চকলেটের নাম শুনলেই জিবে জল আসে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। এক টুকরো ডার্ক চকলেট কিংবা মিল্ক চকলেটের কামড় নিমেষেই দূর করে দিতে পারে সারা দিনের ক্লান্তি, মনকে করে তুলতে পারে প্রফুল্ল। আজ ৭ জুলাই, বিশ্ব চকলেট দিবস।

বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলাদেশেও এই দিবসের আমেজ বেশ জমজমাট। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে আমাদের দেশের চকলেট উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। একসময় যা ছিল সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর এবং উচ্চবিত্তের বিলাসী পণ্য, আজ তা দেশি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে এক বিশাল ও সম্ভাবনাময় শিল্পে রূপ নিয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদিদোকান থেকে শুরু করে শহরের অভিজাত সুপারশপ—সবখানেই এখন শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশে তৈরি বৈচিত্র্যময় চকলেট।

বাজারের আকার ও বর্তমান চিত্র

দেশি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে চকলেট ও চকলেটজাতীয় পণ্যের বার্ষিক বাজারের আকার তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। কয়েক বছর ধরে এই বাজার বার্ষিক ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মর্ডর ইন্টেলিজেন্সের ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামগ্রিক ক্যান্ডি ও কনফেকশনারি বাজারের মূল্যমান বার্ষিক প্রায় ৯৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা)। ২০৩১ সালে এই বাজার ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এর মধ্যে চকলেটের অংশ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বড় হচ্ছে। একসময় ক্যাডবেরি, কিটক্যাট বা স্নিকার্সের মতো বিদেশি ব্র্যান্ডের চকলেটের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও, বর্তমানে গুণগত মান উন্নয়ন ও সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে দেশের চকলেটের বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশই দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে চলে এসেছে।

দেশি জায়ান্টদের নেতৃত্ব ও বাজারজাতকরণ কৌশল

বাংলাদেশের বাজারে চকলেটের এই অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশের বড় শিল্প গ্রুপগুলো। ২০০১ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে দেশের বাজারে চকলেট নিয়ে আসে ‘প্রাণ কনফেকশনারি’। বর্তমানে দেশি চকলেটের বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশই প্রাণের দখলে। নরসিংদীর পলাশে অবস্থিত প্রাণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে উৎপাদিত চকলেট এখন দেশের আনাচ-কানাচে পৌঁছে যাচ্ছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ দেশের বাজারে চুইংগাম, চকলেট বার, চকলেট বিন, লিকুইড চকলেট, ললিপপসহ বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় পণ্য সরবরাহ করছে।

প্রাণের পাশাপাশি এই খাতে বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, আকিজ বেকার্স, পারটেক্স স্টার গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, এসিআই ফুডস, কোকোলা ফুডস ও ইফাদ কনফেকশনারিও প্রিমিয়াম মানের চকলেট ও সুগার কনফেকশনারি পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করছে।

২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার এক বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে বেকারি ও কনফেকশনারি খাতে যাত্রা শুরু করে আকিজ ইনসাফ গ্রুপের ‘আকিজ বেকার্স লিমিটেড’। এরই ধারাবাহিকতায়, ২০২৫ সালের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানের প্রিমিয়াম চকলেট ব্র্যান্ড ‘হাই-ফাইভ’ দেশের বাজারে নিয়ে আসে। আমদানিকেরা চকলেটের ওপর দেশের মানুষের নির্ভরতা কমিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে বিশ্বমানের পণ্য সরবরাহ, দেশীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক বড় ও সুদূরপ্রসারী অবদান রাখছে।

আকিজ বেকার্স লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম তুষার প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের ভোক্তারা এখন আন্তর্জাতিক মানের প্রিমিয়াম চকলেট খুঁজছেন। সেই চাহিদা মেটাতে বিশ্বমানের চকলেট বাজারে সরবাহ করছি। তবে কোকোসহ প্রধান কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় ডলারের উচ্চ হার ও বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচে বড় চাপ রয়েছে। আমরা উৎপাদনদক্ষতা বাড়িয়ে গুণগত মান ও সাশ্রয়ী মূল্যের সমন্বয় করছি। বিশ্ব চকলেট দিবসে আমাদের প্রত্যাশা, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ককাঠামো যৌক্তিক করাসহ সরকার নীতিগত সহায়তা দিলে এই খাত আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে ভবিষ্যতে বড় রপ্তানিশিল্পে রূপ নেবে।’

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাজারে

ক্যান বাংলাদেশের চকলেট এখন শুধু দেশের মানুষের মুখই মিষ্টি করছে না, বরং বিদেশের মাটিতেও এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান দ্য অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৪.০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চকলেট ও কোকো প্রস্তুতকৃত খাদ্যসামগ্রী রপ্তানি করে।

ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাংলাদেশে তিন–চার বছরে ‘হাতে তৈরি চকলেট’ বা হ্যান্ডমেড চকলেটের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটেছে।

আমদানিনির্ভর কাঁচামাল ও বৈশ্বিক সংকট

চকলেট–শিল্পের এই চোখধাঁধানো প্রবৃদ্ধির পেছনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রধান সমস্যা হলো চকলেটের মূল কাঁচামাল কোকো বিন, কোকো পাউডার এবং কোকো বাটার আমদানি করতে হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক বাজারে কোকো ও চিনির দামে অস্থিরতা, ডলার–সংকট, জাহাজ ভাড়াসহ লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধি, প্যাকেজিংয়ের দাম ও বিদ্যুতের দাম বেড় যাওয়ার কারণে কাঁচামাল আমদানির খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কাঁচামালের দাম বাড়লেও দেশের সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা করে চকলেটের দাম হুট করে বাড়ানো যায় না। ফলে অনেক সময় পণ্যের ওজন বা পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে এই শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রাণ কনফেকশনারির বিপণন বিভাগের প্রধান সাখাওয়াত আহামেদ সাকি বলেন, ‘কনফেকশনারি পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে ভোক্তাদের সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিই। প্রাণ বাজারের নেতৃত্ব থাকায় দায়িত্বটাও অনেক বেশি। এটা সত্যি, বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যবসায়িকভাবে আমরা অনেকটা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। তবে প্রতিনিয়ত বিপণন ও পরিচালন টিম নতুন পণ্য, প্যাকেটজাত ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনের মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে দাম নিয়ে ভোক্তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করছে।’

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা

সব চ্যালেঞ্জ ডিঙিয়েও বাংলাদেশের চকলেটের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিশ্ব চকলেট দিবসে দেশি উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, সরকার যদি চকলেটের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ককাঠামো কিছুটা শিথিল করে এবং দেশি ব্র্যান্ডগুলোকে রপ্তানি প্রণোদনাসহ নীতিগত সহায়তা প্রদান করে, তবে এই খাত আগামী দিনে দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত হতে পারে।