- যন্ত্রাংশ চুরিতে ঝুঁকিতে রেলপথ
- আড়াই বছরে প্রাণ গেছে ২৫ জনের
স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে যোগ হয় রেলপথ। এটি শিবচরসহ এই এলাকার মানুষজনের অনেক কাঙ্ক্ষিত। অথচ চালুর পর থেকে কিছুতেই থামছে না রেলপথের যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা। রেলপথের সিগন্যাল ব্যবস্থার মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরির ফলে বাড়ছে ঝুঁকি। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে রেলপথ অনেকটাই আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিবচর রেলওয়ে স্টেশনসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণ। ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হলে এ অঞ্চলের মানুষজনের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। এরপর ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর চালু হয় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বহুল প্রত্যাশিত রেল। এরপর থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী চলাচল করে রেলগাড়িতে। এতে করে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হয়ে যায়।
আরও পড়ুন
সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ / এক লাফে ব্যয় বাড়ছে ৭ হাজার কোটি টাকা
তবে এই সহজ যাত্রার সঙ্গে যোগ হয় কিছু ভোগান্তি ও দুর্ভোগ। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে রেলপথের বিভিন্ন এলাকায় সিগন্যালের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও ক্যাবল চুরি। আরেকটি হচ্ছে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু।

সিগন্যালের যন্ত্রাংশ-ক্যাবল চুরি
শিবচর রেলওয়ে স্টেশনসহ একাধিক সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ জুন রাতে মাদারীপুর শিবচরের অংশের পদ্মা রেলওয়ে স্টেশনের সিগন্যাল পয়েন্টের কয়েকটি ট্র্যাক পট (ট্র্যাক সার্কিটের যন্ত্রাংশ) খুলে নিয়ে যায় চোরচক্র।
এর আগে ৯ জুন একই স্টেশনের শিবচর প্রান্তের সিগন্যাল পয়েন্টের সবগুলো ট্র্যাক পট চুরি হয়ে যায়। এছাড়াও গত ১৮ মার্চ শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের ট্র্যাক পট খুলে নিয়ে যায় চোরচক্র। এভাবেই মাঝে মধ্যেই চোরচক্র রেললাইনের বিভিন্ন স্থানের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় বেশ কয়েকবার চোরদের আটক করলেও কোনোভাবেই এই চুরির ঘটনা থামছে না। ফলে ঝুঁকি নিয়েই ট্রেন চলাচল করছে।
আরও পড়ুন
গাইবান্ধায় রেল স্টেশনে উচ্ছেদ অভিযান, ‘লোক দেখানো’ বলছেন স্থানীয়রা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, গত ছয় মাসে ঢাকা-ভাঙ্গা রেলপথের বিভিন্ন স্টেশন থেকে ট্র্যাক পটসহ সিগন্যাল ব্যবস্থার বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরির ঘটনা অনেক বেড়েছে। এসব যন্ত্রাংশ চুরির ফলে ট্রেন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়েছে। এছাড়াও ট্রেন চলাচলেও অতিরিক্ত সময় লাগছে। এ অবস্থায় দুর্ঘটনা এড়াতে এবং ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে রেলওয়ের কর্মীদের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ‘লুক স্টিক’ ব্যবহার করে পেপার লাইন ক্লিয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। ট্রেন চলাচলের সময় রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। তাই এই চুরি বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়তে হবে।
শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মোহাম্মদ সেলিম হোসেন বলেন, এই রুটের ট্র্যাক পট চুরির কারণে ট্রেন চালাতে অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সেইসঙ্গে সময়ও বেশি লাগছে। এই চুরি জরুরিভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে।
আরও পড়ুন
বগুড়া শহর এড়িয়ে নতুন রেলপথের প্রস্তাব, রেলস্টেশন হচ্ছে বাস টার্মিনাল
শিবচরের পদ্মা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, শিবচরের এই রুটে সিগন্যালের ট্র্যাক পটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি হয়েছে। তাই এই রুটে ট্রেন চলাচল ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
ভাঙ্গা রেলওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (পরিদর্শক) মো. শাহ-জালাল বলেন, ভাঙ্গা জংশন থেকে শিবচর ও পদ্মা স্টেশনের দূরত্ব বেশি। তাই নিয়মিত টহলে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। তাই এই রুটে রেললাইনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা খুব বেড়েছে। এরই মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে। এতে করে ট্রেন চলাচলে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তবে এসব চুরির ঘটনায় আগেও মামলা হয়েছে। এমনকি বেশ কয়েকজন চোরকে গ্রেফতার করাও হয়েছে। তবুও চুরির ঘটনা কমছে না। তাই এই চুরি প্রতিরোধ করার জন্য টহল আরও জোরদার করা হবে। যাতে করে সরকারি সম্পত্তি রক্ষা পায় আর ট্রেন চলাচল নিরাপদ হয়।

