চুয়াডাঙ্গা সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) ঘিরে ফের নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। একসময় বিতর্কিত হয়ে বদলি হওয়া কম্পাউন্ডার রুহুল আমীন পুনরায় একই প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর আবাসিক ছাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছেন চুয়াডাঙ্গা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) মো. জাকির হোসেন। হুটহাট সন্ধ্যা ও রাতে চুয়াডাঙ্গা সরকারি শিশু পরিবারে যাওয়া এবং মেয়েদের ডরমিটরিতে গিয়ে তাদের ভিডিও ধারণের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
বিতর্কিত কম্পাউন্ডারকে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রবেশন অফিস থেকে আবারও শিশু পরিবারে যোগদান করানো এবং সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালকের এমন হুটহাট পরিদর্শনে উদ্বীগ্ন ছাত্রীরা।
এছাড়া বর্তমান এই উপপরিচালকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। তিনি মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলায় সহকারী পরিচালক (এডি) হিসেবে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। তখন তিনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে এডি থেকে ডিডি হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে মাগুরায় পোস্টিং হয়। এরপর কয়েক মাস আগে চুয়াডাঙ্গায় পোস্টিং হয় জাকির হোসেনের।
আরও পড়ুন
অস্তিত্বহীন সংস্থায় সমাজসেবার অনুদান
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২১ সালে কম্পাউন্ডার রুহুল আমীনের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অমান্য, প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলাভঙ্গ, সরকারি শিশু পরিবারের নিবাসীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও অনৈতিক আচরণ, নিবাসীদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত করার মতো কর্মকাণ্ড এবং দায়িত্বে অবহেলার কারণে এক নিবাসী কিশোরীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠলে চুয়াডাঙ্গা থেকে হবিগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে (বালক) বদলি করা হয়। পরে তিনি হবিগঞ্জে দেড় বছর ও পরবর্তীতে মেহেরপুরে শিশু পরিবারে দায়িত্ব পালন করেন।
‘স্যার প্রায়ই রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে পূর্বঘোষণা ছাড়াই আমাদের এখানে আসেন। অনেক সময় ডরমিটরিতে ঢুকে ভিডিও করেন। আমরা এখন বড় হয়ে গেছি। এতে খুব অস্বস্তি লাগে। ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারিনি।’
এরপর ২০২৪ সালে আবারো চুয়াডাঙ্গা শিশু পরিবারে পোস্টিং হলে তৎকালীন চুয়াডাঙ্গা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) সিদ্দিকা সোহেলী রশীদ প্রবেশন অফিসে সংযুক্ত করেন। এরপর রুহুল আমীন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সমাজসেবা অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। এরমধ্যে সিদ্দিকা সোহেলী রশীদের বদলি হলে রুহুল আমীন আবার প্রবেশন অফিসে ফিরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এরমধ্যে বর্তমান উপপরিচালক জাকির হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর কম্পাউন্ডার রহুল আমীনকে আবার চুয়াডাঙ্গা সরকারি শিশু পরিবারে যোগদান করান। এ নিয়ে শিশু পরিবারের নিবাসীদের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ দেখা দেয়।
আরও জানা যায়, ২০২০ সালে কম্পাউন্ডার রুহুল আমীনের দায়িত্বে অবহেলার কারণে নিবাসী সাথী নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়। এছাড়া নিবাসী মেয়েদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা, ব্যক্তিগত কাজে তাদের ব্যবহার এবং দুর্ব্যবহারের মতো অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে শিশু পরিবারে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নিবাসী ছাত্রী অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের এখানে রুহুল আমীন স্যার আবার এসেছেন। ওনার অবহেলার কারণে আমাদের এক আপু কয়েক বছর আগে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিল। ওই রুহুল স্যার আমাদের অনেক আপুর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। বাড়ির কাজ করিয়েছেন। তিনি আবার এসেছেন। আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারছি না।’
আরও পড়ুন
সমাজসেবার সহায়তা / টাকা পাওয়ার আগেই মারা যান রোগী
এদিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক জাকির হোসেন বিকেলে, সন্ধ্যায়, এমনকি রাতেও শিশু পরিবারে আসেন বলে নিবাসী ছাত্রীরা অভিযোগ করেছেন। যদিও তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি। তবে জাগো নিউজের কাছে কয়েকজন ছাত্রীর ভিডিও বক্তব্য এসেছে। সেই বক্তব্যে নিবাসী ছাত্রীরা নানা অভিযোগ করেছেন। তবে উপপরিচালকের বিষয়ে রুহুল আমীন বার বার বলতে থাকেন, ‘ডিডি স্যার খুব সৎ ও ভালো মানুষ। তিনি আসার পর চুয়াডাঙ্গা শিশু পরিবারের চিত্র পরিবর্তন হয়ে গেছে।’
