- দাদা আপনাকে কী দেবো? নিন, পছন্দ করুন...অপ্রস্তুত আমিও মুহূর্তে তৈরি হলাম মেয়েটির আহ্বানে| কিন্তু কী নেবো! সহযাত্রী রায়েনাকে বললাম— রংটা আপনিই পছন্দ করে দিন| ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হলেন| আমি তো শুধু এদের সঙ্গ দিতে গিয়েছি, কিছু কিনবো বলে নয়| রায়েনা একজোড়া পাথর বসানো চুড়ি, দুটি লিপস্টিক আর একটা আই লাইনার পছন্দ করে প্যাকেট করতে বললেন| সহযাত্রী শাহীন তার ছোট্ট মেয়ের জন্য একটা মেকাপ বক্স আর নিজের জন্য টয়লেট পেপার কিনে সরে দাঁড়াল|দু’দিন আগেই ঢাকা থেকে কলকাতা এসেছি| আমরা তিনজন সেদিনই হাওড়া হয়ে গেলাম বর্ধমানের ছোট্ট শহর মেমারিতে| ‘জিরো পয়েন্ট’ পত্রিকার বর্ষপূতিতে আমাদের নিমন্ত্রণ| উৎসব শেষে পরদিন আবারো কলকাতায়| এখানে দু’চার দিন ঘোরাঘুরি করে ফিরে যাবো, এটাই প্লান|দুপুরের খাবার সারলাম পার্ক স্ট্রীটে ঢাকা রেস্টুরেন্টে| আমাদের হোটেলের একদম কাছাকাছি| ভাত, সবজি, চিংড়ি ভর্তা, ডাল| তিনজনের বিল চুয়ান্ন টাকা| বেশ সাশ্রয়ী মনে হলো| অবশ্য মূল্যটা ইন্ডিয়ান রুপিতে| এসি রেস্টুরেন্ট, পরিবেশনাও ভাল| একটু রেস্ট নিয়ে বিকেলে পায়দলে নিউমার্কেটে| উদ্দেশ্য, কিছু কেনাকাটা| কলকাতা নিউমার্কেটের ক্লক টাওয়ারের সামনেই ‘স্যুট এন্ড বুট’ দোকানটা খুঁজে পেতে দেরি হলো না| শাহীন দোকানের নামটা ঢাকা থেকেই মুখস্থ করে এনেছে, লোকেশনসহ|আমার তেমন কিছু কেনাকাটার ইচ্ছে না থাকলেও ওদের আগ্রহে যুক্ত হলাম| ডলার ভাঙ্গানো ইন্ডিয়ান রুপিগুলো সুযোগ পেয়ে যেন পকেট ফাঁকি দিয়ে গলে গলে বেরুতে থাকলো| বিনিময়ে হাতে জুটলো ক’টি সুদৃশ্য প্যাকেট|ফেরার পথে এক গ্লাস মাল্টার জুস খেয়ে ডলার খসানোর ব্যথা কিছুটা প্রশমিত করলাম| সন্ধ্যায় পাশের রুম থেকে সেজেগুঁজে আবির্ভূত হলেন রায়েনা| বল্লেন, হোটেলে বসে থেকে লাভ আছে! চলুন না ঘুরে আসি| কাউন্টারে চাবি রেখে বেরিয়ে পড়লাম তিনজনই| কিন্তু অচেনা কলকাতায় সন্ধ্যায় যাবো কোথায়? কদম ফেলতে ফেলতে আবার নিউ মার্কেট চত্বরে| ক্লক টাওয়ারের আশ-পাশটা হাতে-টানা রিক্সা আর হলুদ ক্যাব ঠাসাঠাসি| মানুষের স্রোত ঢাকার নিউ মার্কেটের মতোই| তবে প্যাডেলচালিত রিক্সা নেই| হাতেটানা রিক্সা অবশ্য কলকাতার সর্বত্র নেই| এ চত্বরেই বেশি| মনে হলো, কলকাতা কর্পোরেশন ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এ-ব্যবস্থা ধরে রেখেছে| পশু ক্লেশের সাথে মানব ক্লেশ নিয়ে যারা ভাবেন এ ব্যবস্থা নিশ্চয়ই তাদের সাথে মজা করার জন্য নয়| কারণ যারা টানাটানিতে ব্যস্ত তাদের ক্লেশ আছে বলে মনে হলো না, টাকা পেলেই তারা খুশি|রায়েনা একটা চিরকুট বের করে অলি-গলিতে কী যেন খুঁজছেন| এক জায়গায় থেমে সাইনবোর্ড পড়ে মৃদু হসে উচ্চারণ করলেন, “মনে রেখ” আমরা দুজনেই অনুগামী হলাম|সাজানো গোছানো কসমেটিকসের দোকান| ছোট্ট দোকানে ঠাসা মাল-পত্তর আলোর কারিশমায় ঝলমল করছে| দশ-বারো জনের বেশি কাস্টমার একসাথে দাঁড়াতে পারে না| পেছনে একটু অপেক্ষা করে রায়েনা এগিয়ে যান| আমি একটু দূরত্বে দাঁড়িয়ে| মালিক বোম্বাইয়া| নাদুস-নুদুস ফর্সা চেহারার সাথে টিকলো নাক ওদের দেহের গঠন দেখেই যায় চেনা| সেলস& গার্ল দু’জন বাঙালি| ওদের সুরেলা ঝংকারের বাগ বিনিময়ের সাথে সাথে মেনিকিউরড আঙ্গুলের ছন্দোময় সঞ্চালন আর কাজলটানা চোখের মনির গতিময়তা একটা চৌম্বকীয় আকর্ষণ ছড়িয়ে দিচ্ছে আগতদের মাঝে| মানিব্যাগ না খুলে কেউই পার পাচ্ছে না| আগতদের সর্বোচ্চ পরিতৃপ্তি দিয়ে মালের রশিদ কেটে দিচ্ছে তড়িত নিপুণতায়| ক্রেতাদের ভাবার অবকাশ নেই যে, দামে কেউ ঠকে যাচ্ছে|শেষাবধি আমিও রায়েনার পছন্দ করা শ’রুপি দামের একটা লিপস্টিক কিনে ছাড়পত্র পেলাম| কিন্তু কেন কিনলাম! কার জন্য কিনলাম! এ জবাবটা নিজের কাছে পেলাম না| চোখের সামনে ভেসে থাকলো ডানে দাঁড়ানো মেয়েটির লম্বা কাজলটানা দু’টি চোখের গভীর দৃষ্টি| মাঝারি লম্বা মেয়েটি দেখতে তেমন সুশ্রী নয়, শ্যামলা রংয়ের মাংসল দেহবল্লরী| তার নিকষিত কাল চোখের মনির ঘূর্ণন দেখে নিজেই যেন বেহাল হয়ে পড়েছি|তার বুকের অধঃপাড় ঘিরে বাঁধা ফিতেয় দেহের ঊর্ধাংশের পূর্ণতা বিকাশমান| যে কোনো পুরুষকে প্রথমেই থমকে দেয়ার হাতিয়ার মজুদ ওখানে|হোটেলে ফিরে সারাদিনের ক্রীত জিনিসপত্রের প্যাকেট খুলে নাড়াচাড়া করছি| রায়েনার মেলেধরা শাড়ির আঁচলের কারুকাজের মাঝে যেন প্রতিবি¤ি^ত হচ্ছে ওই দুটি ডাগর চোখের গভীর কাজল টানা দৃষ্টি| রায়েনা পাথর-বসানো চুড়ি দু’টি নিজ কব্জিতে গলিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ধ্যাৎ শব্দটি উচ্চারণ করে হতাশায়| একটু দম নিয়ে নিজে নিজেই বলতে থাকে, লাল পাথরেরটাই ভাল ছিল| তার উচ্চারিত শব্দটি কানে বাজতেই বল্লাম, তবে পাল্টে আনুন|এটুকু প্রশ্রয়ে লাফিয়ে উঠলেন রায়েনা| চলুন না, একটু ঘুরে আসি| শাহীন চট করে বালিশে গা এলিয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ ঢেকে বলল, আমি টায়ার্ড|- থাক আপনাকে যেতে হবে না| আমার দিকে তাকিয়ে রায়েনা বল্লেন, কাল গেলে যদি পাল্টে না দেয়| আমার চোখে তখন অন্য চোখের দৃষ্টি| একটু নিরুত্তাপ স্বরে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বললাম, মাল্টার জুস& খাওয়াতে হবে| শাহীন জানিয়ে দিল, মার্কেট নটায় বন্ধ হয়| রাতের খাবার সাড়ে নটায়|দেখতে-শুনতে ক্ষীণকায় মধ্যবয়েসি নারী হলেও ক্লান্তিবিহীন| গত তিন দিনের ঝটিকা সফরে এ-নারীর কণ্ঠে একবারও উচ্চারিত হয়নি, ইশ&! আর পারি না| সেই রায়েনার পেছন পেছন আমিও মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁটতে থাকি|দোকানের ঘড়িতে রাত সাড়ে আটটা| ভিড় তেমন নেই| মালিক, একটু আড়ালে বসে হিসেব নিয়ে ব্যস্ত| আমাদের ফিরে আসায় ক্লান্ত মেয়ে দুটি যেন আবার জ্বলে উঠলো| সেই নিকষ কালো চোখের মেয়েটি ঠোঁটে আরেক প্রস্থ লিপিষ্টিকের রং মেখে উঠে দাঁড়ালো| আমার দিকে দৃষ্টি ফেলে চোখের ভাষায় বলল, দাদা আরো কিছু লাগবে বুঝি?রায়েনা এতো করে বলার পরেও কোনভাবেই পাশের মেয়েটি চুড়ি বদলাতে রাজি হলো না|- দিদি, আপনিই বলুন, দোকানের বাইরে মাল গেলে সেকেন্ড হ্যান্ড হয়ে যায় না? এ মাল অন্য কাষ্টমারকে কী করে দেখাবো! জানেন তো, আমাদের নামকরা দোকান| কাস্টমারকে কোনভাবেই আমরা ঠকাতে পারি না|নিকষ কালো চোখের মেয়েটির ভাসা ভাসা দৃষ্টির সাথে আমার ক্ষুদ্র দৃষ্টির বিনিময় হলো| স্বভাবসুলভ ভঙ্গি নিয়ে বল্লো, আপনাকে কি দেব দাদা? তার অক্ষিগোলকের বিকিরণের ধাক্কা সামলাবার আগেই ঠোঁট ফস্কে বেরিয়ে গেল, টুথ পেস্ট! দাম চুকিয়ে বের হবার মুখে আর একবার মেয়েটির দিকে তাকালাম| একটু হাসি দিতেই ওর নিটোল দাঁতের সারি ঝিঁকিয়ে উঠল| টাওয়ারের সামনে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায় রায়েনা| একদম আমার মুখোমুখি| নিজে নিজেই এক ঝলক হেসে বল্লেন মশায়, আস্ত একখানা পেস্ট তো দেখলাম কাল ব্যাগ থেকে বের করলেন| এক রাতেই পুরোটা খেয়ে ফেলেছেন বুঝি!খোঁচটা হজম করে বললাম, কী করবো বলুন, ওই চোখের দৃষ্টি আমার পুরো মেমোরিটাই ইরেজ করে দিয়েছে| আরেক দফা হেসে বললেন, সত্যি মেয়ে হয়েও আমি ওর চোখের প্রেমে মজে গেছি|- দেখুন, আপনার এ প্রশ্রয় বাক্যে আমি কিন্তু মাটি ছাড়া হয়ে যাচ্ছি| কোথাও হারিয়ে গেলে দুষবেন না, প্লিজ|- আগে চলুন খেয়েনি’| পেটে একটা কিছু পড়লে ওজনটাও বাড়বে| তখন