নতুন সমস্যা ট্রেনে কেটে মৃত্যু
গত আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে মাদারীপুর জেলার শিবচরে ট্রেনে কাটা পড়ে কমপক্ষে ২৫ জন মারা গেছে। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা সন্ধ্যার পর ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে।
আরও পড়ুন
কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে শিডিউল বিপর্যয়ই যেন নিয়তি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে পদ্মা সেতু হয়ে আংশিক ট্রেন চলাচল শুরু করে। এরপর ডিসেম্বরে পুরোপুরিভাবে এই রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। পদ্মা সেতুর জাজিরা পয়েন্ট থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথের দূরত্ব ৩১ কিলোমিটার। এর মধ্যে শিবচরে পদ্মা ও শিবচর স্টেশন আছে। ঢাকার কমলাপুর থেকে রাজশাহী, খুলনা পর্যন্ত ট্রেন চলে এই রুটে।
মাদারীপুরের শিবচরে প্রথমবারের মতো রেললাইন চালু হওয়ায় এই এলাকার মানুষজনের মধ্যে কৌতুল ও আগ্রহ বেশি ছিল। তাই রেললাইন ও রেলগাড়িকে কেন্দ্র করে এই এলাকার মানুষজনের মধ্যে একটি উৎসব ও আনন্দ দেখা যায়। অনেক স্থানে রেললাইনের কাছাকাছি বাড়ি হওয়ায় অনেকেই বিকেল হলে ঘুরতে আসেন। তাছাড়া অনেক সময় দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষজন ঘুরতে আসেন। সন্ধ্যার পর ভিড় আরও বাড়ে। তাই অসাধনতাবশত দুর্ঘটনাও অনেকে বেড়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি ২০ জুন সকালে শিবচর উপজেলার মাদবরেরচর এলাকার তেলের পাম্প সংলগ্ন স্থানে রেলে কাটা পড়ে একই উপজেলার বাচামারা গ্রামের মোকশেদ হাওলাদারের স্ত্রী শুকরণ বেগম মারা যান। এই বছর কমপক্ষে আরও ৩ জন মারা গেছেন।
আরও পড়ুন
তিনদিনে ৩ দুর্ঘটনা / শতবর্ষী সিলেট-আখাউড়া রেলপথে দুর্ভোগ যেন নিত্যসঙ্গী
২০২৫ সালের ১৯ মার্চ সন্ধ্যায় মাদারীপুরের শিবচরে উপজেলার মোল্লা বাজার এলাকায় পদ্মা রেলস্টেশনের কাছাকাছি ট্রেনে কাটা পড়ে এক ব্যক্তি মারা যান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে শিবচর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বড় কেশবপুর এলাকার রেলসড়কের ৫ নম্বর সেতুতে ট্রেনের ধাক্কায় শিবচর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বড় কেশবপুরের বেপারীর কান্দি গ্রামের মো. জাহাঙ্গীর মোল্লার ছেলে ও একই এলাকার স্থানীয় ইক্বরা রওজাতুল উলুম মাদরাসার প্রথম শ্রেণির ছাত্র মাহমুদুল ইসলাম (১০) মারা যান। একই বছর ১২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় শিবচরের পাঁচ্চরবাজার সংলগ্ন মাদবরেরচর এলাকায় এক নারী (৩০) মারা যান।
২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর ঘুরতে গিয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা রেললাইনের শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর এলাকায় একই উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের আবু খলিফা ওরফে মিজান সরদারের মেয়ে মিথিলা আক্তার (১৭) মারা যান। এসময় ওই কিশোরীর সঙ্গে থাকা তার ১১ মাস বয়সি ভাগনি আয়শার দুই হাত ও পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এছাড়াও মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর গোল চত্বরের পাশে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত এক যুবক মারা যান। একই বছর শিবচর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের সীমানা এলাকায় রেলে কাটা পড়ে একই উপজেলার চরকেশবপুর গ্রামের আব্দুল মান্নান মোড়ল ছেলে ও স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রাকিব (১২) মারা যায়।

তারও আগে ২০২৩ সালের ২৫ নভেম্বর শিবচর উপজেলার পাঁচ্চরের লাইফ কেয়ার হাসপাতাল সংলগ্ন রেললাইনে ছবি তোলার সময় ট্রেনের ধাক্কায় একই উপজেলার মাদবরেরচর ইউনিয়নের লপ্তীকান্দি এলাকার হিরু খানের ছেলে এবং একই ইউনিয়নের মাদবরেরচর রহিমুদ্দিন মাদবর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণি ছাত্র মো. ইব্রাহিম খান (১৪) মারা যান।
পাঁচ্চর এলাকার স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, অনেক সময় দূর-দূরান্ত থেকে এখানে এসে আত্মহত্যা করার ঘটনাও আছে। তা না হলে ট্রেনে কদিন পরপরই এত মারা যাবে কেন। তাছাড়া ট্রেনের নিচে ফেলে হত্যার ঘটনাও থাকতে পারে। তাই এসব ব্যাপারে আইনশৃংখলা বাহিনীর আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।
পাঁচ্চর এলাকার রেল সড়কে ঘুরতে আসা স্থানীয় জয়নাল হোসেন বলেন, বিকেল হলেই রেললাইনে মানুষের আড্ডা জমে ওঠে। এছাড়া সকাল-দুপুরেও রেললাইন ধরে অনেককেই হাঁটতে দেখা যায়। আসলে স্থানীয়রা ছাড়া অনেকেই ট্রেন চলাচলের সময় জানে না। দূর থেকে ট্রেন দেখে সরতে গিয়েও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। অনেক সময় দেখলে মনে হয় ট্রেন ধীরে আসছে আসলে ট্রেন প্রচণ্ড গতিতে চলে এখানে। তাই অনেক সময় অসাবধানতাবশত দুর্ঘটনায় পড়তে হচ্ছে। এ ব্যাপারে সকলের সচেতন হতে হবে।
শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন বলেন, মাঝে মধ্যে রেলে কাটা পড়ে মারা যাবার ঘটনা ঘটে থাকে। সম্প্রতি শুকরণ বেগম নামের এক নারী মারা গেলে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
শিবচর স্টেশনের মাস্টার মো. সেলিম হোসেন বলেন, এই লাইনটি খুবই গতিশীল। এখানে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে ট্রেন চলাচল করে। দুর্ঘটনা এড়াতে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত রেললাইনে হাঁটাহাঁটি বন্ধ করতে হবে। মানুষকে সচেতন হতে হবে। রেললাইন ঘোরার জায়গা না। তাই এই ব্যাপারে সবার সচেতন হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসবে।
এফএ/জেআইএম








