একসময় গাজীপুরের ভোর শুরু হতো নদীর কলকল শব্দে। চিলাই, শীতলক্ষ্যা, বানার, বালু ও তুরাগ- এই পাঁচ নদী ছিল জেলার প্রাণ। নদীর বুক চিরে চলত পালতোলা নৌকা, জেলেদের জালে উঠত দেশীয় মাছ, আর বর্ষার পানিতে ভেসে আসা পলি কৃষকের জমিকে করত উর্বর। নদী ছিল জীবন, জীবিকা ও জনপদের কেন্দ্র। তবে, সময়ের ব্যবধানে সেই নদীগুলোর চেহারা যেন পাল্টে গেছে। 

বর্তমানে কোথাও নদী সরু নালায় পরিণত হয়েছে, কোথাও কালচে পানির স্তব্ধতা, আবার কোথাও নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া কঠিন। শিল্পবর্জ্য, দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকিতে গাজীপুরের নদীগুলো আজ ভয়াবহ সংকটে। নদীর সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য খাল, বিল ও জলাশয়ও একই পরিণতির শিকার। 

পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী এক দশকের মধ্যে এ অঞ্চলের পরিবেশগত ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গাজীপুর। এখানে হাজারো পোশাক কারখানা, টেক্সটাইল, ডাইং, ওয়াশিং, রাসায়নিক, ফার্মাসিউটিক্যাল, প্লাস্টিক, খাদ্য ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে প্রকৃতি তার বড় মূল্য দিচ্ছে।

পরিবেশ আইন অনুযায়ী প্রতিটি দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন ও নিয়মিত চালু রাখা বাধ্যতামূলক। অভিযোগ উঠেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমাতে ইটিপি সচল রাখে না। কোথাও শুধু পরিদর্শনের সময় ইটিপি চালানো হয়, আবার কোথাও গোপন পাইপলাইন বা ড্রেন দিয়ে অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়। এর ফলে নদীর পানি কোথাও কালো, কোথাও লালচে, আবার কোথাও রাসায়নিক ফেনায় ঢেকে যাচ্ছে। দুর্গন্ধে নদীর আশপাশের পরিবেশও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

শিল্পকারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য পানিতে মিশে তুরাগ নদকে দূষিত করে তুলছে

চিলাই নদী ও আশপাশের বিল একসময় ছিল দেশীয় মাছের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, শিং, মাগুর, কৈ, টেংরা, পাবদা, গজার, টাকি ও চিংড়িসহ অসংখ্য দেশীয় মাছ পাওয়া যেত।

বর্তমানে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ মৃত মাছ ভেসে ওঠার ঘটনা ঘটছে। নদীভিত্তিক জীববৈচিত্র্য দ্রুত বিলুপ্তির পথে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র। নদী মারা গেলে তার সঙ্গে অসংখ্য প্রাণী, উদ্ভিদ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যও ধ্বংস হয়ে যায়।

দূষণের প্রভাব নদীতেই সীমাবদ্ধ নেই। দূষিত পানি সেচের মাধ্যমে কৃষিজমিতে প্রবেশ করছে। এতে মাটির উর্বরতা কমছে এবং জমিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি বাড়ছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর বিজ্ঞানীরা গাজীপুরের দূষণপ্রবণ এলাকার কৃষিজমির মাটি পরীক্ষা করে উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছেন। তাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, কয়েকটি এলাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তুলনায় বিভিন্ন ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি অনেক বেশি।

তুরাগ নদী

বিজ্ঞানীদের মতে, এসব মাটিতে উৎপাদিত ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য খাদ্যশস্য মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পবর্জ্যের ভারী ধাতু ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি, লিভার, ফুসফুস ও স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে ক্যানসার, কিডনি বিকল, জন্মগত ত্রুটি, হরমোনজনিত সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, ত্বকের রোগসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি খাল দখল ও ভরাটের কারণে গাজীপুরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। অনেক খাল সংকুচিত হয়ে গেছে, কোথাও আবার পুরোপুরি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি।

গাজীপুরের নদ-নদী শুধু জলধারা নয়; এগুলো জেলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। বহু গ্রাম, বাজার, নৌপথ ও জনপদ গড়ে উঠেছিল এসব নদীকে কেন্দ্র করে।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষায়, একসময় নদীতে নৌকাবাইচ হতো, সারি গান ভেসে আসত, জেলেরা মাছ ধরে সংসার চালাতেন। এখন অনেক জায়গায় নদীর বুকে হাঁটা যায়। কোথাও পানি নেই, কোথাও জমেছে কালো বর্জ্যের স্তূপ।

গাজীপুর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আরেফিন বাদল বলেন, “শিল্পায়নের কারণে গাজীপুর বর্তমানে দেশের অন্যতম পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ জেলা। জেলায় পরিবেশগত ছাড়পত্রপ্রাপ্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। এত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকির তুলনায় জনবল, যানবাহন ও কারিগরি সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।”

তিনি জানান, সীমিত সম্পদ নিয়েও পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে দুটি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। শব্দদূষণবিরোধী অভিযানে দুটি যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং তিনটি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়। একই মাসে ব্যাটারি ও সীসা দূষণবিরোধী অভিযানে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে একটি জেনারেটর জব্দ করা হয়।

এ ছাড়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরের এনফোর্সমেন্ট উইং জুন মাসে গাজীপুরের ৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে মোট ৭ লাখ ৬১ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করে। একই সময়ে ২১টি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সংক্রান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং ৮টি নথি পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থার জন্য সদর দপ্তরে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, “গাজীপুরের অধিকাংশ নদী এখন দখল, ভরাট ও শিল্পবর্জ্যের নির্মম আগ্রাসনে অস্তিত্ব সংকটে। নদী ও নদীর ফোরশোর দখল করে শিল্পকারখানা, আবাসন প্রকল্প, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য নদীর পানি, তলদেশ, কৃষিজমি, জলাশয়, ভূগর্ভস্থ পানির উৎস এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।”

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, পানি আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য নির্গমনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে পরিবেশবাদীদের মতে, নিয়মিত মনিটরিং, সমন্বিত অভিযান এবং দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা ছাড়া পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ইটিপি চালু নিশ্চিত করা, গোপন বর্জ্য নির্গমন লাইন শনাক্ত করে বন্ধ করা, নদী-খাল-বিল দখলমুক্ত ও পুনঃখনন, নিয়মিত পানি ও মাটির মান পরীক্ষা, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।

বর্ষায় উজানের পানিতে গাজীপুরের নদীগুলো সাময়িকভাবে কিছুটা প্রাণ ফিরে পেলেও বর্ষা শেষে আবারো শিল্পবর্জ্যের বিষাক্ত ছোবলে তারা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কালো পানি, দুর্গন্ধ আর রাসায়নিক দূষণ এখন নদীর নতুন পরিচয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় নদীর পানিতে নামলেই চুলকানি, অ্যালার্জি ও চর্মরোগ দেখা দেয়।

একসময় যে নদী ছিল জীবিকার উৎস, আজ তা উদ্বেগের প্রতীক। তাই নদী রক্ষা মানেই শুধু একটি জলধারা সংরক্ষণ নয়- গাজীপুরের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।