সকলেই সুখে আছে ভাবলেও কখন যে সর্বগ্রাসী আগুন ঘুমকাতুরে শান্তিকে পুড়িয়ে দেয়, কেউ আন্দাজ করতে পারে না| তখনই তো প্রশ্ন জাগে— কোথায় যাচ্ছে পাখি, ফেলে তার ডানা! এই কার্যকরণের আপাত উৎসহীনতা আমাদেরকে হতবিহ্বল করে| তখনই হয়তো সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঘোড়া হাসে| ‘ঘোড়াহাসে’— কবি সরকার আমিনের সর্বসাম্প্রাতিক কাব্যগ্রন্থ| নামকবিতায় যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘হোক ভোট! লালজামা দেখে ছুটে যাক স্পেনের ষাঁড়!/ রয়ে যাব আমি মহাকালের প্রিজাইডিং অফিসার!’আমি পাথরে বীজ বপন করেছি কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘পাথরে চাষ করা যায় না| মাটি লাগে/ আমি পাথরে বীজ রোপণ করেছি/ পাথর, আশা করি, কথা বলা শিখবে/ পাথর, আশা করি, হাঁটতে শিখবে/ পাথর, আশা করি বঙ্গ-মাতৃক হৃদয় হবে|’সাধারণভাবে ভাবলে এ তো এক অসম্ভব কল্পনা| কিন্তু কবি বলেই সম্ভব| মনে পড়ে পিগম্যালিয়নের কথা| পাথর খোদাই করে নারী মূর্তি বানাতে বানাতে একদিন এমন এক রূপসী বানিয়ে ফেললেন যে নিজেই তার প্রেমে পড়ে গেলেন| কিন্তু সে তো পাথর| লাবণ্য ধরে না| রুক্ষতা ধরে শুধু| নিরেট তার অবয়ব| জীবনহীন, নিষ্প্রাণ সে| তাকে জীবন্তরূপে, রক্ত-মাংসীয়রূপে পেতে চান পিগম্যালিয়ন| উপায়হীন হয়ে এক দেবতার স্মরণাপন্ন হলেন| তিনি পরামর্শ দিলেন দেবতা জিউসের সাথে সাক্ষাৎ করে তার কাছে প্রাণ চাইতে| জিউস বললেন, যদি হৃদয় থেকে চাও তাহলেই তোমার পাথরের প্রেমাষ্প কে রমণীরূপে পাবে| ফিরে এসে পিগম্যালিয়ন চাইলেন হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশ থেকে| তারপর দেখলেন সেই অবিশ^াস্য ঘটনা| দেখলেন পাথরের খোদাই মূর্তি হয়ে উঠেছে সত্যিকারের রমণী|একজন শিল্পীর চরম আরাধ্যের জায়গা এরকম নিরঙ্কুশ হলে সে-শিল্প অবশ্যই জীবন্ত হয়ে উঠবে| কবি সরকার আমিনও এখানে পিগম্যালিয়নের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন| তিনি জানেন পাথরে চাষ করা যায় না— মাটি লাগে| কিন্তু তিনি জেনে শুনেই পাথরে চাষ করতে চান| বীজ রোপণ করেন| এবং আশা করেন পাথর বঙ্গ-মাতৃক হৃদয় পাবে| আর বঙ্গ-মাতৃক হৃদয়ের বড়ই অভাব যে এখন, এই সময়ে|আজ চারিদেকে পাথরের কারবার| প্রকৃত জীবনের সন্ধান সেখানে বৃথা| কবি সরকার আমিন পিগম্যালিয়ন বলেই সেই অসম্ভবের কাছে সম্ভাব্যতার বীজ বুনেছেন| এই বীজ ব্যর্থ হয়ে গেলে শিল্প ব্যর্থ হয়ে যাবে| স্বপ্নও ব্যর্থ হয়ে যাবে| আর স্বপ্ন ব্যর্থ হয়ে গেলে সব কিছু শূন্য হয়ে যায়| শূন্যতার ভেতরে শূন্যের অগণন ঢেউ শুধু ধ্বংসই আনবে| সৃষ্টি করবে না|নব্বই দশকের অন্যতম কবি সরকার আমিন তার ‘ঘোড়া হাসে’ কাব্যে এভাবেই নিজেকে তুলে ধরেছেন| ব্যবহার করেছেন ভিন্নার্থিক দার্শনিক ব্যঞ্জনা| ব্যবহার করেছেন সাম্প্রতিক ভাষাভঙ্গি| খুব সাধারণ কথন-ভঙ্গিতেও বলেছেন নানা কথা| তাও হয়ে উঠেছে বিশেষ| কবিতার ভঙ্গির কাছে যা চরম আরাধ্য| যেমন ‘নুড়ি টোকাতে টোকাতে সমুদ্রকে ভুলে গেলাম’— একটি কবিতার শিরোনাম| এর ভেতরে নিহিত কত-না কথা ও দার্শনিক প্রক্ষেপণ| ধুলো ও ধোঁয়া কবিতায় লিখেছেন, ‘রক্তাক্ত প্রান্তর শেষ হলে প্রচুর ধুলো ও ধোঁয়া দেখা যায়|’ সাধারণ ও স্বাভাবিক