চিপস, সফট ড্রিংক, ইনস্ট্যান্ট নুডলস কিংবা ফাস্ট ফুড-ব্যস্ত জীবনে এগুলো এখন অনেকেরই নিত্যসঙ্গী। স্বাদে তৃপ্তি ও সহজলভ্যতার কারণে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি নির্ভরতা দিনদিন বাড়ছে। কিন্তু এ স্বাদের মোহের আড়ালে কি আমরা অজান্তেই হারাচ্ছি আমাদের স্মৃতিশক্তি? বিস্তারিত লিখেছেন ডা. এম এ হালিম খান

* অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার কী

‘অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার’ (Ultra-processed food) হলো এমন খাদ্য, যা প্রাকৃতিক উপাদান থেকে অনেক দূরে গিয়ে শিল্পকারখানায় বহু ধাপে তৈরি হয় এবং এতে যুক্ত থাকে বিভিন্ন কৃত্রিম উপাদান-যেমন রং, ফ্লেভার, প্রিজারভেটিভ, এমালসিফায়ার ইত্যাদি। NOVA classification অনুযায়ী, এ খাবারগুলো সাধারণত-

▶ উচ্চমাত্রার চিনি, লবণ ও চর্বিসমৃদ্ধ

▶ পুষ্টিগুণে দরিদ্র

▶ দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য

▶ সহজে খাওয়ার উপযোগী (ready-to-eat)।

* উদাহরণ

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহুল ব্যবহৃত কিছু অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার-

▶ প্যাকেটজাত চিপস, বিস্কুট, কেক

▶ সফট ড্রিংক ও এনার্জি ড্রিংক

▶ ইনস্ট্যান্ট নুডলস

▶ প্রসেসড মাংস (সসেজ, নাগেট)

▶ ফাস্ট ফুড (বার্গার, পিজ্জা)।

* কীভাবে স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়

অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার মস্তিষ্কের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে-

▶ প্রদাহ ও হিপোক্যাম্পাসের ক্ষতি : এ খাবারের অতিরিক্ত চিনি ও ট্রান্স ফ্যাট শরীরে chronic inflammation তৈরি করে। এ প্রদাহ মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা স্মৃতি গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

▶ অক্সিডেটিভ স্ট্রেস : ফ্রি র‌্যাডিক্যাল বৃদ্ধি পেয়ে নিউরনের ক্ষয় ঘটায়, যা cognitive decline-এর একটি প্রধান কারণ।

▶ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স : অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। Alyheimer's disease-কে অনেক সময় ‘type 3 diabete's বলা হয়, কারণ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স মস্তিষ্কের ওপরও প্রভাব ফেলে।

▶ গাট-ব্রেন অ্যাক্সিসের ব্যাঘাত : অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে মস্তিষ্কের সঙ্গে যোগাযোগে সমস্যা হয়, যা স্মৃতি ও আচরণকে প্রভাবিত করে।

▶ রক্তনালির ক্ষতি : এ খাবার হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়-যা মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে স্মৃতিশক্তি হ্রাস করে।

* গবেষণার আলোকে বাস্তবতা

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করেছে-

▶ Brayilian Longitudinal Study of Adult Health (ELSA-Brasil) : এক বড় আকারের গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের দৈনিক ক্যালরির ২০ শতাংশ বা তার বেশি অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে আসে, তাদের মধ্যে cognitive decline দ্রুত ঘটে। বিশেষ করে স্মৃতি ও নির্বাহী ক্ষমতা (executive function) বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

▶ Neurology (২০২৪ গবেষণা) : এ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খেলে চিন্তাশক্তি ও স্মৃতিশক্তির অবনতি দ্রুত হয়, বিশেষ করে মধ্যবয়সিদের মধ্যে।

▶ American Academy of Neurology উপস্থাপিত বিশ্লেষণ : এখানে গবেষকরা দেখান-খাদ্যতালিকায় অতি প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণ মাত্র ১০ শতাংশ বাড়লে ডিমেনশিয়া ও cognitive impairment-এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

▶ ২০২৫-২০২৬ সালের সাম্প্রতিক পর্যালোচনা : নতুন গবেষণাগুলোতে দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের খাবারের ফলে মনোযোগ কমে যাচ্ছে, তথ্য ধারণক্ষমতা হ্রাস এবং মস্তিষ্কের বয়স দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

▶ শিশু ও কিশোরদের ওপর গবেষণা : কিছু অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের কারণেও হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খেলে শিশুদের মনোযোগের ঘাটতি, শেখার সমস্যা, আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব গবেষণা সরাসরি কারণ প্রমাণ না করলেও একটি শক্তিশালী সম্পর্ক (association) স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

* বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে অতি প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে ফাস্ট ফুডের প্রতি ঝোঁক, গ্রামাঞ্চলেও প্যাকেটজাত খাবারের বিস্তার এবং বিজ্ঞাপন ও সামাজিক প্রভাব- এগুলো ভবিষ্যতে একটি ‘silent cognitive crisis’ তৈরি করতে পারে।

* করণীয় : কীভাবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব

▶ প্রাকৃতিক খাবারে ফিরে যাওয়া : শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, ডাল ও সম্পূর্ণ শস্য খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

▶ অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করা : প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এসব খাবার যত কম রাখা যায়, ততই ভালো।

▶ লেবেল পড়ার অভ্যাস : অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও কৃত্রিম উপাদানযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।

▶ শিশুদের খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা : ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস তৈরি করা জরুরি।

▶ জীবনযাত্রার পরিবর্তন : নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ স্মৃতিশক্তি রক্ষায় সহায়ক।

* নীতিনির্ধারণী উদ্যোগ

▶ স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রচার

▶ ক্ষতিকর খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ

▶ স্কুলভিত্তিক পুষ্টি শিক্ষা।

* উপসংহার

অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার আমাদের জীবনে সুবিধা এনে দিলেও এর আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি-বিশেষ করে মস্তিষ্ক ও স্মৃতিশক্তির ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক গবেষণা বারবার সতর্ক করছে যে, এ খাবারের অতিরিক্ত গ্রহণ cognitive decline ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যদিও আরও গবেষণা প্রয়োজন, তবুও এখনই সচেতন হওয়া জরুরি। কারণ, আমাদের প্রতিদিনের খাবারই নির্ধারণ করছে আমাদের ভবিষ্যৎ মানসিক সক্ষমতা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।