এখন এই পেশা বিলুপ্তির পথে। এখন আর এখানে কারিগর তৈরি হচ্ছে না। আগে এসব কাজের ওপর টেন্ডার হতো, কিন্তু এখন আর টেন্ডার হয় না।’

কারিগর প্রদীপ মনির দাস বলেন, ‘১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে এই কাজ করে আসছি। প্রথম প্রথম ভালো ছিল, এখন আর ভালো নেই। ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা করাতে পারছি না এই পেশায় থেকে।’

একইভাবে কারিগর অজিত দাস বলেন, ‘দিন দিন এই পেশা ধরে রাখা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখন আর মজুরি পাওয়া যায় না।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মাসুদুল হাসান তাপস বলেন, ‘ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য আমাদের বিভিন্ন রকমের প্রজেক্ট রয়েছে। যদি আমাদের এখানে কেউ আবেদন করে, তাহলে আমরা তাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করবো। সেইসঙ্গে আমরা আমাদের কর্মকর্তা পাঠিয়েও এ বিষয়ে কিছু করা যায় কি না দেখবো।’

বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিবানী সরকার বলেন, আমরা সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ খবর নিবো। উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে তাদের জন্য কিছু করা যায় কি না কিংবা উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হলেও এই শিল্পকে ধরে রাখার প্রচেষ্টা করবো।

এফএ/জেআইএম