কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। বর্ষার এই সময় হাওর দেখে মনে হয় যেন কূলহীন সাগর। দ্বীপের মতো ভেসে থাকা গ্রামগুলো ছবির মতো দেখায়। তবে, সার্বিক অব্যবস্থাপনায় ভরা এই মৌসুমে পর্যটক শূন্য বিপুল সম্ভাবনাময় এই পর্যটন স্পট।
অভিযোগ উঠেছে, পর্যটকদের কাছ থেকে ট্রলারের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, খাবারের লাগামহীন দাম, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে দূর-দূরান্তের পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এই পর্যটনকেন্দ্রটি থেকে।
ঘুরতে আসা পর্যটকরা যা বলছেন: ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে ঘুরতে আসা সাব্বির হোসাইন ফুয়াদ রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “ফেসবুকে হাওরের বিভিন্ন ছবি দেখে মন বেকুল ছিল কখন আসব। এখানে এসে বুঝতে পেরেছি, সার্বিক অব্যবস্থাপনা আর বিভিন্ন সিন্ডিকেটের জালে আটকা পরেছে হাওরের পর্যটন। এখানে যে যার মতো করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে পর্যটকদের কাছ থেকে। তাই এখানে প্রশাসনের আরো তদারকি প্রয়োজন।”
পর্যটকদের সুবিধার জন্য নিকলী হাওরের বেড়িবাঁধ এলাকায় গড়ে উঠেছে কিছু হোটেল ও রেস্তোরা। এসব হোটেলে পর্যটকরা থাকার পাশাপাশি হাওরের বিভিন্ন প্রজাতি মাছের স্বাদ নিতে পারেন। সেখানেও তৈরি হয়েছে বিপত্তি। হোটেলগুলোতে খাবারের মূল্য প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত রাখা হচ্ছে এমন অভিযোগ করেন ময়মনসিংহ থেকে আসা মো. ফখরুল আলম।
তিনি বলেন, “আমি এর আগেও এখানে এসেছি, কিন্তু এমন পরিস্থিতির শিকার হইনি। আমার আত্মীয়-স্বজনের বায়নায় এসেছি এখানে, তবে দুপুরের খাবারে মূল্য খুবই বেশি মনে হয়েছে আমার কাছে। যেহেতু, এখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক পর্যটক আসেন, অন্তত তাদের কথা মাথায় রেখে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো উচিত বলে মনে করছি।”
নরসিংদী থেকে হাওরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঘুরতে আসা সুমন মিয়ার বলেন, “আমি সৌদি আরবে থাকি, ছুটিতে দেশে এসেছি। স্ত্রীর বায়না ছিল হাওর দেখবে, তাই আসলাম। এসে হতাশ হলাম। পর্যটকদের জন্য যেসব সুবিধা থাকার কথা, এর কোনটিই এখানে নেই। নৌকা ভাড়া যেমন ইচ্ছে তেমন চাচ্ছেন মাঝিরা। এ বিষয়ে সরকারি কোনো নির্দেশনা নেই। সারাদিনের জন্য যারা এখানে আসেন তাদের জন্য টয়লেটের ব্যবস্থা নেই, নৌকায় লাইফ জ্যাকেট নেই। হাওর পাড়ের পরিবেশ নোংরা, অপরিচ্ছন্ন। নিরাপত্তার জন্য কোনো পুলিশও চোখে পড়েনি।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মাঝিরাই যা বলছেন: পর্যটক না থাকায় ফুচকা আর চটপটির দোকানে অলস সময় কাটাচ্ছিলেন আক্কাস আলী। কেমন বিক্রি হচ্ছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “দুই বছর আগে অনেক মানুষ আইতো, অহন মানুষ আইতাছে না। বেচাকেনা অক্করে মন্দা, বউ-পুলাপাইন লইয়া চলনের ক্ষমতা আর নাই। যারা ঘুরতো আয়ে খালি কয় নৌকা ভাড়া বেশি, খাওনের দাম বেশি, আর কয় সিন্ডিকেট। আমরা তো অতকিছু বুঝি না। বুঝি একটাই, আগের মতোন মানুষ আয়ুক আমরাও যেন ব্যবসা করে চলতাম পারি।”
পর্যটকদের জন্য অপেক্ষায় থাকা ট্রলার
চটপটি দোকানি আক্কাস আলীর মতো পর্যটকদের জন্য অপেক্ষা করেন নৌকার মাঝিরা। শতাধিক নৌকা (ইঞ্জিন চালিত), স্পিডবোট বেড়িবাঁধে রেখে তারাও অলস সময় কাটাচ্ছেন। তাছাড়া, অটোরিকশাচালক, হোটেল মালিক-কর্মচারী, বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য এবং শো-পিস ব্যবসায়ীরাও এখন অপেক্ষা করেন পর্যটকদের।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বছর দশেক আগে বন্যার পানি থেকে নিকলী শহরকে রক্ষার জন্য হাওর পাড়ে দুই কিলোমিটার পাকা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পর্যটকদের পদচারণা শুরু হয়। কিছুদিন পর জেলার শতভাগ হাওর অধ্যুশিত তিন উপজেলা ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম হয়ে ওঠে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। ৩০ কিলোমিটার দৃষ্টিনন্দন অলওয়েদার সড়ক তিন উপজেলাকে সংযুক্ত করে। কিন্তু গেলো দুই বছর ধরে এমন নৈস্বর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছেন না প্রকৃতিপ্রেমীরা। আগের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ এখন হাওরে আসছেন।
নিকলী বেড়িবাঁধের নৌকার মাঝি মেহেদী হাসান বলেন, “এবার হাওরের মাঝিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। শত শত ট্রলার ও নৌকা ঘাটে বেঁধে রাখতে হচ্ছে। গত বছরগুলোতে এই সময়ে আমাদের দম ফেলার সময় ছিল না। একটা ট্রিপ শেষ করেই আরেকটার জন্য ছুটতাম। আর এবার সারাদিন বসে থেকেও একটা ভাড়ার দেখা মিলছে না। ট্রলার বানাতে লাখ টাকা ঋণ নিয়েছি, এখন সেই কিস্তি দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।”