আর হাওয়ায় উড়তে হবে না| পদতলে মাটির ছোঁয়া পাবেন| এ বিদেশ-বিভুঁয়ে হারিয়ে যাবেন না, সাবধান| শেষে আপনার পরিত্যক্ত রুমাল শুঁকে শুঁকে কাঁদতে পারবো না|বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে আবার নিউ মার্কেট চত্বর| উদ্দেশ্য, শান্তিনিকেতনি ব্যাগ কেনা| ফুটপাতে এক দোকানিকে জিজ্ঞেস করতেই বাঁ দিকটা নির্দেশ করলো| দু’কদম এগুতেই পাঞ্জাবি পরা একজন এগিয়ে আসে| বলল, চলুন আমার সাথে| লোকটা আগে আগে চলছে| একটা গলি পার হয়ে আমরা দাঁড়িয়ে যাই|- এইতো সামনে, আসুন|আমরা তাকে ফলো করি| এ-গলি থেকে ও-গলি| প্রায় আধা কিলোমিটার হাঁটিয়ে ছাড়লো| বললাম, কোথায় শান্তি নিকেতনি ব্যাগ?চারদিকে সার সার অসংখ্য দোকান| শাড়ি, থ্রী পিস, পাঞ্জাবি, জুতো, চাদর, শাল আলোয় চমকাচ্ছে| লোকটি একটু হেসে বলল, আমি ভাবলুম কাশ্মিরি শাল খুঁজছেন| বাংলাদেশের সবাই তো তাই চায়| দেখুন না নেড়েচেড়ে, পছন্দ হলে নেবেন| পাশের একটা দোকান থেকে লোকটি চায়ের ভাঁড় হাতে তুলে নিল নিশ্চিন্তে|কৌতূহল নিয়ে শাহীন একটা শাল উল্টে-পাল্টে দেখে| দোকানী বলল, এখন তো অফসিজন, কম দামেই পাবেন|দাম চাইলো তেরশো রুপি| “একদম অরিজিনাল কাশ্মিরি শাল| ভাল করে দেখুন, হানড্রেড পার্সেন্ট উল| আমাদের কাশ্মিরের কারিগররা ˆতরি করে| এ মাল আর কোথাও পাবেন না”|বাধ্য হয়েই শাহীনকে আধাদাম বলতে হয়| শাল ভাঁজ করতে করতে দোকানী বিড়বিড় করে বলে, “আরেকটু বাড়িয়ে না দিলে লস& হয়ে যাবে”| আমরা দোকানের আড়াল হবার আগেই ডাক পড়ে| একই শাল আমার কৌতূহলের দাম আড়াইশ’ বলতেই ভাঁজ করে দিল| বেরিয়ে এসে ভাবলাম, দুজনেই কমবেশি ধরা খেয়েছি| রায়েনা সুযোগ বুঝে বল্লেন, বিকেলে এসে আমি এটাই দেড়শ’ দিয়ে নিয়ে যাব|ফেরার পথে অলি-গলি ঘুরতে ঘুরতে ইচ্ছে করেই হারিয়ে গেলাম| ‘মনে রেখ’ দোকানটা খুঁজে পেতে দেরি হলো না| ভেবেছিলাম চোরাগোপ্তা দৃষ্টিতে ওই কাজলঘেরা চোখ দুটো এক-দু’পলক দেখে ফিরবো| দোকানে কাস্টমার বেশি ছিল না| ওর চোখে দৃষ্টি পড়তেই যেন সম্মোহিত হয়ে পড়লাম| পায়ে পায়ে এগুলাম ওর নিশ্বাসের কাছাকাছি| এবার মেয়েটি নিজ থেকেই এটা ওটা তুলে দিল| ‘না’ শব্দটা উচ্চারণ করতে পারলাম না| ক্যালকুলেটরে ওর অঙ্গুলী সঞ্চালন দেখে ভাবলাম, পকেটের শেষ অবস্থাতো জানা নেই| না, শেষাবধি মানিব্যাগে ইজ্জত লুকানোই ছিল|- আবার আসবেন, আমন্ত্রন ধ্বনিটা যেন হৃৎপিণ্ডে প্রতিধ্বনিত হলো| তার অক্ষিগোলকের ঘূর্ণনের সাথে মিষ্টি হাসি আমার পদক্ষেপ ভারি করে তুললো| হোটেলে ফিরে দুজনের ঝাড়ি খেলাম| হাতের প্যাকেটগুলো লুকোতে গিয়ে ধরা পড়লাম রায়েনার কাছে|- তাইতো বলি, হারালো কোথায়! একদম কাজলদিঘিতে!