একসময় পায়ের জাদুতে মাতিয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল মাঠ। দেশের জার্সি গায়ে জিতেছেন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। পেয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও। মাঠে যার দাপটে প্রতিপক্ষের ঘুম হারাম হতো, সময়ের নির্মম পরিহাসে সেই রজনী কান্ত বর্মন আজ নিজেই জীবন যুদ্ধে অসহায়।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের পিঙ্গাবহ গ্রামের বাড়ির সামনের বৈঠকখানায় এখন অনেকটা নীরবেই কাটে তার দিন। একসময় যে ফুটবল নিয়ে ছুটেছেন মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, সেই পায়েই এখন ভর করে দাঁড়ানো কঠিন। কারও সাহায্য ছাড়া স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না এই তারকা খেলোয়াড়।
রজনীর জীবনের গল্পটা অবশ্য এমন ছিল না। ১৯৯৯ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত সাফ গেমসে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন তিনি। এরপর ২০০৩ সালের সাফ ফুটবলে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন করার পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই ফুটবলার। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে সে সময় দক্ষিণ এশিয়ার সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন রজনী কান্ত বর্মন।
জাতীয় দলের হয়ে রজনী কান্ত বর্মন খেলেছেন ৫৩টি ম্যাচ। দেশের বিভিন্ন ক্লাবেও খেলেছেন দীর্ঘ সময়। মাঠে তার সাফল্য ছিল উজ্জ্বল। অথচ সেই সাফল্যের গল্পের শেষ প্রান্তে এসে আজ যেন নিজের জীবনটাই হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।
কয়েক বছর আগে ভারতে বেড়াতে গিয়ে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। হুগলীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়ে গুরুতর আহত হন রজনী কান্ত বর্মন। দুর্ঘটনার সময় একটি প্রাইভেটকার তার পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা প্রথমে পা কেটে ফেলার কথা বলেছিলেন। পরে একের পর এক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কোনোভাবে পা রক্ষা করা হয়।
বাড়ির বারান্দায় বসে থাকা রজনী কান্ত বর্মন কারো সাহায্য ছাড়া সহজে চলাফেরা করতে পারেন না
পা রক্ষা পেলেও আগের জীবনে আর ফিরতে পারেননি রজনী কান্ত বর্মন। দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ চিকিৎসায় ভারতের হাসপাতালে ব্যয় হয়েছে লাখ লাখ টাকা। নিজের সঞ্চয় ও সহায়-সম্বল যা ছিল, চিকিৎসার খরচ মেটাতে একে একে সেসবও বিক্রি করেছেন। এখন অবশিষ্ট বলতে প্রায় শুধু বসত ভিটাটুকু।
রজনী কান্ত বর্মণের কণ্ঠে তাই আক্ষেপ-দেশের জন্য এত কিছু করার পরও বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে তিনি পাননি।
রজনী কান্ত বর্মন বলেন, “ডান পা এখনো প্রায়ই অচল হয়ে যায়। কারও সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে কষ্ট হয়। চিকিৎসার পেছনে সহায়-সম্বল সবই শেষ করেছি। এখন শুধু ভিটেমাটি আঁকড়ে আছি। ভবিষ্যতের চিকিৎসা কীভাবে করব, সেটাই বুঝতে পারছি না।”
তার কষ্ট শুধু নিজের শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই নয়; পরিবার নিয়েও রয়েছে নানা দুশ্চিন্তা। ভারতে চিকিৎসাধীন থাকার সময় অসুস্থ হয়ে মারা যান তার স্ত্রী। নিজের শারীরিক অবস্থার কারণে শেষ সময়ে স্ত্রীকে বিদায় জানাতেও ভারতে যেতে পারেননি তিনি।
রজনী কান্ত বর্মনের দুই মেয়ে বর্তমানে ভারতের নানা বাড়িতে থেকে পড়ালেখা করছে। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে মা, ভাই-বোনসহ স্বজনদের দায়িত্বও দীর্ঘদিন ধরে তার কাঁধে। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সম্পদ বিক্রি করতে করতে এখন প্রায় নিঃস্ব তিনি।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় অন্য একটি বিষয়। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক রজনী রজনী কান্ত বর্মনের দাবি, অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার পরও ফুটবল অঙ্গন থেকে কেউ তার খোঁজ নেয়নি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন থেকেও অন্তত একবার ফোন করে তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার।
রজনী কান্ত বর্মন বলেন, “একসময় দেশের গৌরবের জন্য মাঠে খেলেছি। জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলাম। কিন্তু অসুস্থ হয়ে প্রায় এক বছর ধরে পড়ে আছি, কেউ খোঁজ নেয়নি। ফুটবল ফেডারেশন থেকেও একদিন ফোন করে একটু সান্ত্বনা পাইনি। এই বিষয়টাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।”
পিঙ্গাবহ গ্রামের মাঠ থেকেই একসময় ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়েছিল রজনী রজনী কান্ত বর্মনের। প্রতিভা আর পরিশ্রমে সেই গ্রামের মাঠ পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। একসময় তাকে একনজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করতেন মানুষ। আর এখন সেই বাড়ির সামনের বৈঠকখানাতেই অনেকটা নিঃসঙ্গ জীবন কাটছে তার।
জীবনের এই কঠিন সময়ে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও দেশের ফুটবল অঙ্গনের মানুষের সহযোগিতা চান জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক এই অধিনায়ক।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এএইচএম ফখরুল হোসাইন জানান, রজনী কান্ত বর্মনের অসহায়ত্বের বিষয়টি তাদের জানানো হয়নি। তিনি অথবা তার কোনো প্রতিনিধি উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তার সমস্যার কথা শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভুইয়া বলেন, সাবেক ফুটবলার রজনী কান্তের বর্তমান পরিস্থিতির কথা তাদের জানা নেই। তিনি যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখার কথাও জানান তিনি।








