প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আমরা সিলেবাসের মধ্যে বিভিন্ন খেলা অন্তর্ভুক্ত করবো। এতে যার যে খেলা ভালো লাগবে সে খেলায় আরও বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আমরা কারিগরি শিক্ষা চালু করতে চাই। এটি একটি বাড়তি দক্ষতা হিসেবে যোগ হবে।
সোমবার (২৯ জুন) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।
সারাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’ জাতীয় প্রদর্শনী উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে সব বিষয় কিন্তু তোমাদের নিয়েই। তোমাদের বন্ধু-বান্ধব যারা সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছ, আজকের আয়োজন তোমাদের ঘিরে।
আরও পড়ুন
প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামালে আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশই থাকছে
তিনি বলেন, আমাদের সব কাজ তোমাদের ঘিরে। কারণ, আমরা এখন আছি, পরে আর থাকবো না। কিন্তু তোমরা থাকবে। তোমরা বাংলাদেশকে সামনে নিয়ে যাবে, তোমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলবে। সেটা খেলাধুলায় হোক বা উদ্ভাবনে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব তোমরাই দেবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এজন্য শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আমরা খেলাধুলা, সংস্কৃতি, ইনোভেশন নিয়ে আসতে চাচ্ছি। এটি হঠাৎ করে আমার চিন্তা করে আনছি না। এটি আমাদের দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা।
পাশে বসা শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনকে দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমাদের মধ্যে যে দক্ষতাগুলো রয়েছে, সেগুলো বের করে আনার পরিকল্পনা গত ১০ বছর ধরে করছি। মাহদী আমিন যখন অক্সফোর্ডে পড়তো, তখন আমরা বসে বসে ভাবতাম। যখন আমরা দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ পাবো, তখন এগুলো করবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ভবিষ্যৎকে আমরা সাজাবো। সেজন্যই সিদ্ধান্ত নিয়েছি— ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তৃতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজিসহ আরও কিছু ভাষা আমরা সিলেক্ট করবো। যে ভাষা শিখলে দেশে বা বিদেশের যে কোনো জায়গায় গেলে যেন কোনো সমস্যায় পড়তে না হয়। তাই বিভিন্ন ভাষা আমরা তোমাদের শেখাতে চাই। এর সঙ্গে ইনোভেশন তো আছেই।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, গীতা পাঠ ও বাইবেলের অংশবিশেষ পাঠ করা হয়। এছাড়া একটি ভিডিও চিত্র উপস্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। অনুষ্ঠানে সারা দেশের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক।
আরও পড়ুন
করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ করে অর্থবিল পাস
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। এ ধরনের আয়োজনের জন্য তারা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, বিজ্ঞানচর্চা ও উদ্যোক্তা মনোভাব বিকাশে গত ১২ জুন সারা দেশে শুরু হয় ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম’।
ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ কর্মসূচি উপজেলা-থানা, জেলা এবং জাতীয়— এই তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। আজ অনুষ্ঠানে প্রতিটি ধাপের বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়।
বিজয়ী শিক্ষার্থীদের প্রত্যেক দলকে ২০ হাজার টাকার চেক, পদক ও সনদপত্র এবং বিজয়ী শিক্ষকদের ৩০ হাজার টাকার চেক ও সনদপত্র দেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিমের আওতায় প্রথমবারের মতো এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তোমাদের জন্য অনেক সুযোগ করে দিতে চাই। এতে শুধু তোমরা না, সমগ্র বাংলাদেশ দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, আজ অনুষ্ঠান শুরুর আগে এখানে আমি একটি গাছ লাগিয়েছি। সারা দেশের ২৯ হাজার ৬ শতাধিক স্কুল এসময় ভার্চুয়ালি কানেক্টেড ছিল। প্রতিটি স্কুলে তিনটি করে গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। তার মানে— একদিনে ৯০ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে আজ।
আরও পড়ুন
বাজেট ২০২৬-২৭ / দ্বিগুণ শুল্কের প্রস্তাবে বড় বিপদের মুখে প্লাস্টিক খাত
সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি, উদ্ভাবনসহ নানা সুযোগ সৃষ্টির বিপরীতে একটি জিনিস প্রত্যাশা করছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমরা তোমাদের জন্য নানা সুযোগ সৃষ্টি করছি— যেন তোমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গড়ে ওঠো। কারণ, তোমরা আত্মবিশ্বাসী হলে আমিও আত্মবিশ্বাসী হবো। তবে, এর বিনিময়ে একটি জিনিস চাই আমি।
