সময় ৩৯ ছুঁই ছুঁই। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি। তবু মাঠে নামলেই যেন সময় থমকে যায়। ড্রিবল, পাস, গোল, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুতেই এখনো তিনি আলাদা। ২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি আবারও প্রমাণ করেছেন, বয়স তাঁর শরীরকে স্পর্শ করলেও ফুটবল মস্তিষ্ককে নয়।
অনেকে ভেবেছিলেন, এটি হবে কিংবদন্তির বিদায়ের মঞ্চ। কিন্তু উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে মেসি যেন লিখছেন আরেকটি নতুন অধ্যায়। গোল করেছেন, করিয়েছেন, কঠিন মুহূর্তে দলের হাল ধরেছেন এবং সবচেয়ে বড় কথা—যখনই আর্জেন্টিনা বিপদে পড়েছে, তখনই সামনে এসেছেন অধিনায়ক। আর্জেন্টিনা যে ফাইনালে উঠল, সেটি তো বলতে গেলে মেসিরই অবদান!
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সব ম্যাচ সহজে জেতেনি। বরং কেপ ভার্দে, মিসর, সুইজারল্যান্ড কিংবা ইংল্যান্ড—প্রতিটি নকআউট ম্যাচেই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছে লিওনেল স্কালোনির দলকে। কিন্তু প্রতিবারই দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফুটবলারের নাম ছিল মেসি। কখনো গোল করে, কখনো নিখুঁত পাসে, আবার কখনো পুরো ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে তিনি প্রতিপক্ষকে ভেঙে দিয়েছেন। এই বিশ্বকাপে করেছেন ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট।
বিশ্বকাপে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু গোল করা নয়। বরং খেলার গতিপথ নিজের ইচ্ছেমতো বদলে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। আগের মতো হয়তো ৫০-৬০ মিটার দৌড়ে পাঁচজনকে কাটিয়ে গোল করেন না, কিন্তু কোথায় দাঁড়াতে হবে, কখন গতি বাড়াতে হবে, কখন বল ছাড়তে হবে—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। এবারের বিশ্বকাপে মেসিকে আগের চেয়ে আরও বেশি দেখা গেছে ‘ফ্রি রোল’-এ। কখনো মাঝমাঠে নেমে খেলা গড়েছেন, কখনো ডান প্রান্তে সরে গিয়ে জায়গা তৈরি করেছেন, আবার কখনো বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে শেষ পাসটি দিয়েছেন। ফলে তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো অবস্থানে আটকে রাখা প্রতিপক্ষের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
মেসির আরেকটি বড় শক্তি হলো চাপের মুহূর্তে শান্ত থাকা। নকআউট পর্বে যখন ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়িয়েছে কিংবা আর্জেন্টিনা পিছিয়ে পড়েছে, তখন তাঁর শরীরী ভাষায় কখনো অস্থিরতা দেখা যায়নি। বরং তিনি সতীর্থদের শান্ত রেখেছেন, বলের দখল ধরে রেখেছেন এবং সুযোগের অপেক্ষা করেছেন। এই মানসিক দৃঢ়তাই আর্জেন্টিনাকে বারবার ম্যাচে ফিরতে সাহায্য করেছে।
শুধু আক্রমণেই নয়, নেতৃত্বেও অনন্য মেসি। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য পূরণ হয়ে গেছে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে দেখা গেছে আরও পরিণত এক অধিনায়ককে। তরুণদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ, মাঠে নির্দেশনা দেওয়া কিংবা কঠিন সময়ে দলকে এক রাখার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তিনি এখন শুধু একজন খেলোয়াড় নন, পুরো দলের চালিকাশক্তি।
অবশ্য মেসির খেলায় কিছু পরিবর্তনও এসেছে। বয়সের কারণে তিনি আগের মতো পুরো ম্যাচে উচ্চগতিতে খেলেন না। নিজের শক্তি বাঁচিয়ে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের জন্য। ম্যাচের দীর্ঘ সময় হয়তো তাঁকে তুলনামূলক নীরব মনে হয়, কিন্তু একটিমাত্র মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার সামর্থ্য এখনো তাঁর আছে। এই বিশ্বকাপে তাঁর আরেকটি ইতিবাচক দিক দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা। গ্রুপপর্ব থেকে নকআউট—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই তিনি প্রভাব রেখেছেন।








