সরকারের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চালু করা বরগুনার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো কার্যত নিয়মের বাইরে চলছে। কোথাও ক্লিনিক তালাবদ্ধ, কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা অনুপস্থিত, আবার কোথাও নির্ধারিত সময়ের আগেই সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সরকারি নির্দেশনার বদলে অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের ইচ্ছামতোই পরিচালিত হচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিক। ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ।

জানা গেছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ক্লিনিক খোলা রেখে চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্য পরামর্শ ও ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করার কথা। তবে বরগুনার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বাস্তবতা ভিন্ন।

‘কমিউনিটি ক্লিনিকের যেসব সিএইচসিপি আছেন তারা যদি সঠিক সময় অনুযায়ী অফিস না করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে লিখিত দিতে হবে। পরবর্তীতে ওই অভিযোগের ভিত্তিতে কী ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। তাহলে ধীরে ধীরে কমিউনিটি ক্লিনিকের মান উন্নয়ন হবে। তবে যারা ক্লিনিকগুলোর তত্ত্বাবধায়নে যারা আছেন তাদেরকেও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

আরও পড়ুন

রূপগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা নিতে গেলে জোটে কেবল ভোগান্তি

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানায়, বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় ইউনিয়ন পর্যায়ে মোট ১৩৬ টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিক থেকে সপ্তাহে ৬ দিন প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা ও পরমর্শ নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা। এছাড়াও ফ্যামিলি প্লানিং এর বিভিন্ন সেবাসহ মোট ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো থেকে।

সম্প্রতি বরগুনা সদর উপজেলার খাজুরতলা, কুমড়াখালী ও পাজরাভাঙ্গা কমিউনিটি ক্লিনিকে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জরাজীর্ণ ক্লিনিকে ইচ্ছেমতো চলছে স্বাস্থ্য সেবা। ৯ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টা, বরগুনা সদর উপজেলার পাজরাভাঙ্গা কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে ক্লিনিকটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। একই অবস্থা কুমড়াখালী কমিউনিটি ক্লিনিকের। ১০ জুলাই (শনিবার) সরকারি ছুটি না থাকলেও এলাকাবাসী জানেন শুক্র-শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ।

স্বাস্থ্যকর্মীদের মর্জি মতো চলে কমিউনিটি ক্লিনিক
কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিয়ে এসেছেন সেবাগ্রহীতা/ ছবি: জাগো নিউজ

আরও খারাপ অবস্থা খাজুরতলা কমিউনিটি ক্লিনিকের। যথারীতি ৪ জুলাই (শনিবার) ক্লিনিকে আসেননি কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) সংগীতা রানী। অথচ পরেরদিন ৫ তারিখে অফিসে এসে হাজিরা খাতায় আগের দিন না এসেও স্বাক্ষর দিয়ে রেখেছেন তিনি। সঙ্গীতার সঙ্গেই (৪-৫ জুলাই) তারিখে ক্লিনিকে সেবা দেওয়ার কথা ছিল ওই এলাকার স্বাস্থ্য সহকারী জেসমিনের। কিন্তু তিনিও দুইদিনই অনুপস্থিত। তবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ক্লিনিক খোলা রাখার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ক্লিনিকই ইচ্ছামতো খোলেন দায়িত্বে থাকা সিএইচসিপিরা। এ ছাড়াও সপ্তাহের শনিবার অধিকাংশ ক্লিনিকই বন্ধ থাকে বলেও অভিযোগ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবা প্রত্যাশিরা।

আরও পড়ুন

সোয়ারিঘাট-চকবাজার / কাদাপানি-ভাঙা সড়ক, বৃষ্টি থামলেও যেখানে শেষ হয় না দুর্ভোগ

ক্লিনিক সপ্তাহে শুক্র-শনিবার বন্ধ থাকে জানিয়ে পাজরাভাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা আবু সালেহ জাগো নিউজকে বলেন, পাজরাভাঙ্গা কমিউনিটি ক্লিনিকটি আমার বাড়ির পাশে। এটি শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে। এছাড়া ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিদিনই আসেন, আবার দুপুর দেড়টা দুইটার মধ্যেই বন্ধ করে চলে যান।