কে কে দেবে— প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা হাত তুললে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তিনি বলেন, তোমাদের প্রত্যেককে প্রতিবছর একটি করে গাছের চারা রোপণ করতে হবে। যেখানে থাকো বা স্কুলে বা কলেজে বছরে একটি করে গাছ লাগাতে হবে। কারণ, আমাদের এ দেশেই থাকতে হবে। এখানে বুক ভরে শ্বাস নিতে হবে।
উপস্থিত কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমরা দেখেছো এ দেশে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায়, গাড়ি বা যানবাহন বেড়েছে, অনেক গাছ কেটে ফেলতে হয়েছে। আমাদের বাতাস অনেক দূষিত হয়ে গেছে। এখনই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এক সময় আমরা আর পরিষ্কার বা বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারবো না।
তিনি বলেন, তাই প্রতিবছর নিজের জন্য একটি করে গাছের চারা রোপণ করো। দেখবে তুমিও বড় হচ্ছো, গাছও বড় হচ্ছে। গাছ একসময় তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে যাবে।
তারেক রহমান বলেন, গাছের চারা যখন বড় হয়, তার সান্নিধ্যে গেলে ভালো অনুভূতি হয়। আমি গাছের দিকে তাকিয়ে থাকি, কথা বলি, অনেক পরিকল্পনা করি।
আরও পড়ুন
সংসদে অর্থমন্ত্রী / এই বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নেবো
আমাদের সবাইকে শৃঙ্খল হতে হবে— মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা খুব জরুরি। আমাদের আরো একটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। সেটি হলো— পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। তোমরা দেখবে বিশ্বের অনেক দেশ কিন্তু খুব পরিষ্কার। সেখানকার রাস্তাঘাট, বাগান সব পরিষ্কার। অথচ আমাদের রাস্তাঘাটে অনেক ময়লা-আবর্জনা। এগুলো তো বাইরে থেকে কেউ এসে করছে না। আমরা নিজেরাই এসব ময়লা করছি। আমরা সবাই মিলে এ দেশটা পরিষ্কার রাখতে পারি কি না?
তিনি বলেন, এখন থেকে আমরা আমাদের রাস্তাঘাট, পাবলিক প্লেস পরিষ্কার রাখবো। অন্য কেউ ময়লা ফেললে তাকে বলতে হবে— এ কাজ করাটা অন্যায়। আমরা সবাই একটি সুন্দর বাংলাদেশ চাই। কিন্তু চেষ্টা না করলে তো সেটা হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই চেষ্টা তোমাদের করতে হবে। আমাদের বয়স হয়ে গেছে। এখন সময় তোমাদের। ভবিষ্যৎ তোমাদের। দেশটা গড়ে তুলতে হবে তোমাদের। আমরা হয়তো শুরু করে দিয়ে যেতে পারি, কিন্তু চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে তোমাদের।
তিনি বলেন, দেশটা আমাদের সবার। তাই সবাই মিলে দেশ পরিষ্কার রাখতে হবে। আমাদের পরিবেশটা সুন্দর রাখতে হবে। সেই সুন্দর পরিবেশে নতুন নতুন উদ্ভাবনের পরিকল্পনা করা সহজ হবে।
অনুষ্ঠানে আগত প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা আজকে পুরস্কার পেয়েছো বা পাওনি সবাইকে ধন্যবাদ। যারা পুরস্কার পাওনি তারা হতাশ হবে না। পরের বছরের জন্য উদ্যমী হতে হবে।
উপস্থিত শিক্ষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা মানুষ গড়ার কারিগর। আপনারা যদি এই বাচ্চাদের সঠিক গাইডলাইন দেন, তাহলে দেশটাও ঠিক পথে এগোবে। আপনাদের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। জানি আপনাদের নানা সংকট রয়েছে। এ সংকটগুলো আমরা একদিনে সমাধান করতে পারবো না। পর্যায়ক্রমিকভাবে সমাধান করতে হবে।
তিনি বলেন, কিন্তু একটি দেশের যারা ভবিষ্যৎ, তাদের মধ্যে যদি শিক্ষা থাকে, মানবিকতা থাকে, মূল্যবোধ থাকে— এর চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু হতে পারে না। এই সম্পদকে যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানকে স্মারক প্রদান করা হয়। সবশেষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’-এ চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে পুরস্কার নেয় সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঢাকা।
এর আগে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ স্লোগানে একযোগে দেশের ২৯ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী এ কর্মসূচির সূচনা করেন।
এ সময় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে একটি নিম গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
একই মঞ্চ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’ জাতীয় প্রদর্শনীরও উদ্বোধন করেন তারেক রহমান।
এ সময় তিনি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিজ্ঞান প্রকল্প, স্টার্টআপ উদ্যোগ ও উদ্ভাবনী আইডিয়া পরিদর্শন করেন। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার প্রশংসা করেন এবং এসব উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।
কেএইচ/এমএএইচ/








