নদীই তাঁর জীবনের অবলম্বন, আর বৈঠাই সংগ্রামের প্রতীক। স্বামীর মৃত্যুর পর চার শিশু সন্তানকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন শরীয়তপুরের তাসলিমা বেগম। জীবিকার আর কোনো পথ না পেয়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন খেয়া নৌকার বৈঠা। সেই থেকে টানা প্রায় ২৬ বছর ধরে নদীতে যাত্রী ও কৃষিপণ্য পারাপার করে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে বহন করেছেন এই সংগ্রামী নারী। বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো নৌকা চালাতে না পারলেও এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো সরকারি সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ তাঁর।

শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর ইউনিয়নের হাজীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ৭৮ বছর বয়সী তাসলিমা বেগম। প্রায় ২৬ বছর আগে স্বামী নাসির সরদারের মৃত্যুর পর চার সন্তানকে নিয়ে তিনি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। সংসার চালানোর অন্য কোনো উপায় না থাকায় স্বামীর রেখে যাওয়া খেয়া নৌকা চালানোর দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেন। এরপর থেকে মেঘনার শাখা নদীতে যাত্রী ও কৃষিপণ্য পারাপার করেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।

তাসলিমা বেগমের নিজের নামে কোনো জমিজমা নেই। অন্যের জমিতে ছোট্ট একটি ঘর তুলে বসবাস করছেন তিনি। বছরের পর বছর প্রখর রোদ, ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে নৌকা চালিয়ে যা আয় করেছেন, তা দিয়েই তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে বড় করেছেন এবং তাদের বিয়ে দিয়েছেন।

তবে প্রায় পাঁচ বছর আগে নৌ দুর্ঘটনায় তাঁর একমাত্র ছেলে আলী আকবর একটি পা হারিয়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েন। ছেলের চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিজের সামান্য সঞ্চয়ও হারিয়ে ফেলেন তাসলিমা। এরপর থেকে তাঁর সংসারের কষ্ট আরও বেড়ে যায়।

নিজের জীবনের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে তাসলিমা বেগম বলেন, “প্রায় ২৫ বছর ধরে নদীতে মানুষ পারাপার করছি। কিন্তু সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি। নিজের থাকার মতো এক টুকরো জমিও নেই। অন্যের জমিতে ঘর তুলে আছি, যখন চলে যেতে বলবে তখনই সরে যেতে হবে। আমার নৌকাটিও এখন প্রায় চলাচলের অযোগ্য। আগে ঋণ করে নতুন নৌকা বানিয়েছি, এখন সেই সামর্থ্যও নেই।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে খেয়াঘাটে নৌকা চালিয়ে পরিবার চালিয়েছেন তাসলিমা বেগম। বয়সের কারণে এখন তাঁর কর্মক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। তাই মানবিক বিবেচনায় তাঁকে সরকারি পুনর্বাসন, বিধবা ভাতা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার আওতায় আনা জরুরি।

এ বিষয়ে গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুশরাত আরা খানম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে। বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে তাসলিমা বেগমকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

The post স্বামীর মৃত্যুর পর ২৬ বছর বৈঠা হাতে জীবনযুদ্ধ, সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় তাসলিমা বেগম appeared first on ZoomBangla.