শাহীন চিৎ হয়ে শুয়ে আছে| ছাদের দিকে তাকিয়ে জাবর কাটতে কাটতে বল্লো, দাদা আপনার পাসপোর্ট কিন্তু আমার কাছে| যা শুরু করেছেন পরে কিন্তু পুশ-ইন, পুশ-আউটের গ্যাড়াকলে পড়তে হবে| কালকের দিনটা আছি পরশু ভোর ছ’টায় বাস ছাড়বে| কথাটা মাথায় রাখবেন|পরদিন সকালে কলকাতা জাদুঘর দেখে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম| শাহীন জানালো, সন্ধ্যায় গড়ের মাঠে সময় কাটাবো| কারো কিছু কেনাকাটা থাকলে এরই মধ্যে সেরে নিতে হবে| রায়েনা তার রুমে চলে গেল| শাহীনের ঘুমের ভাব দেখে আমি বেরিয়ে পড়লাম| ‘মনে রেখ’-এ গিয়ে দেখি মেয়েটি নেই| মনটা দমে গেল| কলকাতা ছাড়ার আগে বুঝি ওই দুটি চোখ আর দেখা হলো না| ফিরে এসে ক্লক টাওয়ারের ছায়ায় মাল্টার জুস খাই|হঠাৎ দেখি হাতেটানা রিক্সা থেকে মেয়েটি নেমে এলো| তার কাঁধে একটা শিশু ঘুমিয়ে| মেয়েটি আমার সামনে এসে দাঁড়াল সরাসরি|“আমার নাম অনিতা| আর এটি আমার তিন বছরের মেয়ে, জয়া”| মাথা ঘুরিয়ে ঘুমন্ত মেয়েটির ঠোঁটে-মুখে চুমু খেল অনিতা|আমি ধাতস্থ হওয়ার আগেই অনিতা একটা হলুদ ক্যাব ইশারা করল| দরজা খুলে আমাকে বলল, উঠুন| আমার নিমরাজি ভাব-সাব দেখে অধিকার প্রয়োগ করল যেন, ‘আরে উঠুন তো’|- রায়েনা দিদি বলেছে আপনার কথা| আজ ছুটি নিয়েছি আপনাকে সঙ্গ দেব বলে| সময়টাও ঠিক করে দিয়েছেন দিদি| ওর চোখে দুষ্টুমির হাসি| আমার অবস্থান যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে| মনে হলো, প্রায় দিগম্বর হয়ে গেছি| ক্যাব ছুটছে গড়ের মাঠের পাশ দিয়ে| বুঝলাম, আমাদের সহযাত্রীটি ওকে আমার সম্পর্কে কিছু একটা বলেছে| কিন্তু কখন কী বলল! মেয়েটি অবলীলায় আমার নামটি উচ্চারণ করল|গঙ্গার ধারে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিলাম| অদূরেই বিদ্যাসাগর ঝুলন্ত ব্রিজ| প্রচণ্ড আটুনি দিয়ে গঙ্গার এপার-ওপার বেঁধে রেখেছে| গঙ্গাতীরে স্থানে স্থানে পাকা সিঁড়ি নেমে গেছে জলের তল অব্দি| ভক্তরা কেউ কেউ পবিত্র গঙ্গার জল স্পর্শ করছে, কেউ কেউ জল তুলে নিচ্ছে ঘটিতে বা বোতলে|এদিকটায় একটা বটবৃক্ষকে কেন্দ্র করে সান বাঁধানো বেদী| কজন মহিলা সম্ভবত টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছেন| ফেরিঅলাদের