সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্নে দুই বছর আগে ধারদেনা করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামের তৈওয়েব আলী (৫৩)। স্ত্রী ও তিন মেয়ের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়েই শুরু করেছিলেন প্রবাসজীবন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে নির্মম বাস্তবতায়।
লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে সৌদি আরবে মৃত্যুর ১৮ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো দেশে ফেরেনি তার মরদেহ। শেষবারের মতো স্বামীর মুখ দেখতে আর বাবাকে একনজর দেখতে দিন গুনছেন স্ত্রী ও তিন কন্যা। অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে, আর আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠছে পুরো এলাকা।
তৈওয়েব আলী মহম্মদপুর উপজেলা সদরের পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামের মৃত হালিম মোল্যার ছেলে। গত ১২ জুন সৌদি আরবের রিয়াদের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
পরিবার জানায়, ২০২৪ সালের শুরুতে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে যান তৈওয়েব। বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণের এখনও প্রায় দুই লাখ টাকা বাকি রয়েছে। সৌদি আরবে তিনি রড মিস্ত্রির কাজ করতেন এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন।
মৃত্যুর পর নতুন করে শুরু হয়েছে আরেক দুঃসহ লড়াই। সৌদি আরবে থাকা পরিচিতজন ও আত্মীয়রা মরদেহ গ্রহণ ও দেশে পাঠানোর দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করায় জটিলতায় পড়েছে পুরো পরিবার। ফলে কবে প্রিয় মানুষটির মরদেহ দেশে ফিরবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্বামীর মরদেহের অপেক্ষায় থাকা বিউটি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার স্বামী সংসারের জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। এখনো অনেক ঋণ রয়ে গেছে। তিনটা মেয়েকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব জানি না। শুধু শেষবারের মতো স্বামীর মুখটা একবার দেখতে চাই। এতদিন হয়ে গেল, এখনো মরদেহটাও দেশে আনতে পারলাম না।”
বাবার জন্য অপেক্ষা করছে তিন কন্যাও। প্রতিদিনই তারা জানতে চায় ‘বাবা কবে আসবে?’ কিন্তু পরিবারের কাছে সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। জীবিত নয়, অন্তত বাবার নিথর মুখটি একবার দেখার আকুতি নিয়েই দিন কাটছে তাদের।
স্থানীয়রা জানান, দেশে থাকাকালে কৃষিকাজ করে কোনোমতে সংসার চালাতেন তৈওয়েব। পরিবারের আর্থিক কষ্ট দূর করার আশাতেই বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু জীবিত অবস্থায় আর ফেরা হলো না তার। এখন মরদেহটুকুও দেশে ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খাচ্ছে অসহায় পরিবার।
মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রি বলেন, “তৈওয়েব আলী বৈধভাবে সৌদি আরবে গিয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।”
এদিকে পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর একটাই দাবি যত দ্রুত সম্ভব রেমিট্যান্সযোদ্ধা তৈওয়েব আলীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে যেন শেষ বিদায়ের সুযোগ পান তার স্বজনরা। একইসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।








