নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে অনেকে আপত্তি করেছেন। এ ব্যাপারে আমি বলতে চাই-আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে কিছু বলিনি। যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন সিম্পলি দুঃখ প্রকাশ করছি। তিনি আরও বলেন, উচ্চ মাধ্যমিকের পদার্থ বিজ্ঞান, হিসাব বিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা আবার নেওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে একটি বিলের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সবার সঙ্গে কথা বলে পরীক্ষা বহাল রেখেছি।
তিনটি বিষয়ে আবারও পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী মিলন বলেন, এ ব্যাপারে আমরা অনেক পর্যালোচনা করে দেখেছি। সোমবার পদার্থ বিজ্ঞান, হিসাব বিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা হয়েছে। পরীক্ষার সময় বৃষ্টি ছিল; অনেকেই ভিজেছে এবং অনেকে পরীক্ষা সঠিকভাবে দিতে পারেনি এমন অভিযোগ এসেছে। আমরা যদিও সব সময় পর্যবেক্ষণের মধ্যে ছিলাম। পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি এসেছে। বন্যার কারণে এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রতিটি জেলার পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছি। এক্ষেত্রে আমরা ভেবেচিন্তে দেখেছি-চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা যখন নিতে যাব তখন পদার্থ বিজ্ঞান, হিসাব বিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারব ইনশাআল্লাহ।
প্রশাসন, শিক্ষা বোর্ড ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে এইচএসসি পরীক্ষা বহাল রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ৬৪টি জেলার এসপি, আটটি বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এবং প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। পাশাপাশি আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। তারা জানিয়েছিলেন আর বৃষ্টি হবে না। সংশ্লিষ্ট সবাই বলেছিলেন-আবহাওয়া ভালো থাকবে। এ কারণেই আমরা পরীক্ষা বহাল রেখেছি। এদিকে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এইচএসসির পদার্থ বিজ্ঞানের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল ছিল। এসব প্রশ্নে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা আশ্বাস দিচ্ছি যেসব পরীক্ষা কেন্দ্রে ভুলত্রুটি হয়েছে সেখানে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার বিধান আমাদের রয়েছে।
সম্পূরক প্রশ্ন উত্থাপন করে রুমিন ফারহানা বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাটি কিছুটা পেছানোর জন্য অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এ কারণে আন্দোলনও হয়েছে। এইচএসসির মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, যেটার ওপর আগামীতে একটা ছেলে বা মেয়ের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে তা নির্ভর করে। আর পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের এ দাবি বিবেচনার কী সমস্যা ছিল, কেন পরীক্ষাটি অন্তত একদিন বা দুদিনের জন্য পিছিয়ে দেওয়া গেল না-তা মন্ত্রীর কাছে তিনি জানতে চান। জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা বারবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, না স্যার, আমরা ঠিকমতো পরীক্ষা নিচ্ছি। আপনারাও দেখেছেন কোথায় কোথায় বৃষ্টির পানি ছিল। সেগুলো আমরা সবাই লক্ষ্য করেছি। কোমলমতি সন্তানদের জন্য আমাদেরও মায়া রয়েছে। এ কারণেই আমরা সব সময় পরিস্থিতি মনিটরিং করি। তিনি বলেন, পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল ছিল। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, কোথাও পরীক্ষা গ্রহণে কোনো ধরনের দুর্যোগজনিত সমস্যা হয়নি। তিনি বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের মাঠ পানিতে ভরে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা মেয়র, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিই পরীক্ষাকেন্দ্র স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে। পরে পরীক্ষার্থীদের নৌকায় ওই স্কুলের পাঁচতলা ভবনে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। আমরা পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছি।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমনে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে সম্পূরক প্রশ্নে জামায়াতের সংসদ-সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ জানতে চান। জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা সবাই উদ্বিগ্ন বর্ষা মৌসুমে পরীক্ষা নিয়ে। পরীক্ষা নিয়ে আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে ছিলাম এবং আছি, সারা দিনই এ কাজটি করে থাকি। কোনো কেন্দ্রে পানি উঠলে তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্র সরিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় প্রশাসনকে আমরা এ দায়িত্ব দিয়েছি।
কুমিল্লা পরীক্ষা কেন্দ্রের কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অন্য জায়গায় পানি উঠেছে তা তেমন বেশি নয়, গুটি কয়েক স্থানে সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্র পালটানো হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের যে সুবিধা দেওয়ার তা দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে কাজটি করছি। তিনি বলেন, কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা শুধরিয়ে দেওয়া আমাদের জন্য বিরাট কাজ নয়। কারণ আমরা অনেক জায়গায় পরীক্ষা বন্ধ করেছি। আমাদের প্রশ্ন সেট রয়েছে। প্রয়োজনে আমরা আবারও পরীক্ষা নেব। আবারও পর্যালোচনা করছি, যদি কোথাও প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠার পর পরীক্ষা দিতে না পারে, সে জরিপ আমাদের কাছে আসার পরে প্রয়োজনে আমরা পুনরায় পরীক্ষা নিতে পারি। আমরা চট্টগ্রাম বোর্ডে এ ব্যবস্থা করেছি। সে অবস্থান আমাদের রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের আমরা বঞ্চিত করতে পারি না, বঞ্চিত করব না। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করে বলব-তারা পড়ার টেবিলে ফিরে যাক। আমরাই উদ্বিগ্ন তাদের চেয়ে বেশি, কীভাবে পরীক্ষা সঠিকভাবে নেব। কিভাবে এ দুর্যোগ মোকাবিলা করব। আমরা আশ্বাস দিচ্ছি-যেসব পরীক্ষা কেন্দ্রে ভুলত্রুটি হয়েছে, সেখানে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার বিধান আমাদের রয়েছে।
সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ-সদস্য মার্জিয়া বেগমের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি সাধারণ বা বিশেষায়িত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে রূপান্তরের যে দাবি উঠেছে তা সরকারের ভাবনায় রয়েছে। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ভেটিংয়ের কাজ চলছে। ইউরোপ ও আমেরিকার পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি বিশেষায়িত ‘স্কুল অব অ্যাগ্রিকালচার’ বা কৃষি অনুষদ গড়ে তোলা হবে। যা এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাবে।
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের পরিকল্পনা নেই : বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এসব বিদ্যালয় বিবেচনায় আনা হবে। জামায়াতে ইসলামীর সদস্য মো. আব্দুল ওয়ারেসের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ-সদস্য মো. গোলাম রসুলের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৫০টি একাডেমিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ডিগ্রি (পাশ) কলেজ এবং ৬৯৮টি একাডেমিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ডিগ্রি (সম্মান) কলেজ রয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ৫৬টি এমপিওভুক্ত ডিগ্রি কলেজ রয়েছে বলে জানান তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার পর্যায়ক্রমে এমপিওবহির্ভূত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং নির্ধারিত সব যোগ্যতা পূরণ সাপেক্ষে এমপিওবহির্ভূত ডিগ্রি কলেজগুলোও ধাপে ধাপে এমপিও ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।