হাওরে সড়কের পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন খাবারের দোকান
তিনি আরো বলেন, “আগে দল বেধে মানুষজন হাওরে আসতো ঘুরতে। নৌকা ভাড়া করে পানিতে ভাসতে ভাসতে নাচ-গান করতো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে অলৌকিকভাবে নৌকায় চরে গান-বাজনা বন্ধ ও বাধা দেওয়া হচ্ছে। কে বা কারা এগুলো করছে, সেটা বলা মুশকিল। আর নৌকার ভাড়া আমরা খুব বেশি নেই না। দরদাম করেই টাকা নেওয়া হয়।”
অপর নৌকার মাঝি রাব্বুল মিয়া জানান, সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার মানুষের ভিড় বেশি থাকে। নিকলী বেড়িবাঁধ থেকে অনেকেই নৌকা নিয়ে মিঠামইন জিরো পয়েন্টে যান। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলে ৬-৭ হাজার টাকা ভাড়া নেই। তাছাড়া, নিকলীতে আরেকটি সুন্দর জায়গা হলো ছাতিরচর। সেখানে অনেক হিজল-করচ বন আছে। দর্শনার্থীরা সেখানে গিয়েও অনেক আনন্দ করেন। সেখানে গেলে আমরা তাদের কাছে ৩ হাজার টাকা ভাড়া নেই। শুক্র ও শনিবার বাদে ভাড়া আরো কম নিয়ে থাকি। অন্যান্য সময়ের মতো এবার উপজেলা থেকে আমাদেরকে কোনো ভাড়াও নির্ধারণ করে দেয়নি।”
রয়েছে নিরাপত্তার শঙ্কা: হাওরে বেশ কিছুদিন ধরে সন্ধ্যার পর ডাকাতির ঘটনাও ঘটেছে। গত ৭ জুন মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর ব্রিজের দক্ষিণ পাশে করিমগঞ্জগামী একটি পর্যটকবাহী ট্রলারে ১০ থেকে ১২ সদস্যের একটি ডাকাত দল দেশীয় অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে ডাকাতি চালায়। এ ঘটনায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা, পাঁচটি মোবাইল ফোন, রামদা, লোহার রড এবং ২০টি বল্লম উদ্ধার হয়।
এরপর হাওর অঞ্চলে নৌ-ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে গত ১৭ জুন থেকে সন্ধ্যা ৬টার পর যাত্রীবাহী নৌকা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।
এরপরও থেকে থাকেনি ডাকাতি। গত ৭ জুলাই রাতে করিমগঞ্জ হাওরে ১৫ দিনের এক শিশুর মরদেহ বহনকারী ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় নৌকায় থাকা যাত্রীদের তিনটি মোবাইল ফোন, ট্রলারে সোলার প্যানেলের ব্যাটারি এবং নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা।
পর্যটন ও পর্যটকের স্বার্থে প্রশাসনের পদক্ষেপ : পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদ পরিবেশে হাওর ভ্রমণ করতে পারেন, সেজন্য প্রশাসন কাজ করছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবার মানোন্নয়নকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। যেকোনো ধরনের অনিয়ম বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন নিকলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমান।
তিনি জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন সর্বদা তৎপর রয়েছে। নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু ডাকাতির ঘটনায় নৌ-পুলিশের তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
পর্যটক নিয়ে হাওরে যাচ্ছে একটি ট্রলার
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, দর্শনার্থীদের সেবার মান ঠিক রাখতে আমরা প্রায় হাওরের বিভিন্ন ট্রলারঘাট ও রেস্টুরেন্টগুলো পরিদর্শন করছি। পাশাপাশি ভোক্তাদের আশ্বস্ত করেছি, কেও যদি অতিরিক্ত নৌ-ভাড়া, গাড়ি ভাড়া বা পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে তারা যেন এ বিষয়ে অভিযোগ করেন। অভিযোগ পেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।”
সার্বিক বিষয়ে কথা হয় নিকলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রেহানা মজুমদার মুক্তির সঙ্গে। তিনি বলেন, “প্রাকৃতিকভাবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার হাওরে পানি কম এসেছে। শুক্র-শনিবারে এখনো প্রচুর পর্যটক আসেন। সপ্তাহের অন্যান্য দিন পর্যটক কিছুটা কম থাকে।”
পর্যটকদের কাছ থেকে নৌকা ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “নৌকা ভাড়া বেশি নেয়ার বিষয়ে আমি দর্শনার্থীদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। নৌকার মাঝিদের নিয়ে ভাড়ার বিষয়ে অচিরেই আলোচনা করব এবং একটি নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। তাছাড়া, প্রতিটি নৌকায় লাইফ জ্যাকেট, ময়লার ঝুড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করা হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তার সুবিধার্থে পুলিশের কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে।”