‘শুক্রবার তো ক্লিনিক বন্ধই থাকে কিন্তু মাঝে মধ্যে শনিবারও বন্ধ দেখা যায়। এলাকাবাসীর কাছে প্রায় সময়ই শুনি ক্লিনিকে গেলে ঠিকভাবে ওষুধ পাওয়া যায় না। আমাদের প্রত্যাশা- এলাকার সবাই যেন ক্লিনিকে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় এবং সরকারিভাবে যে ওষুধ দেওয়া হয়।’

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জাগো নিউজকে জানান, ৯ জুলাই দুপুরেই পাজরাভাঙ্গা কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে চলে গেছেন সিএইচসিপি আসমা বেগম। তিনি ৭ দিনের ছুটিতে যাবেন বলে জানান। এর মধ্যে কোনো রোগী এলে জানাতে বলেছেন- তিনি সাত দিনের ছুটিতে আছেন।

এদিকে আসামা বেগমের ছুটির বিষয় জানতে মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হয় বরগুনা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অরুণাভ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি জানান, তার থেকে আসমা বেগম কোনো ছুটি নেননি।

আরও পড়ুন

১৩ বছরেও চালু হয়নি ইমিগ্রেশন, সম্ভাবনা হারাচ্ছে সোনাহাট বন্দর

পরে বিষয়টি নিশ্চিত হতে আসামা বেগমের মোবাইলফোনে বারবার কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

খাজুরতলা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মো. খাইরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের মর্জি মতো চলে ক্লিনিকগুলো। খাজুরতলা কমিউনিটি ক্লিনিক সকাল ৯টার সময় খোলার কথা থাকলেও প্রায় সময়ই ১০টার পরে খোলা হয়। আবার দুপুরের মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। যারা ওষুধ নিতে আসেন তারা অনেক সময় দোকানে বসে থাকেন। সবসময় চিকিৎসক না পাওয়ায় ঠিকভাবে এখান থেকে সরকারি ওষুধও পাওয়া যায় না।

স্বাস্থ্যকর্মীদের মর্জি মতো চলে কমিউনিটি ক্লিনিক

খাজুরতলা ক্লিনিক বন্ধ থাকার বিষয়টি জানতে ওই ক্লিনিকে গিয়ে কথা হয় ক্লিনিকের সিএইচসিপি সঙ্গীতার সঙ্গে।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, একটু অসুস্থ থাকায় ৪ জুলাই সময়ের আগেই বাড়ি চলে যাই। এছাড়া প্রায়দিনই অসুস্থ থাকি, তবে নিয়মিত ক্লিনিকে উপস্থিত থাকি। হয়ত ফেরার সময় দুই-এক মিনিট আগে ক্লিনিক থেকে বের হই।

এরপর কথা হয় খাজুরতলা কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য সহকারী জেসমিনের সঙ্গে।

‘পাজরাভাঙ্গা কমিউনিটি ক্লিনিকটি বাড়ির পাশেই। এটি শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে। এছাড়া ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিদিনই আসেন, আবার দুপুর দেড়টা দুইটার মধ্যেই বন্ধ করে চলে যান।’

তিনি বাসায় থাকা এবং দুই দিন ক্লিনিকে দায়িত্ব পালন না করার বিষয়টিও স্বীকার করে জাগো নিউজকে বলেন, আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ এজন্য ৪-৫ জুলাই ক্লিনিকে যেতে পারিনি।

তবে ক্লিনিকে না থাকার বিষয়ে ছুটি নিয়েছেন কিনা এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি ছুটি নেননি বলে জানান।

