ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সংসদ। প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় সংসদের প্রশ্নকে ‘শাহবাগ স্কয়ার’ ও ‘পল্টনের বক্তৃতা’র সঙ্গে তুলনা করায় বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। এ সময় তাঁরা আসন থেকে দাঁড়িয়ে হইচই করতে থাকেন।

বিরোধী দলের প্রতিবাদের মুখে একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করেন। তবে এরপরও প্রতিবাদ অব্যাহত থাকায় প্রায় ১১ মিনিট সংসদের কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অতীতেও বিরোধী দলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দিয়েছেন। বিষয়টিকে তিনি ‘সংসদীয় ফ্যাসিবাদ’ বলে আখ্যায়িত করেন।

আজ বৃহস্পতিবার প্রশ্নোত্তর পর্বে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে অচলাবস্থার সূত্রপাত হয়। মাসুদ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাই, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ওপর হামলা এবং মিথ্যা মামলায় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদক্ষেপ জানতে চান।

প্রশ্নের শুরুটা বুঝতে পারেননি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার প্রশ্ন করার অনুরোধ করেন। পরে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে মাসুদ একই প্রশ্ন করেন।

শফিকুল ইসলাম মাসুদের বলেন, ‘বর্তমান সময়ে আইনশৃঙ্খলা উদ্বিগ্নতার সাথে লক্ষ্য করছি যে দিনে দুপুরে অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাই হচ্ছে। বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা হামলার শিকার হওয়ার প্রেক্ষিতে মামলা হলেও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার না করে বরং তার প্রেক্ষিতে যে মিথ্যা ভুয়া মামলা দেওয়া হয়েছে। সেই মামলায় ওই বিরোধী দলের নেতাকর্মীদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে আমি মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদক্ষেপ জানতে চাই।’

জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেওয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেওয়া এক কথা না।’ এ বক্তব্যের পরই বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানান। কয়েকজন সদস্য আসন থেকে দাঁড়িয়ে হৈচৈ করতে থাকেন। পরিস্থিতির মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি কাউকে উদ্দেশ্য করে বলি নাই।’ এরপরও বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতিবাদ চলতে থাকলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার আমি আপনার শেল্টার চাচ্ছি।’

পরে বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করছেন। তবে এতে বিরোধী দল শান্ত না হয়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে। একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তাঁর আসনে বসে পড়েন।

বিরোধী দলের অব্যাহত প্রতিবাদের মধ্যে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিরোধীয় দলীয় সদস্যবৃন্দ আপনারা অনুগ্রহ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনবেন।’ তিনি বারবার সদস্যদের বসার অনুরোধ করেন। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা চিৎকার-চেঁচামেচি অব্যাহত রাখেন। এ সময় স্পিকার বলেন, ‘এটা তো আওয়ামী লীগের আমল না। এখানে আপনারা ইচ্ছামতো সরকারকে ক্রিটিসাইজ করতে পারছেন।’

বিরোধী দলের সদস্যদের মাইক দেওয়া হবে জানিয়ে স্পিকার বলেন, ‘এইভাবে ঢালাও না বলে মাইকে বললে তো সবাই শুনতে পায়। আপনাদেরকে সুযোগ দেওয়া হবে। যখন সুযোগ পাবেন, মাইকে বলবেন। আপনাদেরকে স্পিকারের আসন থেকে বারবার অনুরোধ করা হচ্ছে অনুগ্রহ করে বসুন। আপনাদের তো উত্তর দেওয়ার সুযোগ পাবেন।’

এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ফ্লোর চাইলে স্পিকার জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হওয়ার পর তাঁকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে।

বিরোধী দলের হৈচৈয়ের মধ্যেই আবার বক্তব্য শুরু করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একপর্যায়ে স্পিকার তাঁকে তাঁর দিকে তাকিয়ে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কোথায় ছিনতাই হয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার হয় নাই সেটার সুনির্দিষ্ট বর্ণনা দরকার। শুধু হাওয়াভাবে যদি বলা হয়...যে এই সমস্ত হচ্ছে প্রতিকার কি বিরোধী এমপির ওপর হামলা হচ্ছে প্রতিকার কি, নির্দিষ্ট প্রশ্ন করতে হবে। সেজন্য বলছি এটা মহান জাতীয় সংসদ।’

