জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছর। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই চলছে সংগঠনের কার্যক্রম। এ অবস্থায় নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে সংগঠনের ভেতরেই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে সংগঠনটির সভাপতি এস এম জিলানী সংসদ সদস্য এবং সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ায় নতুন নেতৃত্বের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তুতি অনেক দূর এগিয়েছে। এখন মূল আলোচনা হচ্ছে- নেতৃত্ব বর্তমান কমিটির ভেতর থেকে আসবে, নাকি সংগঠনের বাইরে থেকে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে? বিষয়টি নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয় ২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ তিন বছর। সে হিসেবে গত বছরের সেপ্টেম্বরেই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে এ সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটিও গঠন করা সম্ভব হয়নি।
সংগঠনটির নেতারা বলছেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ওপর সরকারি দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও নতুন নেতৃত্ব নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন
ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা যে কোনো সময়, আলোচনায় একাধিক নেতা
আরও পড়ুন
বিএনপির কাউন্সিলের আগে আলোচনায় যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের পুনর্গঠন
দলীয় সূত্র বলছে, সম্প্রতি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো আরও গতিশীল করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন নেতৃত্বে আলোচনায় যারা
সংগঠনের অভ্যন্তর থেকে সম্ভাব্য নেতৃত্ব হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ইয়াসিন আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নাজমুল হাসান, সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন, যুগ্ম সম্পাদক কাজী মোক্তার হোসেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম নোমান এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন।
২০১৫ সালে রাজধানীতে আহত অবস্থায় পুলিশের হাতে আটক হন কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ/ছবি: সংগৃহীত
অন্যদিকে সংগঠনের বাইরে থেকে আলোচনায় রয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাবেক সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল।
যারা সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক অবস্থান ও চরিত্র হারিয়েছেন কিংবা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, তাদের নেতৃত্বে আনা উচিত নয়। সততা, ত্যাগ ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতেই নেতৃত্ব নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন।- নজরুল ইসলাম নোমান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ
দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা, ত্যাগ, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রেখে নতুন কমিটি গঠন করা হতে পারে।
‘ধারাবাহিক রাজনীতি করা নেতাদেরই মূল্যায়ন হওয়া উচিত’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম নোমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যারা ধারাবাহিকভাবে রাজনীতি করেছেন তাদেরই নেতৃত্বে আসা উচিত। দুই-চার বছর রাজনীতি করে মাঝপথে সংগঠন ছেড়ে আবার ফিরে আসা ব্যক্তিদের নয়, বরং যারা দীর্ঘদিন সংগঠনের আদর্শ ও শৃঙ্খলা মেনে রাজপথে সক্রিয় থেকেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন এবং দলের দুঃসময়ে পাশে থেকেছেন- তাদেরই নতুন কমিটিতে মূল্যায়ন করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘যারা সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক অবস্থান ও চরিত্র হারিয়েছেন কিংবা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, তাদের নেতৃত্বে আনা উচিত নয়। সততা, ত্যাগ ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতেই নেতৃত্ব নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন।’
আরও পড়ুন
পূর্ণাঙ্গ কমিটির পর সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের ঘোষণা যুবদলের
আরও পড়ুন
অঙ্গ সংগঠন পুনর্গঠন / কমিশন না সিলেকশন, সিন্ডিকেট না মেধা—দ্বিধায় বিএনপি
নজরুল ইসলাম নোমান আরও বলেন, ‘আমরা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, সংগঠন, দল ও দেশের স্বার্থে নেতৃত্ব দিতে চাই। দুঃসময়ে যেমন দলের জন্য কাজ করেছি, সুসময়েও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে চাই। পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতৃত্ব মূল্যায়িত না হলে সংগঠন, দল এবং দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর হরতালে পিকেটিং করার সময় শাহবাগ মোড় থেকে নাজমুল হাসানকে আটক করা হয়/ছবি: সংগৃহীত
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, রাষ্ট্রনায়ক ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে যোগ্য, পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতৃত্বের হাতেই নতুন কমিটির দায়িত্ব অর্পণ করবেন। তার সিদ্ধান্তের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।’
‘পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়নের প্রত্যাশা’
স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নাজমুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সবাই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির অপেক্ষায় আছি। দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন নতুন কমিটিতে হবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
‘নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে’
স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সভাপতি ডা. জাহেদুল কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংগঠনের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি হওয়া উচিত। কারণ, বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সভাপতি সংসদ সদস্য হওয়ায় সংগঠনের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে।’
আরও পড়ুন
স্বেচ্ছাসেবক দলের ৩১ সদস্যের কমিটির আহ্বায়কসহ ১৯ জনের পদত্যাগ
তিনি বলেন, ‘বিগত বছর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আমরা রাজপথের সম্মুখসারিতে থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছি। এখন দল, সংগঠন ও দেশের স্বার্থে আমাদের মতো পরীক্ষিত নেতাদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ দেওয়া উচিত।’
জাহেদুল কবির আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, আমরা তা শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে নেবো।’
সংগঠনের একাধিক নেতা মনে করেন, নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে। একই সঙ্গে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও অন্যান্য সাংগঠনিক ইউনিটের কার্যক্রমও আরও সক্রিয় হবে। তাদের প্রত্যাশা, নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ত্যাগ, গ্রহণযোগ্যতা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে
স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সম্পাদক কাজী মোক্তার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘যারা ত্যাগী, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নেতাদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হলে সংগঠনে নতুন গতি ফিরে আসবে এবং তৃণমূলও আরও সক্রিয় হবে।’
প্রত্যাশায় নেতাকর্মীরা
সংগঠনের একাধিক নেতা মনে করেন, নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে। একই সঙ্গে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও অন্যান্য সাংগঠনিক ইউনিটের কার্যক্রমও আরও সক্রিয় হবে। তাদের প্রত্যাশা, নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ত্যাগ, গ্রহণযোগ্যতা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
আরও পড়ুন
যুবদলের সভায় হট্টগোলের খবর, অতিরঞ্জিত দাবি নয়নের
দলীয় সূত্রগুলোর মতে, নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সবকিছু ঠিক থাকলে যে কোনো সময় জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮০ সালের ১৯ আগস্ট জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে সাংবাদিক কাজী সিরাজকে আহ্বায়ক করে ২৩ সদস্যের প্রথম কমিটি গঠন করা হয়। এরপর ১৯৮৫ সালের ১৯ আগস্ট কাজী আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে ২৯ সদস্যের আরেকটি কমিটি ঘোষণা করা হয়। চার দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রাম, দুর্যোগে মানবিক সহায়তা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে সংগঠনটি। নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার মধ্যদিয়ে সেই সাংগঠনিক ধারাবাহিকতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে প্রত্যাশা নেতাকর্মীদের।
কেএইচ/ইএ/ এমএফএ








