এবারই প্রথম ৪৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল। আগের নিয়মে অংশগ্রহণকারী সংখ্যা ছিল ৩২টি। গ্রুপ পর্ব শেষে প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল উঠতো নকআউটে। ভিন্ন কোনো হিসাব প্রয়োজন হতো না।
কিন্তু এবার নতুন ফরম্যাটে বিশ্বকাপের ৪৮টি দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে। প্রতি গ্রুপে খেলছে চারটি করে দল। টুর্নামেন্টের ফরম্যাট ঠিক রাখতে এই ১২টি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি রাউন্ড অব-৩২ এ উঠছে, অর্থাৎ মোট ২৪টি দল নিশ্চিতভাবে নকআউটে যাচ্ছে। এছাড়া আরও ৮টি দলকে তোলা হবে রাউন্ড অব-৩২ এ। ১২ গ্রুপের তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ১২টি দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হচ্ছে এই ৮টি দল।
এতে নকআউটে থাকছে ৩২টি দল। এই পর্ব শেষে পরের পর্বে থাকবে ১৬ দল, এরপর ৮টি (কোয়ার্টার ফাইনাল), এরপর ৪টি (সেমিফাইনাল) এবং সর্বশেষ দুটি (ফাইনাল)।
কিন্তু বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ অংশে এসে কিছু ভজকট বেধে গেছে। যদিও তা শুধু সাধারণ দর্শকদের ক্ষেত্রে। কারণ, সেরা তৃতীয় দল- এই হিসাবটাই অনেক মানুষের মাথায় ঢুকছে না। এমনকি বিশ্বকাপজয়ী স্পেন অধিনায়ক ইকার ক্যাসিয়াস বলেই বসেছেন, ‘পরের বিশ্বকাপ যেন ৬৪ দলের হয়। এই যে সেরা তৃতীয় দল, এ হিসাবটাই মাথায় ঢুকছে না।’
ইকার ক্যাসিয়াসের মতো অবস্থা সাধারণ মানুষেরও। মূলত কীভাবে সেরা তৃতীয় দল (৮টি) নির্ধারণ করা হচ্ছে, সে হিসাবটা স্পষ্ট করতেই এই লেখার অবতারণা। বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডে শুধু নিজের গ্রুপের ম্যাচ নয়, অন্য গ্রুপের ফলও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। একটি দলের ভাগ্য নির্ভর করছে অন্য গ্রুপের ফলাফলের ওপরও।

তৃতীয় স্থান অর্জনকারী সেরা আটটি দল কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে?
১২টি গ্রুপ থেকে স্বাভাবিকভাবেই ১২টি দল তৃতীয় স্থান অর্জন করছে। এই ১২ দল থেকে ৪টি বাদ দিয়ে ৮টি তোলা হবে পরের পর্বে। ফিফা তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলগুলো থেকে সেরা ৮টি দল বাছাই করার জন্য দলগুলো নিয়ে (১২টি দল) একটি আলাদা সম্মিলিত টেবিল তৈরি করছে। সেখানে দলগুলোকে নিচের ক্রম অনুযায়ী সাজানো হয়েছে-
১. সর্বাধিক পয়েন্ট
এই ১২ দলের মধ্যে স্থান নির্ধারণে প্রথম বিবেচনায় থাকবে পয়েন্ট। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচ শেষে এই ১২ দলের মধ্যে সম্মিলিতভাবে যে দলের পয়েন্ট বেশি, নিশ্চিতভাবেই তারা এগিয়ে থাকবে।
২. গোলের ব্যবধান
দ্বিতীয় ধাপে আসবে গোলের ব্যবধান। যদি পয়েন্টের ক্ষেত্রে দুই বা ততোধিক দল সমান অবস্থানে থাকে, তখন তাদের মধ্যে দেখা হবে গোল ব্যবধান। এই দলগুলোর মধ্যে বেশি ইতিবাচক গোল ব্যবধান থাকা দল এগিয়ে থাকবে।
৩. সর্বাধিক গোল
তৃতীয় ধাপে আসবে সবচেয়ে বেশি গোল কারা দিয়েছে, সে হিসাব। ১২ দলের মধ্যে কয়েকটি দলের এমনও হতে পারে, তাদের পয়েন্টও সমান এবং গোল ব্যবধান সমান, তাহলে হলে বিবেচনায় আসবে কোন দলটি বেশি গোল দিয়েছে। যে দল বেশি গোল দিয়েছে, তারা এগিয়ে থাকবে।
৪. ফেয়ার প্লে স্কোর
চতুর্থ ধাপে আসবে ফেয়ার প্লে স্কোর। প্রথম তিন ধাপেও কয়েকটি দল সমতায় চলে আসতে পারে। তখন কী হবে। এক্ষেত্রে দেখা হবে শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড। কম হলুদ ও লাল কার্ড পাওয়া দল এগিয়ে থাকবে। অর্থাৎ মাঠে শৃঙ্খলা বজায় রাখাও এবারের বিশ্বকাপে নকআউটে ওঠার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৫. সর্বশেষ ফিফা র্যাংকিং
সবার শেষে, দুই বা অধিক দলের মধ্যে- এসব ক্ষেত্রেও কোনো পার্থক্য না থাকে, তাহলে সর্বশেষ ১১ জুন ২০২৬ প্রকাশিত ফিফা র্যাংকিং বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজনে তার আগের র্যাংকিং রিপোর্টও দেখা হতে পারে।
কেন এত আলোচনায় তৃতীয় স্থান?