চানাচুর, ভোজিয়া, চীপস&, কেউ কেউ কিনে নিয়ে চলছে আর খাচ্ছে| এক বিহারিকে দেখলাম একটা ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে ভেলপুরি বানিয়ে বিক্রি করছে| আমার কাছে এটা নতুন আইটেম মনে হলো|অনিতার আহ্বানে একটা সিঁড়িতে বসতে বাধ্য হলাম|- কদিন থেকে খুব লুকোচুরি হচ্ছিল, তাই না? আমিও সুযোগ বুঝে ভালই মাল খসিয়েছি|এবার মেয়েটি গঙ্গাঁর জলে দৃষ্টি ফেলে আস্তে আস্তে বলে যেতে লাগলো, আপনি তো লেখক| হয়তো বা আমার মধ্যে কিছু খুঁজছেন| আমার তো কিছুই নেই, দুটো চোখ ছাড়া| একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এ দুটোই আমার আজন্ম শত্রু| আমাকে ঠকিয়েছে| ওর বাবাও| আমাদের বিয়ে হয়নি| একই ক্লাসে পড়তাম দুজনে| সুযোগ পেলেই আমরা এক সাথে ঘুরতাম| ও আমার চোখ নিয়ে কাব্যি করতো, ছবি আঁকতো| ছবিতে চুমু খেতে খেতে একদিন স্পর্শ করলো| আমিও স্পৃষ্ট হ’লাম| দুজনের নিশ্বাসের বায়ু উত্তপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়লো দেহে| এভাবেই চলছিল সবকিছু, কাব্যি করা আর ছবি আঁকা| একদিন বুঝতে পারলাম আমার ভেতরে উদ্দাম ক্ষণগুলোর বীজ বাড়ন্ত| সুশীল বলেছিল খসিয়ে ফেলতে| আমি রাজি হইনি| ও পালিয়ে গেল| কলংকিনী হয়ে ঘর ছাড়লাম আমি|সূর্যের আলোয় মেঘের ছায়া পড়েছে| গঙ্গার জল ক্রমশ গভীর কাল হয়ে মৃদু ঢেউ তুলে তীরে এসে ভাংগছে| অনিতার দৃষ্টি গঙ্গাঁর কালজলে মিশে যাচ্ছিল| আর নিজেকে তীরে আছড়ে আছড়ে জন্মের প্রতিশোধ নিচ্ছিল যেন|হঠাৎ জয়ার ঘুম ভেঙ্গে গেল| দৃষ্টি মেলে তাকাল, এ-দিক ও-দিক| আমার দিকে তাকাতেই দেখলাম, মা-মেয়ের একই চোখ, দৃষ্টি ভিন্ন| বাচ্চা মেয়েটি হঠাৎ অবাক করে দুহাত বাড়িয়ে দিলো আমার দিকে| আমিও হাত বাড়ালাম| দেখি হঠাৎ পেছন থেকে ভেলপুরির একটা ঠোঙ্গা বাড়িয়ে ধরেছেন রায়েনা| ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি|- কী লেখক? গল্প হলো!অনিতার দু’চোখে নীবর বৃষ্টির ধারা| ক্রমশ গণ্ড বেয়ে নেমে যাচ্ছে| একটু আগে বয়ে যাওয়া এক পশলা বৃষ্টি গঙ্গাঁর জলে মিশে গঙ্গার স্রোতের গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে| অনিতার চোখের নোনা জলের ধারা গঙ্গার জল অবধি পৌঁছুবে না, কিন্তু তার অন্তরের গঙ্গায় নিশ্চয় এ মুহূর্তে তরঙ্গ খেলছে| পরক্ষণেই অনিতা নিজেই মিশে গেল জনতার স্রোতে|
রাজনীতি
দু’টি চোখের কাব্য

শেয়ার করুন







