জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যদি মৃত্যুদণ্ড হয়, তাহলে একই ধরনের অপরাধের দায়ে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের সাজা হতে পারে না।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) ইনুর সাজার রায় ঘোষণার পর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এমন প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমার মনে হয়, আদালত সঠিকভাবে আইনের মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারেননি।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, প্রসিকিউশনের দৃষ্টিতে ইনুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে তার দায় শেখ হাসিনার দায়ের সমপর্যায়ের।

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে শেখ হাসিনার যে দায়, হাসানুল হক ইনুরও একই দায়। শেখ হাসিনার যদি মৃত্যুদণ্ড হয়, তবে হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের সাজা আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আরও পড়ুন

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড

এসব দুষ্কৃতিকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে সমাজে এ ধরনের অপরাধ বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রায়ের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রসিকিউশন এ রায়ে মোটেই সন্তুষ্ট নয় এবং ইনুর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল বলে আমাদের অবস্থান। তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাইব্যুনাল সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

তিনি বলেন, আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে অবশ্যই আপিল করবো। পাশাপাশি যে তিনটি অভিযোগে অপ্রতুল শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সেক্ষেত্রেও সাজা বাড়াতে আপিল করবো।

চিফ প্রসিকিউটরের দাবি, শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে ইনু উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে আন্দোলন দমন ও আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তনের লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের বিএনপি-জামায়াত সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত করার পক্ষে অবস্থান নেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইনু জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্ররোচনা ও উসকানি দিয়েছিলেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডারদের পরিচালিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দিয়েছিলেন। এ অভিযোগও বিচারে প্রমাণিত হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত হয় এবং সেই কারফিউ কার্যকরের অংশ হিসেবে ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশনা এবং বিএনপি ও জামায়াতকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করে নির্মূল করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে প্রসিকিউশনের দাবি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইনু একটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

আরও পড়ুন

ফরমায়েশি রায়ে সাজা দেওয়া হলো: ইনু

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে ইনু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেছিলেন। সেই কথোপকথনে শেখ হাসিনা অতীতে ‘জঙ্গিদের’ ফাঁসি দেওয়ার প্রসঙ্গ তুললে ইনু তাতে সমর্থন জানান এবং এবারও ‘জঙ্গি কার্ড’ ব্যবহারের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিভক্ত করা এবং বিএনপি-জামায়াতকে চিহ্নিত করে নির্মূল করার পরামর্শও দিয়েছিলেন।

তার অভিযোগ, ইনু কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন এবং সেই নির্দেশনার পর কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হন।

তিনি বলেন, ইনুর উসকানিমূলক বক্তব্য ও ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে সারাদেশে প্রায় ১,৪০০ ছাত্র-জনতা নিহত এবং ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ নীতির আওতায় এ ঘটনার দায় যেমন শেখ হাসিনার ওপর বর্তায়, তেমনই হাসানুল হক ইনুর ওপরও বর্তায়।

এফএইচ/এমকেআর