আগের ৩২ দলের বিশ্বকাপে গ্রুপে তৃতীয় হওয়া মানেই বিদায় ছিল অবধারিত। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে অনেক দল শেষ ম্যাচে হারলেও বা ড্র করেও অন্য গ্রুপের ফলের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
এ কারণে বিশ্বকাপের শেষ দিকের গ্রুপ পর্বে একাধিক দলের সমর্থককে ক্যালকুলেটর হাতে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। একটি গোল, একটি হলুদ কার্ড কিংবা গোল ব্যবধানের সামান্য পরিবর্তনও বদলে দিতে পারে নকআউটের সমীকরণ।
৪ পয়েন্ট পেলেও কেন নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না?
নতুন ফরম্যাটে ১২টি তৃতীয় স্থানের দলের মধ্যে ৮টি দল সুযোগ পাচ্ছে রাউন্ড অব-৩২ এ। ফলে ৪ পয়েন্ট নিয়েও কোনো কোনো দলকে অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। অনেক দল চার বা তার বেশি পয়েন্ট নিয়ে শেষ করে এবং গোল ব্যবধান বা গোলসংখ্যার কারণে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছিল।
যেমন প্যারাগুয়ে। ৪ পয়েন্ট নিয়ে তারা হয়েছে তৃতীয়। কিন্তু অন্য গ্রুপের দলগুলোর ম্যাচের ওপর তাদের নকআউট নির্ভর করছিল। যে কারণে শুরুতে তাদেরকে নিশ্চিত করা যায়নি। যদিও শুক্রবার রাতের ম্যাচগুলোর পর প্যারাগুয়ের নকআউট নিশ্চিত হয়ে গেছে।
অন্যদিকে তিন পয়েন্ট নিয়েও সুযোগ থেকে যায়, যদি অন্য তৃতীয় স্থান অধিকারী দলগুলোর ফল আরও খারাপ হয়। গোল ব্যবধান, গোল সংখ্যার কারণে অনেকেই এগিয়ে যাবে, অনেকেই পিছিয়ে যাবে।
প্রতি গ্রুপে তৃতীয় হওয়া দলগুলোর অবস্থান
অবস্থান
গ্রুপ
দল
ম্যাচ
জয়
ড্র
হার
গোল পক্ষে
গোল বিপক্ষে
ব্যবধান
পয়েন্ট
১
এফ
সুইডেন
৩
১
১
১
৭
৭
০
৪
২
ই
ইকুয়েডর
৩
১
১
১
২
২
০
৪
৩
বি
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
৩
১
১
১
৫
৬
-১
৪
৪
ডি
প্যারাগুয়ে
৩
১
১
১
২
৪
-২
৪
৫
আই
সেনেগাল
৩
১
০
২
৮
৬
+২
৩
৬
জি
ইরান
৩
০
৩
০
৩
৩
০
৩
৭
এল
ক্রোয়েশিয়া
২
১
০
১
৩
৪
-১
৩
৮
এ
দক্ষিণ কোরিয়া
৩
১
০
২
২
৩
-১
৩
৯
জে
আলজেরিয়া
২
১
০
১
২
৪
-২
৩
১০
সি
স্কটল্যান্ড
৩
১
০
২
১
৪
-৩
৩
১১
এইচ
উরুগুয়ে
৩
০
২
১
৩
৪
-১
২
১২
কে
ডিআর কঙ্গো
২
০
১
১
১
২
-১
১
নোট: সবুজ কালার- নকআউট নিশ্চিত, নীল কালার- অপেক্ষমাণ, লাল কালার- বিদায় নিশ্চিত।
রাউন্ড অব-৩২-এর প্রতিপক্ষ কিভাবে নির্ধারিত হয়?
নকআউট পর্বে ওঠার পরও তৃতীয় হওয়া দলগুলোর প্রতিপক্ষ আগে থেকে নির্ধারিত থাকছে না। কোন আটটি গ্রুপের তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল যোগ্যতা অর্জন করেছে, তার ওপর ভিত্তি করে ফিফার নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ম্যাচআপ তৈরি হয়।
এই সম্ভাব্য সমন্বয়ের সংখ্যা ৪৯৫টি। এ কারণেই ফিফা টুর্নামেন্ট রেগুলেশনের অ্যানেক্স-সি’তে সব সম্ভাব্য সমীকরণ আগেই প্রকাশ করে রেখেছে।
অর্থাৎ, কোনো দল শুধু তৃতীয় হয়ে নকআউটে উঠলেই হবে না- কোন গ্রুপ থেকে তৃতীয় হয়েছে এবং অন্য কোন গ্রুপের তৃতীয় দলগুলো যোগ্যতা অর্জন করেছে, সেটিও নির্ধারণ করবে তাদের রাউন্ড অব-৩২ এর প্রতিপক্ষ।
নতুন ফরম্যাটে বাড়ছে নাটকীয়তা
৪৮ দলের বিশ্বকাপে এই নতুন নিয়ম একদিকে যেমন ছোট দলগুলোর জন্য নকআউটে ওঠার সুযোগ বাড়িয়েছে, অন্যদিকে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনাও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন একটি গোল, একটি গোল ব্যবধান, এমনকি একটি হলুদ কার্ডও বিশ্বকাপে একটি দলের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।
সেই কারণেই এবারের বিশ্বকাপে শুধু নিজের ম্যাচ জিতলেই সব শেষ নয়; শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত চোখ রাখতে হচ্ছে অন্য গ্রুপের স্কোরবোর্ডেও।
আইএইচএস/