‘স্যার প্রায়ই সন্ধ্যায় ও রাতে ডরমিটরিতে এসেছেন। আমাদের ভিডিও করে নিয়ে গেছেন। এটা আমাদের ভালো লাগেনি।’
ওই ভিডিও বক্তব্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুলপড়ুয়া নিবাসী ছাত্রী বলেন, ‘স্যার প্রায়ই রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে পূর্বঘোষণা ছাড়াই আমাদের এখানে আসেন। অনেক সময় ডরমিটরিতে ঢুকে ভিডিও করেন। আমরা এখন বড় হয়ে গেছি। এতে খুব অস্বস্তি লাগে। ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারিনি।’
আরেক নিবাসী ছাত্রী বলেন, ‘স্যার প্রায়ই সন্ধ্যায় ও রাতে ডরমিটরিতে এসেছেন। আমাদের ভিডিও করে নিয়ে গেছেন। এটা আমাদের ভালো লাগেনি।’
অপর এক নিবাসী ছাত্রী বলেন, ‘আগের কোনো স্যার এভাবে রাতের বেলা হঠাৎ করে চলে আসতেন না। বিষয়টি আমাদের ভালো লাগছে না। আমরা নিরাপদ বোধ করছি না।’
এসব বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক রোম্মানা বিলকিসের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটিতে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন
নাম-পরিচয়হীন শিশুর অভিভাবকত্ব দিতে হচ্ছে আইন
এদিকে উপপরিচালকের বিরুদ্ধে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগের কপি জাগো নিউজের হাতে এসেছে। অভিযোগ দাখিলকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিচয় প্রকাশে অনীহা জানান।
ওই অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ‘চুয়াডাঙ্গা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের বর্তমান উপপরিচালক মো. জাকির হোসেন আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে তিনি মেহেরপুর জেলায় সহকারী পরিচালক পদে থাকাকালে তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যদিও সাবেক মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বর্তমানে কারাগারে আছেন।’
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ‘তিনি কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছেন, নিয়মিত অফিসে দেরিতে আসেন এবং বর্তমান সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’
লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মাগুরায় কর্মরত অবস্থায় একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় তাকে চুয়াডাঙ্গায় বদলি করা হয়। এর আগে মেহেরপুরে কর্মরত থাকাকালে তিনি তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি নারী সহকর্মীদের সঙ্গেও তিনি রূঢ় আচরণ করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
এদিকে কয়েকজন আবাসিক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন উপপরিচালক যোগদানের পর তার সঙ্গে কম্পাউন্ডার রুহুল আমীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপরই প্রবেশন শাখা থেকে তাকে আবার শিশু পরিবারে দায়িত্ব দেওয়া হয়। শিশু পরিবারে গেলে কম্পাউন্ডার রুহুল আমীন তার সঙ্গে থাকতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা শিশু পরিবারের বর্তমান কম্পাউন্ডার রুহুল আমীন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল, সেগুলো বেনামি অভিযোগ ছিল। সমাজসেবা অধিদপ্তর তদন্ত করে কোনো সত্যতা পায়নি। ২০২১ সালে অভিযোগের পর আমাকে বদলি করা হয়। পরে হবিগঞ্জ ও মেহেরপুরে দায়িত্ব পালন করে আবার চুয়াডাঙ্গায় এসেছি। আমার মূল পদই শিশু পরিবারের কম্পাউন্ডার।’
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘রুহুল আমীনের পদায়ন সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে করা হয়েছে। তার মূল কর্মস্থলই শিশু পরিবার। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে কোথাও পদায়ন করিনি। এটা অধিদপ্তরের বিষয়।’
রাতের বেলায় শিশু পরিবারে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যার পর প্রয়োজনে আমি শিশু পরিবারে গেছি। তবে রাতে ডরমিটরিতে গিয়ে মেয়েদের ভিডিও ধারণ করার অভিযোগ সঠিক নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘একদিন রাত ৯টার দিকে আমি শিশু পরিবারে গিয়েছিলাম। সম্ভবত সেদিন কোনো কর্মসূচি ছিল। সব নিবাসী শিশু সেখানে ছিল। বর্তমানে যে ৩০ জন নিবাসী রয়েছে, তারা সবাই সেখানে আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য মোবাইলে ভিডিও করেছিলাম। কারণ আমি যোগদানের পর নানা অনিয়ম খুঁজে পাচ্ছি। বিশেষ করে নিবাসীর সংখ্যায় গরমিল রয়েছে। যাই হোক, বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’
এসময় ৩০ জন নিবাসী থাকলেও মাসিক বিলের ক্ষেত্রে আরও বেশি নিবাসী দেখানো হয় বলে তিনি শিশু পরিবারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তবে এসব অনিয়মের তথ্য প্রমাণ চাইলে তা তিনি জাগো নিউজকে দেননি।
তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করেই আমাকে এখানে দায়িত্ব দিয়েছে। আমার বিষয়ে খোঁজ নিতে পারেন। আমি শিশু পরিবারের অনিয়ম দূর করার চেষ্টা করছি। এ কারণেই হয়ত কেউ ভেতরে ভেতরে এসব অভিযোগ দিচ্ছে।’
এফএ/জেআইএম








