শেকড়উন্মূল বহুবর্ষী দেবদারু গাছটির মতো নেতিয়ে পড়েছেন আমার আব্বা|অথচ এককালে কর্মঠ, কঠোর নিয়মানুবর্তী, ভীষণ দাপুটে মানুষ ছিলেন, ঠিকঠাক করে গেছেন আপন যত কাজ| দেখেছি অন্যের মাঠের ফসল ফলাতে গিয়ে আব্বার মাঠখানিও ভরিয়ে তুলেছেন সুবর্ণফসলে| তখনও ছিল না, হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো কোনো জাল, নইলে আব্বার কাজের গতির কাছে হার মেনে যেতো, অন্তর্জাল| আব্বা কখনো মা ছাড়া ডাকেননি আমাদের অথচ আব্বাকে দেখলে আমরা ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতাম| এখন আব্বা আমার কাঁধ আর লাঠিতে ভর করে হাঁটার সময় ঠকঠক করে কাঁপেন| কারো বিপদের কথা শুনলে এখনও লাঠি আর চুরানব্বই বয়েসী সংখ্যার তকমাটি, ছুঁড়ে ফেলে, দু’হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যান, আমাদের পা ফেলবার বহু আগেই! তখন আব্বা যেনো চুরানব্বইয়ের টববগে এক তাজা তরুণ| হৃদয়টা উপুড় করে মানুষকে ভালোবাসার, মানুষের জন্যে কিছু করার আব্বার অসীম, দুর্মর আকাঙ্ক্ষা যুগ যুগ ধরে দেখে দেখে আমি অভিভূত হয়ে চলেছি| মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা, মমতায় আঁকড়ে ধরবার ক্ষমতা— আব্বার এই অস্থাবর সম্পদটুকু রক্তসূত্রে ধারণ করেছি আমি! আমার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কাছের মানুষগুলোর জন্যে আমি শর্তহীন আবেগ, মায়ার এক অতলান্তিক ঘোরে নিমজ্জমান হয়ে পড়ি, এর থেকে বাদ পড়ে না, পরিচিত, আমার গৃহকর্মী, প্রিয় গাছ, সম্পর্কহীন অপরিচিত জনও| মমতার নির্মল এ অনুভব শিউলি তলায় বিছিয়ে থাকা মেটে গন্ধের মতো ছড়িয়ে থাকে আমার নিভাঁজ হৃৎপিণ্ডে| এই শেষ বিকেলের আবছায়ায় বসে, মাঝে মাঝে নিজেই হিসেব কষতে বসি, কেন এই বেহিসেবি অনুভবের আদিখ্যেতা! কুণ্ঠিত হই, বিব্রত হই| কালের হাওয়ায় মরচে পড়া পিয়ানোর বেসুরো সুরটাকে মুছে ফেলতে চাই|
পারছি না! প্রাণপণ চেষ্টায়ও পারছি না! টের পাই এ বোধ আমার অস্থি, মজ্জায়, আমার লোহিত কণিকায় মিশে আছে| প্রশ্নবিদ্ধ আমি বোঝাতে পারি না, ˆপতৃকসূত্রে পাওয়া এ অস্থাবর সম্পদের আমি এক অনুগত উত্তরাধিকার মাত্র|