এরপর স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন।

বক্তব্যের শুরুতেই বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমাকে আগে সুযোগ দিলে উনার কথাটা শুনতে পেতাম।’ এ সময় সরকারি দলের কয়েকজন সদস্য তাঁকে উদ্দেশ্য করে কথা বলতে থাকলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘বক্তব্য কি আপনি দেবেন না আমি দেব? আপনি দেন।’ স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এটা অশুভ। আমার বক্তব্যের সময় যদি এইভাবে কমেন্টস করা হয়, তাহলে আমার এখানে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখে বলতে চাই, আজকে নতুন করে তিনি এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেন নাই। সংসদ অধিবেশন যেদিন থেকে বসা শুরু হয়েছে সেদিন থেকেই তিনি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে সবাইকে... আমি বুঝতে পারি না উনি নিজেকে কী মনে করেন। এমনকি তিনি এখানে দাঁড়িয়ে সেই দুঃসাহস দেখিয়েছেন, তিনি বলেছেন যে, এই সংসদে তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন। আমরা তাঁর ছাত্র হওয়ার জন্য এখানে আসি নাই। শিক্ষকতা করতে হলে তিনি একটা ইউনিভার্সিটি খুলুন, ওখানে যার পছন্দ গিয়ে ভর্তি হবে। উনার লেকচার শুনবে।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজকে একই বক্তব্যে দুইবার উনি অ্যাটাক করে ফেললেন। আমার সঙ্গীরা তো মনে করে আমি নিজেও মনে করি যে এইটা কালচারাল নয়, এইটা পার্লামেন্টারিয়ান ফ্যাসিজম। এটা হওয়া উচিত না।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদের সৌন্দর্য রক্ষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে এবং তাঁর বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করতে হবে। তিনি বলেন, এটি হলে বিরোধী দল সংসদ কক্ষে থাকবে, অন্যথায় অপমান নিয়ে এখানে বসার প্রশ্নই ওঠে না। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাঁর বক্তব্য সমর্থন জানান।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জাতীয় সংসদ জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলন করার জন্য সবাই আমরা দায়িত্ব পালন করছি। সংসদ দেশের গর্ব জনগণের প্রতিষ্ঠান। কিছু আইন কানুন রীতি নীতি অনুসারে এই প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। বিশেষ করে রুলস অফ প্রসিডিউর ফলো করা না হলে সংসদ কার্যকর থাকে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘গভীর দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি যে, ক্রমেই কিছু কিছু সদস্যের মধ্যে আমি অসহিষ্ণুতা লক্ষ্য করছি। জাতীয় সংসদ পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এখানে প্রত্যেকেরই কথা বলার স্বাধীনতা আছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এক্সপাঞ্জের দাবির বিষয়ে স্পিকার বলেন, তিনি বক্তব্য পরীক্ষা করে দেখবেন। অসংসদীয় কিছু থাকলে তা এক্সপাঞ্জ করা হবে।

বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, ‘কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করবেন না। আপনারা যে কয়জন আছেন তার দ্বিগুণ তিন গুণ এপাশে (সরকারি দলে) আছে। সুতরাং শব্দ করে এর বাণীকে স্তব্ধ করা যাবে না। আমাকে সংসদ পরিচালনা করতে দিন। আমি আমার জ্ঞান বুদ্ধিমতো নিরপেক্ষভাবেই সংসদ পরিচালনা করার চেষ্টা করছি।’

স্পিকারের বক্তব্যের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আজকের বিষয়টা একবারে স্পষ্ট। এটা তো আর পরীক্ষা করে দেখার কোনো বিষয় নেই।’ তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘শেষের দিকে গিয়ে একটু বললেন যে, এইদিকের চাইতে ওইদিকে তিন গুণ আছেন। এটা এটা তো ভালো লাগল না। আমি এই সংসদকে কোনো গুণে বিভক্ত করার পক্ষে নই। আমরা প্রথম দিক থেকে বলেছি, ভালো কাজে আমরা সবাই এক হব। একসাথে কাজ করব। অন্যায় কিছু হলে আমরা প্রতিবাদ করব। আমরা সেই প্রতিবাদ করেছি হয়তো এই প্রতিবাদ কারও পছন্দ হবে কারও পছন্দ হবে না সেটা ভিন্ন। কিন্তু আমি মনে করি যে এই ধারায় আমাদেরকে হ্যান্ডেল না করলে খুশি হব।’

পরে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, আমি কিন্তু সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। আজকে যেইভাবে একে অন্যকে কথা বলার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করেছি। এটি সংসদের জন্য কোনো ভালো লক্ষণ নয়। অনেক কষ্টের পর গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে। এই গণতন্ত্র যাতে বহাল থাকে সেজন্য সংসদের প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব এখানে রয়েছে।’

এর আগে এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূরক প্রশ্ন করেন। তিনি বর্তমান সরকারের ছয় মাস এবং তার আগের ছয় মাসে খুন-ধর্ষণসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফলতা-ব্যর্থতা জানতে চান।

জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাসনাতের প্রশ্নকে ‘পল্টনের বক্তৃতা’র সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ‘এটা প্রশ্ন হলো না পল্টনের বক্তৃতা হলো বুঝতে পারিনি।’

হাসনাত তাঁর প্রশ্নে যে তথ্য তুলে ধরেছেন, তার কোনো সোর্স উল্লেখ করেননি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এগুলো পল্টনে বক্তব্য চলে, এটা সংসদ, সংসদের তথ্যভিত্তিক কথা বলতে হবে। যদি কোনো স্পেসিফিক ঘটনার কথা বলা হলে তা নিয়ে আমরা ৩০০ বিধিতে বক্তব্য দিতে পারব।’