প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের পর দেশটির সরকার ২ লাখ ৪২ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ৯ জুলাই সন্ধ্যা ৭টা ৪৬ মিনিটে ‘Freedom Bangla News’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে আলোচিত দাবিতে সম্ভাব্য প্রথম ফটোকার্ডটি শেয়ার করা হয়। পরবর্তীতে ‘Akash Ahamed’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ৯ জুলাই রাত ৯টা ১ মিনিটে শেয়ার করা পোস্টটি সামাজিক মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে। আজ ১১ জুলাই বিকেল ৩টা পর্যন্ত ওই পোস্টে প্রায় ৩ হাজার ২০০ রিয়েকশন, ২৮৬ কমেন্ট ও ৩১৩ শেয়ার রয়েছে।
আলোচিত দাবিতে আরও কিছু পোস্ট রয়েছে এখানে (১ , ২ , ৩ )
শেয়ার করা এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশিরভাগ ব্যবহারকারীই দাবিটিকে সত্য মনে করেছেন। একজন কমেন্ট করেছেন, ‘সুখবর তাহলে।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘এটাকেই বলে প্ল্যান।’ অন্য একজন কমেন্ট করেন, ‘আমার তারেক বন্ধু, মহাজাদু জানে।’ এ ছাড়া একজন লিখেছেন, ‘ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লোক লাগবে তো।’
আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরের পর দেশটির সরকার বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, তা নিয়ে দেশের এবং আন্তর্জাতিক মূলধারার গণমাধ্যমে অনুসন্ধান করে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিম।
প্রচারিত ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এটিতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পেরদানা পুত্রা ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গত ২২ জুন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের করমর্দনের একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কার্ডটিতে ছড়ানো দাবির সপক্ষে কোনো তথ্যসূত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে ‘জাগো নিউজ’ এবং মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম ‘নিউ স্ট্রেইটস টাইমস’ ও ‘দ্য এজ মালয়েশিয়া’ -এ গত ৮ ও ৯ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, ২ লাখ ৪২ হাজার প্রবাসী ফেরত পাঠানোর তথ্যটি সত্য হলেও, এটি কেবল বাংলাদেশিদের জন্য নয় এবং এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের কোনো সম্পর্ক নেই।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র উপমন্ত্রী শামছুল আনোয়ার নাসারাহ দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ দেওয়ান রাকইয়াতে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া সরকার ২০২৫ সালের মে মাস থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ‘মাইগ্র্যান্ট রিপ্যাট্রিয়েশন প্রোগ্রাম’ নামে একটি সাধারণ ক্ষমা ও নিজ দেশে প্রত্যাবাসন কর্মসূচি পরিচালনা করে। এই দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির আওতায় ১১২টি দেশের মোট ২ লাখ ৪২ হাজার ৯৩ জন অবৈধ অভিবাসীকে নিয়ম অনুযায়ী নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই কর্মসূচিতে মোট ২ লাখ ৬৪ হাজার ১৯ জন বিদেশি নিবন্ধন করেছিলেন, যাদের অধিকাংশকেই ইতিমধ্যে প্রত্যাবাসন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে ৫ হাজার ৪৭০টি অভিযান পরিচালনা করেছে এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে এই আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। অর্থাৎ, এটি মালয়েশিয়া সরকারের ১১২টি দেশের অবৈধ প্রবাসীদের বিরুদ্ধে নেওয়া একটি নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়া।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে গত ২১ জুন মালয়েশিয়ায় যান তারেক রহমান। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সরকারের কাছে আরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ, অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ এবং বন্ধ শ্রমবাজার দ্রুত খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। যার ধারাবাহিকতায় গত ৭ জুলাই শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘Freedom Bangla News’ নামের ফেসবুক পেজটিতে পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পেজটিতে শেয়ার করা বেশিরভাগ পোস্ট আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলবিরোধী। শেয়ার করা পোস্টগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশে রাজনৈতিক দাবি, অভিযোগ ও মন্তব্য উপস্থাপন করা হলেও, সেগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য সূত্র বা তথ্যপ্রমাণ সংযুক্ত করা হয় না। পাশাপাশি পেজটিতে এমন একাধিক পোস্টও পাওয়া যায়, যেগুলোর তথ্য পরবর্তী যাচাইয়ে অসত্য, বিভ্রান্তিকর হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের পর ২ লাখ ৪২ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসীকে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া—দাবিটি বিভ্রান্তিকর। মূলত, মালয়েশিয়া সরকারের ১১২টি দেশের অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়াকে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে।