দৃশ্য বলেই মনে হবে| অথচ এর গভীরে রয়েছে অন্যবিধ ব্যঞ্জনা ও পর্যবেক্ষণ ভঙ্গি| এবং কৌশলও|  সাধারণত ধোঁয়া কলুষিত করে| ধোঁয়া একসময় কেটেও যায়| তখনই না পরিষ্কার হয়ে ওঠে আসল উদ্দেশ্য ও বিধেয়| ধুলোর কথাও বলেছেন| ধুলো উড়লে গায়ে এসে পড়ে, চোখে মুখে চুলেও এসে পড়ে| ধূলিঝড়ও হয়| তখন চেহারা তার আসলরূপ দেখায় না| ওই ধুলো ঝাড়তে হয়| তবেই না বের হয়ে আসে আসল চেহারা| কেউ কেউ চোখে ধুলো দিতে পারে| খানিক পরেই বের হয়ে আসে আসল চেহারা| এই চেহারা ধূলির ছোপ দেওয়া যেমন তেমনি ধুলাক্রান্ত ব্যক্তির তেমনি সমাজকে ধূলিময় করে দেয়া ব্যক্তিরও| চোহারা ধুলোয় আচ্ছাদিত হলে প্রকৃত চেহারা দেখা যায় না|নানা রকম কৌশল ও প্রবণতা ছাপিয়ে সরকার আমিনের কবিতা প্রায়শই স্বতন্ত্র চরণে এসে তার সমাপ্তি টানে| এবং তা বহুবিধ ব্যঞ্জনায় মুখরিত হয়| বারজাখ কবিতার শেষ চরণ যেমন, ‘আমরা দার্শনিক কারণ আমরা মূলত দর্শক’— জ্ঞান ফিরলে যেমন জ্ঞানী মনে করে কেউ কেউ| তেমনি আপাত জ্ঞান থাকলেও তা যে প্রকৃত জ্ঞান নয়| দর্শক অর্থে দার্শনিক শব্দটি ব্যবহারের মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ ও অক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়া আছে| আমরা সমাজে বাস করে এতসব অনাচার দেখছি| তা শুধু দেখেই যেতে হচ্ছে দর্শকের মতো| দৃশ্যের ওই ভাবনা আমাদেরকে আলোড়িত করলেও একরকম নিজস্ব দার্শনিক বক্তব্য দাঁড় করিয়ে নিজেদেরকে নিরাপদ আড়াল করছি| এভাবে কবিতায় ব্যবহৃত দার্শনিক শব্দটাই ভিন্নার্থে ব্যবহৃত হতে দেখি| একটি শব্দকে প্রচলিত অর্থ থেকে মুক্ত করে অন্য অর্থের প্রতিনিধি করে তুলতে না পারলে কবি হওয়া যায় না| ঘোড়া হাসে কাব্যের কবিতাগুলোয় ব্যবহৃত শব্দ গুলোতে ওই ভিন্নার্থের সুর বাজতে দেখি প্রায়ই|‘অন্ধকার বলে উঠে আমিই শিখা’ কবিতাটির উদ্ধৃতি না দিলে এই গ্রন্থের যেকোনো আলোচনা ব্যর্থ হতে বাধ্য— ‘গড়াতে গড়াতে কত দূর যাব আর!/ আমি মার্বেল, ছোটবেলার/ কিছুটা কান্নার কিছুটা খেলার!/ তুমি উড়ে যাচ্ছ, বিমানবালা!/ তুমি উড়ে যাচ্ছ, পাখি/ আমি বেঁধে রাখি/ কিছুটা আগুন, কিছুটা জ্বালা!/ ঘাসের সাগরে কে আছে শুয়ে!/ বিকাল বেলা! বাতাস কাঁদিছে/ দুপুরটা ছিল ছলা-কলাবৃহন্নলা/ প্রাণ বড়ো বোকা, এক গুঁয়ে!/ কিছুটা তৃপ্তি শেষে, যবনিকা/ অন্ধকার বলে ওঠে আমিই শিখা!’কবিতার কাছে আমরা কী চাই তা যেমন সীমাহীন আর অব্যাখ্যায়| তেমনি প্রকৃত কবিতাও অব্যাখ্যায়| শুধু আস্বাদন আর অনুভবে হৃদয়ের গভীরে লীন হয়ে যায় আর জেগে ওঠে আর অনুরণন তোলে| নিরন্তর এই চক্রের কোনো শেষ নেই যেন| যদি তা না হয় তাহলে কবিতার সফলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলা যায়ই|সরকার আমিন তার ঘোড়া হাসে কাব্যে দাহের কথা বলেছেন, দহনের কথা বলেছেন কিন্তু কোনো আগুন জ্বালাননি| শব্দকে অন্যতর অর্থের প্রতিনিধি হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে ওই দাহ, ওই দহন আর ওই আগুনের আঁচ তিনি দিয়েছেন| গভীর অনুধ্যানের মাধ্যমেই কেবল সেই আগুনের আঁচ টের পাওয়া যেতে পারে| তখনই শোনা যেতে পারে ঘোড়ার হাসি| যা আপাত ব্যঙ্গার্থে ব্যবহার করা হয়|গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ।