বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে যে বৈচিত্র্য চোখে পড়েছিল, শেষ ষোলোর লড়াইয়ে এসে তা মুছে গেছে। স্বাগতিকদের উচ্ছ্বাস থেমেছে। এশিয়ার স্বপ্ন ভেঙেছে। আফ্রিকার জোয়ারও স্তিমিত। লাতিন আমেরিকাও আগের দাপট দেখাতে পারেনি। আবারও দাপট ইউরোপের। শেষ ষোলোর শেষ দুই ম্যাচের আগে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত হওয়া ছয় দলের মধ্যে পাঁচটিই ইউরোপের। স্পেন, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, নরওয়ে ও ইংল্যান্ড-পাঁচ ইউরোপীয় পরাশক্তি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রেখে জায়গা করে নিয়েছে শেষ আটে। আফ্রিকার প্রতিনিধি মরক্কোও জায়গা করে নিয়েছে শেষ আটে। বিশ্বকাপে স্বাগতিকদের ঘিরে প্রত্যাশা থাকে বেশি। ইতিহাস বলছে, ঘরের সুবিধা কাজে লাগিয়ে একাধিক স্বাগতিক দেশ বিশ্বকাপে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। এবারের আয়োজক তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা নিজেদের সামর্থ্যরে পরিচয় দিয়েছে ষোলো পর্যন্ত। কানাডা তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ উপহার দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও ছিল আত্মবিশ্বাসী। মেক্সিকোও খেলেছে পরিচিত লড়াকু ফুটবল। কিন্তু শেষ ষোলোর বাধা পেরোতে পারেনি তিন স্বাগতিকের কেউই। কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর আমেরিকার কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্বাগতিকদের সাফল্যে স্মৃতিতে ভাস্কর। ১৯৯৮ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছিল ফ্রান্স। ২০০২ সালে সহ-স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ার ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে খেলেছিল সেমিফাইনাল। ২০০৬ সালে স্বাগতিক জার্মানি পৌঁছেছিল শেষ চারে। এবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলো না। এশিয়ার গল্প আরও হতাশার। ক্লাব ফুটবলে বিনিয়োগ, ইউরোপে খেলা ফুটবলারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পারফরম্যান্সের জেরে এশিয়ার ফুটবলকে শক্তিশালী মনে করা হচ্ছিল। বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই অগ্রগতি চোখে পড়েনি। শেষ ৩২ থেকেই মহাদেশটির উপস্থিতি শেষ হয়ে যায়। দারুণ শুরু ছিল আফ্রিকার। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে আফ্রিকার নয়টি দল জায়গা করে নেয়। উত্তর আমেরিকার আবহাওয়া ও মাঠের পরিবেশ আফ্রিকান দলগুলোর জন্য সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা ছিল। গ্রুপপর্বের পারফরম্যান্সও সেই বিশ্বাসকে আরও জোরালো করেছিল। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে এসে সেই গতি আর ধরে রাখা যায়নি। আধুনিক ফুটবলের কৌশলগত পরিপক্বতা, গভীর স্কোয়াড, বেঞ্চের মান, উচ্চপর্যায়ের লিগে খেলার অভিজ্ঞতা এবং চাপের ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তা-সব মিলিয়ে ইউরোপীয় দলগুলো আবারও নিজেদের আলাদা করে চিনিয়েছে। গ্রুপপর্বে বিশ্বকাপ বৈচিত্র্যের পসরা সাজিয়েছিল। ছোট দল বড় দলকে চাপে ফেলেছে, নতুন গল্প লিখেছে। নকআউট পর্ব যত এগিয়েছে, বাস্তবতা ততই নির্মম হয়েছে। বড় মঞ্চের চাপ ও অভিজ্ঞতার মূল্য আর কৌশলগত পরিণতিই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।