এদিকে কুমড়াখালী কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগের শেষ নেই। তাদের দাবি, ক্লিনিকটি কোনো দিনই সকাল ১০টার আগে খোলে না এবং দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রহিম জাগো নিউজকে বলেন, শুক্রবার ও শনিবার ক্লিনিক বন্ধ থাকে। গ্রামের লোকজন ওষুধ আনতে গেলে ৫ টাকা নিয়ে সামান্য কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু পরিচিত কেউ গেলে তারা যে ওষুধ চায় তাদেরকে তা সবই দেওয়া হয়। আবার সকাল ১০ টার দিকে ক্লিনিক খোলা হয় এবং দুপুর ১২টার থেকে ১ টার মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আরেক বাসিন্দা বিপুল হাওলাদার জাগো নিউজকে বলেন, শুক্রবার তো ক্লিনিক বন্ধই থাকে কিন্তু মাঝে মধ্যে শনিবারও বন্ধ দেখা যায়। এলাকাবাসীর কাছে প্রায় সময়ই শুনি ক্লিনিকে গেলে ঠিকভাবে ওষুধ পাওয়া যায় না। আমাদের প্রত্যাশা- এলাকার সবাই যেন ক্লিনিকে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় এবং সরকারিভাবে যে ওষুধ দেওয়া হয়।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কুমড়াখালী কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি ফারহানা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, আমি সঠিক সময়েই ক্লিনিকে আসি। মাঝে মধ্যে ১০ মিনিট দেরি হতে পারে। তবে কে বা কারা অভিযোগ করেছেন তা বলতে পারি না, কিন্তু আমি আমার জায়গা থেকে সঠিকভাবেই দায়িত্ব পালন করি। এ ছাড়াও আমি দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর পায়ে ব্যথা নিয়ে শনিবারও অফিসে উপস্থিত থাকি।

তিনি আরও বলেন, এছাড়াও বিগত তিন মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ ছিল না। বিগত সময়ে বছরে চারবার ওষুধ পেলেও এখন এক বছরে পেয়েছি মাত্র একবার। জনগণ তো ভিতরগত অবস্থা জানে না। সেবাগ্রহীতারা ক্লিনিকে আমাকে বসা দেখে কিন্তু ওষুধ পায় না। এ কারণে তাদের মধ্যে হয়তো কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

কমিউনিটি ক্লিনিকে নানা অব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনিয়মিত আসার বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অরুণাভ চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, আমরা নিয়মিতই এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো তদারকি করার চেষ্টা করি। পাশাপাশি সিএইচসিপিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করি তবে জনবল সংকটের কারণে সব কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হয় না। তারপরেও যদি কারো বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায় তবে তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বরগুনা সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফাত্তাহ জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের ১৩৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। আমরা চেষ্টা করি নিয়মিত মনিটরিং করার। এর মধ্যে অনুমোদিত ছুটি বা অনুপস্থিত থাকলে আমরা তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। পাথরঘাটায় এর মধ্যে দুইজনের বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছি।

বরগুনায় মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে বলে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, সদর উপজেলায় ক্লিনিকে ৮০ শতাংশ লোকবল সংকট রয়েছে। তবে আমাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেলথ ইন্সপেক্টর, হেলথ ইন্সপেক্টর, মেডিকেল অফিসার, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ আমিও ভিজিট করি। তবে সবগুলো ক্লিনিকে যাওয়া সম্ভব হয় না। তারপরেও আমরা অনিয়ম পেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবো।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম জাগো নিউজকে বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর প্রতি সরকারের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আছে। সুন্দরভাবে ক্লিনিক চালানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ বিবেচনাধীন।

তিনি আরও বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের যেসব সিএইচসিপি আছেন তারা যদি সঠিক সময় অনুযায়ী অফিস না করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে লিখিত দিতে হবে। পরবর্তীতে ওই অভিযোগের ভিত্তিতে কী ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। তাহলে ধীরে ধীরে কমিউনিটি ক্লিনিকের মান উন্নয়ন হবে। তবে যারা ক্লিনিকগুলোর তত্ত্বাবধায়নে যারা আছেন তাদেরকেও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

এনএইচআর/জেআইএম