নদীর বুকের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক সেতু, নেই সেতুর দুই প্রান্তে সংযোগ সড়ক। ফলে যে উদ্দেশ্যে সেতুটি তৈরি করা হয়েছিল এর সুবিধা পাচ্ছেন না এলাকাবাসী। তৈরির কয়েক বছরের মধ্যেই সেতুটি পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজারের ধাত্রী নদীর ওপর প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির নির্মাণ শেষ হয় প্রায় তিন বছর আগে। কিন্তু সংযোগ সড়ক না থাকায় আজও সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বরমী বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ধাত্রী নদীর ওপর জনদুর্ভোগ কমাতে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করে। ১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৮ মিটার। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মূল সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়। কিন্তু এরপর থেমে যায় পুরো প্রকল্পের কাজ। সেতুর উত্তর পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য ১ একর ৩৭ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে সেতুটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে আছে।
যানবাহন না চলায় বর্তমানে সেতুর ওপর বসছে সাপ্তাহিক হাট। সেতুর ওপর কোথাও স্তূপ করে রাখা হয়েছে কাঠ। কোথাও রাখা হয়েছে ধানের বস্তা; সবজির বাজার। সেতুর পূর্ব পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় স্থানীয়রা বালুর বস্তা ফেলে তৈরি করেছেন পায়ে চলার অস্থায়ী ব্যবস্থা। ঝুঁকি নিয়ে সেই পথ ব্যবহার করছেন পথচারীরা।
স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিদিন ময়মনসিংহ, গফরগাঁও, দক্ষিণ গফরগাঁও ও কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার মানুষ বরমী বাজার হয়ে যাতায়াত করেন। নতুন সেতু চালু না হওয়ায় সবাই পুরোনো সেতু ব্যবহার করছেন। এক লেনের ওই সেতুটিও এখন জরাজীর্ণ। মালবাহী ট্রাক কিংবা কাভার্ডভ্যান উঠলেই কাঁপতে থাকে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
কাওরাইদ এলাকা থেকে বরমী বাজারে পাইকারী পণ্য কিনতে আসা মুদি ব্যবসায়ী মিলন হোসেনের অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি বরমী বাজার থেকে পাইকারী দামে পণ্য কিনে এলাকার বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ করেন। কিন্তু বাজারে আসা-যাওয়ার পথে প্রায়ই যানজটে পড়তে হয়। পুরোনো সেতুতে একসঙ্গে কয়েকটি ছোট যানবাহন উঠলেই কাঁপুনি শুরু হয়। দ্রুত নতুন সেতুটি চালু হলে এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বরমীর বাসিন্দা আল আমিনের অভিযোগ, সেতুতে লাগানো বৈদ্যুতিক বাতি ও বিভিন্ন নাট-বল্টু মাদকসেবীরা খুলে নিয়ে বিক্রি করছেন। তার মতে, নতুন সেতু চালু থাকলে এভাবে যন্ত্রাংশ চুরি হওয়ার সুযোগ থাকত না।
কেন এত দিনেও চালু হলো না সেতুটি? এ প্রসঙ্গে গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ বলেন, জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে আগের ঠিকাদার সেতুর মূল নির্মাণকাজ শেষ করলেও সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করতে পারেননি। সংযোগ সড়ক ছাড়া বাকি বিল ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করে দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে সেতুটিকে যান চলাচলের উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভুঁইয়াও জানিয়েছেন, সেতুটি যান চলাচলের উপযোগী করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় বাকি কাজ শিগগিরই শুরু হবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, নদীর ওপর সেতু তৈরি হয়েছে, জমি অধিগ্রহণের জটিলতাও কেটে গেছে, তাহলে আর কত দিন অপেক্ষা? কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যে সেতু মানুষের যাতায়াত সহজ করার কথা, সেটি কবে সত্যিকার অর্থে মানুষের কাজে আসবে? এখন সেই অপেক্ষায় রয়েছেন বরমী বাজারের মানুষ।








