ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বারুইপুর এলাকায় ১১ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উত্তাল পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতি। রবিবার (৫ জুলাই) বিজেপি সরকারের আমলে প্রথম ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে বারুইপুর।
দীর্ঘসময় রেল, সড়ক অবরোধ, এক সন্দেহভাজন অভিযুক্তকে গণপিটুনিতে হত্যার অভিযোগ উঠে উত্তেজিত জনতার বিরুদ্ধে। ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছালে পুলিশের গাড়িতে চলে ভাঙচুর। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে আনতে মোতায়েন করা হয় পুলিশ র্যাফ ও আধা সামরিক বাহিনী।
রবিবার সন্ধ্যার দিকে ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। অভিযোগ ওঠে, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারুইপুর যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে কালীঘাটের বাড়িতেই আটকে দেয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন। মমতার অভিযোগ, বারুইপুর যাওয়ার ঠেকাতে তাকে নজরবন্দী করেছে শুভেন্দু অধিকারীর পুলিশ প্রশাসন।
জানা গেছে, শনিবার বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিল বারুইপুরের সূর্যপুর হাট এলাকার ১১ বছরের এক শিশু। পরিবারের তথ্যানুযায়ী, খাবার কেনার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সে। এরপর চার অভিযুক্ত তাকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে নিখোঁজ মামলা করা হলে তদন্ত শুরু করে বারুইপুর থানার পুলিশ।
রবিবার সকালে মেয়েটির বাড়ির কাছের একটি পুকুর থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তকারীদের অনুমান শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে শিশুটিকে।
এই ঘটনার জেরে এদিন সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সূর্যপুর হাট এলাকা। এক অভিযুক্তকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে বিক্ষুব্ধদের বিরুদ্ধে। কুলপি রোডে শিশুটির মরদেহ রেখে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করা হয়। পাশাপাশি শিয়ালদহ-নামখানা রুটের ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবরোধ তুলতে গেলে পুলিশের ওপরে হামলা চালান বিক্ষোভকারীরা। পুলিশকে ঘিরেও বিক্ষোভ শুরু হয়। অভিযোগ, পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট, কাচের বোতল ছোড়া হয়। আহত হন একাধিক পুলিশকর্মী। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় অতিরিক্ত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।
রবিবার ভোরে ঘটনা প্রকাশ্যে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কমিটি গঠন করে তদন্ত শুরু করে বারুইপুর জেলা পুলিশ। দুপুরেই নির্যাতিতার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এরপরই সন্ধ্যায় অ্যাডিশনাল এসপি পিনাকী দত্তের নেতৃত্বে একটি ৬ সদস্যের তদন্ত গঠন করা হয়।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাকিদের খোঁজে শুরু হয়েছে তল্লাশি। অন্যদিকে, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, পুলিশের ওপর হামলা, অবরোধ এবং অভিযুক্তকে পিটিয়ে খুনের ঘটনায় দুটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।
এদিকে তৃণমূল কংগ্রেস সূত্রে দাবি, বিকেলের পর বারুইপুরে নিহত শিশুটির পরিবারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার আগেই কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন চত্বর ঘিরে ফেলা হয় পুলিশবাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনী দিয়ে। এর আগে অবশ্য নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। পাশে থাকার আশ্বাস দেন। এরপরই একটি ভিডিও বার্তায় আচমকা তার বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েন নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন।
মমতার দাবি, তিনি যাতে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যেতে না পারেন সেই কারণেই আচমকা এই পুলিশ মোতায়েন। মমতা বলেন, “আমি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন কী ঘটল যে হঠাৎ আমার বাড়ির সামনে সিআরপিএফ, আরপিএফ মোতায়েন করা হলো? আমরা চোর না ডাকাত? কোনো দিন দাঙ্গা করেছি? আমি তো এখন একা, আমাকে নিয়ে এত চিন্তা কেন? আমাকে নজরবন্দি করা হয়েছে কেন? আপনারা কী চাইছেন আমি বুঝতে পারছি না?”
তৃণমূল কংগ্রেসের (কালীঘাট) মুখপাত্র কুনাল ঘোষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে জানান, “বারুইপুরে যেতে চেয়েছিলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাকে আটকে দিয়েছে বিশাল পুলিশবাহিনী।”
মমতার দলের আরেক সংসদ ও মুখপাত্র দোলা সেন বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারুইপুর যেতে চেয়েছিলেন, পুলিশ দিয়ে পুরো বাড়ি গিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। তারা কী দিদিকে হাউজ অ্যারেস্ট করেছে? নজরবন্দি করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কি তারা আটকে রাখতে পারবেন? যা হচ্ছে ঠিক হচ্ছে না। এটা ইমার্জেন্সি না, সুপার ইমার্জেন্সি চলছে।”








