বৃদ্ধ বয়সে আর সংসারের ভার বইতে পারছেন না মো. কবির হোসেন। সংসারের হাল ধরতে জীবিকার তাগিদে একমাত্র ছেলে মো. সাইফুল মিয়াকে সৌদি আরব পাঠিয়েছিলেন।

আশা ছিল এবার তিনি সংসারের দায়িত্ব থেকে অবসরে যাবেন। হাল ধরবেন একমাত্র ছেলে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, প্রবাস জীবনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় ছেলে চলে গেলো না ফেরার দেশে। এখন অর্থের অভাবে মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

সাইফুল ইসলাম চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সদর ইউনিয়নের মধ্যম তালবাড়িয়া গ্রামের মো. কবির হোসেনের ছেলে।

জানা গেছে, চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবের তায়েফে যান সাইফুল ইসলাম। সেখানে তিনি ছাগল পালনের চাকরি করতেন। গত ১৯ জুন রাতে ঘুমের মধ্যে সে মারা যায়। ছেলের মৃত্যুর খবরে দেশ থেকে বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ করে সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসে পাঠালেও এখনো পর্যন্ত মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মরদেহ সে দেশের পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।

আরও পড়ুন

কাজের নামে রাশিয়ায় পাচার / যুদ্ধে গিয়ে শ্যালক নিহত, দেশে ফিরতে ভগ্নিপতির আকুতি

সাইফুল মিয়ার বোন আসমা আক্তার বলেন, গত ২০ জানুয়ারি ভাইকে তার শ্বশুর মো. ইউনুস সৌদি আরব নিয়ে গেছেন। যাওয়ার পর কয়েকবার কথা হয়েছে। হঠাৎ ১৯ জুন আমাদের কাছে খবর আসে, ভাই ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক করে মারা গেছে। এরপর খোঁজ খবর নিয়ে মরদেহ দেশে আনার জন্য ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস দূতাবাসে পাঠিয়েছি।

দূতাবাস থেকে বলা হচ্ছে, মরদেহ দেশে নিতে হলে একজন বৈধ প্রবাসী দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু ভাইয়ের শ্বশুরের কাছে বৈধ কাগজ না থাকায় তিনি দায়িত্ব নিতে পারছেন না এবং মরদেহ দেশে আনতে বিমান ভাড়াও নেই।

তিনি আরও বলেন, একমাত্র ভাই। তাকে শেষবারের মতো দেখতে চাই। কয়েকটি ভাই থাকলে কথা ছিল। সেখানকার প্রবাসী ভাইদের কাছে অনুরোধ আমার ভাইয়ের মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করেন।

শেষবারের মতো সন্তানকে দেখার আকুতি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের

সাইফুলের বাবা মো. কবির হোসেন বলেন, কৃষিকাজ করে সংসার চালাই। বয়স হয়ে গেছে, আর পারছি না। তাই ধারদেনা করে ছেলেকে সৌদি আরব পাঠিয়েছি। আশা ছিল, ছেলে টাকা আয় করে সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু যাওয়ার ৬ মাসের মাথায় আমার ছেলে এভাবে চলে গেল। এখন ছেলের মরদেহও দেশে আনতে পারছি না। স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং সরকারের কাছে আকুতি, ছেলের মরদেহ যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করেন।

সাইফুলের স্ত্রী রিয়া মনি বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার দিন মোবাইলে আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। এরপর ঘুমিয়ে পড়বে বলছে। সকালে কাজে যেতে ডাকাডাকির পর যখন ঘুম থেকে উঠছেন না তখন দেখা যায় মারা গেছে। ওইদিন দুপুরে খবর আসে। এরপর মালিকের সঙ্গে কথা হয় মরদেহ দেশে পাঠানোর বিষয়ে। কিন্তু একদিন, দু-দিন পরে মালিক আর ফোন ধরে না। এখন কীভাবে স্বামীর মরদেহ দেশে আসবে বুঝছিনা। যারা প্রবাসে রয়েছেন তাদের কাছে অনুরোধ স্বামীর মরদেহ যেন দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

আরও পড়ুন

কাঁটাতারের এপারে বাবার মরদেহ, দেখতে পারলেন না ওপারের সন্তানরা

এদিকে ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে প্রায় পাগল হয়ে গেছেন মা জাহানারা বেগম। তিনি বলেন, কিছু চাই না, শুধু ছেলেটারে শেষবারের মতো একবার দেখতে চাই। যেভাবে হোক ছেলেকে বাড়িতে আনার ব্যবস্থা করেন।

ওই এলাকার বাসিন্দা সমাজকর্মী মেজবাউল আলম বলেন, কবির ভাই অনেক কষ্টে ছেলেকে সৌদি আরব পাঠিয়েছেন। ছয় মাস না যেতেই সেখানে মারা যাওয়া খুব কষ্টদায়ক। মারা যাওয়ার একমাস পার হয়ে গেলেও এখনো মরদেহ দেশে আনতে পারেনি। সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও প্রবাসী ভাইদের প্রতি অনুরোধ করবো, তারা যেন সাইফুলের মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, বিষয়টি অবগত ছিলাম না। প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে দেখব, সাইফুল মিয়ার মরদেহ দেশে নিয়ে আসতে কী উদ্যোগ নেওয়া যায়।

এম মাঈন উদ্দিন/এসজেডএইচ/এএসএম