ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের পর এবার দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। এরই ধারাবাহিকতায় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে দলটি।
ইতিমধ্যে যুবদলের কেন্দ্রীয় আংশিক কমিটিকে ১৫১ সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির গতিশীলতা বাড়াতে জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠন করা হবে বলে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যুবদলের শীর্ষ নেতারা।
বিএনপি সূত্র জানায়, শুধু যুবদল নয় পর্যায়ক্রমে দলটির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর কাজ ইতিমধ্যে শুরু করেছে দলের হাইকমান্ড।এর মধ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বরে মেয়াদোত্তীর্ণ স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি।
২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এস এম জিলানীকে সভাপতি ও রাজীব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল সংগঠনটির কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ ৩ বছর। বর্তমানে কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই কমিটির সুপার ফাইভের ৫ নেতার মধ্যে দুই নেতা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান মন্ত্রী পরিষদে যুক্ত আছেন।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া সংগঠনটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম ফিরোজকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাই বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিই সবার আগে পুনর্গঠন করা হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতারা। সাক্ষাৎকালে নেতারা নতুন কমিটির ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২৮ মার্চ প্রথমবারের মতো রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সে সময় ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব নতুন কমিটির বিষয়ে চেয়ারম্যানের কাছে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেন।
সবশেষ গত ৪ জুলাই গুলশানে অবস্থিত বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ফের সাক্ষাৎ করেন স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতারা। অনেকেই বলছেন, এটি তাদের বিদায়ী সাক্ষাৎ।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনা ও প্রশ্নের সূত্র ধরে সংগঠনটির বিভিন্ন স্তরে এবং পদে আসতে পারেন বলে যাদের নিয়ে আলাপ হচ্ছে, তাদের বেশ কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলেছে রাইজিংবিডি ডটকম।
এই আলাপে সামগ্রিকভাবে একটি বিষয় উঠে এসেছে। আর তা হলো, স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে একটিতে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকদের কাউকে বেছে নেওয়া হতে পারে। অন্যটি স্বেচ্ছাসেবক দলের চলমান কমিটির সহ-সভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্য থেকে কাউকে দেওয়া হতে পারে।
এদিকে জিলানী, রাজীব, ফিরোজ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দলের সক্রিয় নেতাদের মধ্যে অনেকের দাবি, সংগঠনের ভেতর থেকেই শীর্ষ নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হোক। তাদের যুক্তি, এতে কমিটির নিচের দিকে থাকা নেতারা উৎসাহ পাবেন। অন্য সংগঠন করা কাউকে শুরুতেই শীর্ষ পদে দায়িত্ব দিলে দীর্ঘদিন স্বেচ্ছাসেবক দল করে আসা নেতাকর্মীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
আলোচনায় যারা স্বেচ্ছাসেবক দলের ভেতর থেকে আলোচনায় আছেন বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ইয়াসিন আলী, সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মোখতার হোসাইন, রফিকুল ইসলাম রফিক, আব্দুর রহিম হাওলাদার সেতু, দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এম আর গণি মোস্তফা, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সাদরেজ জামান এবং স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন।
সভাপতি পদে আলোচনায় থাকা বর্তমান সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতির ছিলেন। ছাত্রদলের রাজনীতি দিয়ে শুরু করা রবিন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন।
ফখরুল ইসলাম রবিন রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “যদি আমাকে দায়িত্ব অর্পণ করে, তাহলে সর্বোচ্চ নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে একটি সুশৃঙ্খল, শক্তিশালী ও জনমুখী সংগঠন গড়ে তুলতে কাজ করব। সংগঠনের প্রতিটি স্তরে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে আমার অঙ্গীকার।”
স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজিব হল শাখার ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তার সম্পাদক ও সহ-সভাপতির দায়িত্ব পান। সেখান থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক এবং পরে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান নাজমুল।
নাজমুল হাসান রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “কমিটি গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন খুশি তখন কমিটি দেবেন। আমরা তার সিদ্ধান্তের প্রতি সর্বদা আস্থা রাখি।”
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কারাভোগের মাধ্যমে সাংগঠনিক দক্ষতার ভিত্তিতেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, “কমিটি গঠনসহ সব বিষয়ে সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত।”
স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদে আলোচনায় আছেন (উপরে বাঁ থেকে) ইয়াছিন আলী, আকরামুল হাসান মিন্টু এবং (নিচে বাঁ থেকে) রফিকুল ইসলাম রফিক ও সাইফ মাহমুদ জুয়েল।
পদ-পদবির প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জীবনবাজি রেখে রাজপথের প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছি। হামলা-মামলার শিকার হয়ে কারাভোগ করেছি। যেখানেই দায়িত্ব দেওয়া হোক, সেটাই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব, ইনশাআল্লাহ।”
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন বর্তমান প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এমআর গণি মোস্তফা। তিনি সাবেক সহ-সমবায় বিষয়ক সম্পাদক (কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দল), কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল নেতা।
১৯৯৯ সাল থেকে দীর্ঘ ২৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনে একাধিক মামলা, পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলায় বহুবার আহত হয়েছেন। ২০১৮ ও ২০২৩ সালের আন্দোলনে আহত হওয়ার পরও কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ও জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
মোস্তফা রাইজিংবিডিকে বলেন, “শহীদ জিয়ার আদর্শ ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি ভালোবাসায় আসক্ত হয়ে রাজনীতি করছি। আন্দোলন করতে গিয়ে আহত হয়েছি। ৩৩তম বিসিএস ভাইভা দিয়েছি, কিন্তু ছাত্রদল করার কারণে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন আমাদের অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেখানে রাখবেন সেখানেই কাজ করব।”
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন সাবেক ছাত্রনেতা। কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সভাপতির পদে থেকে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে সম্মুখভাগে নেতৃত্ব দেন তুহিন।
রাইজিংবিডি ডটকমকে তিনি বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হলো তৃণমূল থেকে সংগঠনকে আরো শক্তিশালী ও গতিশীল করা। দায়িত্ব পেলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদে যারা আলোচনায় রয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আকরামুল হাসান মিন্টু, ফজলুর রহমান খোকন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল। এছাড়া সর্বশেষ সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সুপার ফাইভে আলোচনায় আছেন সাবেক ছাত্রদল নেতা মামুন বিল্লাহ। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের একাধিক সাবেক শীর্ষ নেতা জানান, বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলোতে ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের বিশেষভাবে মূল্যালয়ন করা হয়ে থাকে। স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলে ধারাবাহিকভাবে ছাত্রদলের সাবেক নেতারাই দায়িত্ব পেয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান আগে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে ছাত্রদলের সাবেক একাধিক নেতা জানান, ছাত্রদলের সাবেক নেতা রাজিবের কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু, তার পরের কমিটির সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল এবং সবশেষ সাবেক সভাপতি শ্রাবণ ও সাধারণ সম্পাদক জুয়েল বিএনপির কোনো অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে নেই। তাদের প্রত্যাশা, বিএনপি চেয়ারম্যান ছাত্রদলের সাবেক এই পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করবেন।
জুয়েল রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “দলের দুর্যোগকালীন বিভিন্ন কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা এবং দলীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমি সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে যে দায়িত্ব দেবেন, আমি সেটাই মাথা পেতে নেব।”
ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সহ সভাপতি মামুন বিল্লাহ রাইজিংবিডিকে বলেন, “বিএনপিকে ভালোবেসে দলের সঙ্গে আছি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত।”
স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী বলেন, “আমরা আমাদের কাজ করছি। নতুন কমিটি করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।”








