বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজতেই স্পেনের ফুটবলাররা যখন আনন্দে মেতে উঠেছেন, তখন অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন লিওনেল স্কালোনি। চোখে জল, কণ্ঠে ক্লান্তি, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।

টানা দুই বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে তুলেছিলেন তিনি। ২০২২ সালে শিরোপা জিতেছিলেন, ২০২৬ সালে নিয়ে এসেছিলেন ফাইনাল পর্যন্ত। কিন্তু নিউ জার্সির সেই রাতে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে স্পেনের কাছে ১-০ ব্যবধানে হারার পর যেন ভেঙে পড়লেন আর্জেন্টাইন কোচ।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি স্বীকার করলেন, এই দলের সঙ্গে তাঁর পথচলা আদৌ চলবে কি না, সেটিও এখন নিশ্চিত নন, ‘আমি ফেডারেশনের সভাপতির সঙ্গে কথা বলব। আমার মাথায় কিছু ভাবনা আছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত আমার চুক্তি রয়েছে, সেটি শেষ করব। তারপর কী করব, সেটা নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে।’ এরপরই আসে সবচেয়ে আবেগঘন স্বীকারোক্তি, ‘এত বড় কিছু আবার করা সম্ভব কি না, আমি জানি না। হয়তো বিষয়টি নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে।’

২০১৮ বিশ্বকাপে হতাশাজনক বিদায়ের পর যখন আর্জেন্টিনার দায়িত্ব পান স্কালোনি, তখন তাঁকে নিয়ে ছিল অনেক সংশয়। প্রধান কোচ হিসেবে প্রায় কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না তাঁর। অনেকেই বিশ্বাসই করেননি, এই তরুণ কোচ জাতীয় দলকে বড় কোনো সাফল্য এনে দিতে পারবেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই ইতিহাস বদলে দেন তিনি। তাঁর হাত ধরেই ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। এরপর আসে ২০২২ বিশ্বকাপের মহাকাব্যিক জয়। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকা। আর ২০২৬ সালে দলকে নিয়ে যান টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে।

যদি ডিসেম্বরের পর সত্যিই দায়িত্ব ছেড়ে দেন, তাহলে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল কোচ হিসেবেই বিদায় নেবেন স্কালোনি। তবু তাঁর মনে এখন একটাই প্রশ্ন, এই দলকে আবার কী আগের মতো গড়ে তোলা সম্ভব?

সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে গিয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন তিনি, ‘আমি কখনো কল্পনাও করিনি, আমার কোচিং স্টাফও ভাবেনি যে আমরা এখানে পৌঁছাতে পারব।’ কিছুক্ষণ থেমে আবার বলেন, ‘এভাবে এগিয়ে যেতে হলে অনেক কিছু দরকার। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নিজেকে নতুন করে প্রস্তুত করা। কিন্তু এই দলের মতো আরেকটি দল তৈরি করা খুবই কঠিন। সত্যিই খুব কঠিন।’

শেষ কথাগুলো বলতে বলতেই কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তাঁর, ‘এটা খুব কষ্টের। আমি সত্যিই খুব দুঃখিত।’ এরপর আর কিছু না বলেই সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে বেরিয়ে যান স্কালোনি। উপস্থিত সাংবাদিকেরা দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে বিদায় জানান সেই কোচকে, যিনি কয়েক বছরের মধ্যেই আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে ফেলেছেন।

তবে হতাশার মাঝেও প্রতিপক্ষের প্রাপ্য সম্মান দিতে ভোলেননি তিনি। স্কালোনি অকপটে স্বীকার করেন, ফাইনালে স্পেনই ছিল ভালো দল, ‘আমাদের সমর্থকদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তারা সবসময় আমাদের শক্তি দিয়েছে। আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি।’ এরপরই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার কথা তিনি বলেন, ‘স্পেন জয়ের যোগ্য ছিল। এটাই সত্য। আমাদের সেটা মেনে নিতে হবে। তবে আমরা খুব কাছাকাছি ছিলাম।’

নিজের খেলোয়াড়দের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আর্জেন্টাইন কোচ, ‘এই দল আমাকে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে এসেছে। এজন্য আমি প্রত্যেক খেলোয়াড় এবং যারা আমাদের পাশে ছিল, সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।’

স্কালোনির সামনে এখন আরেকটি কঠিন বাস্তবতাও অপেক্ষা করছে। এই দলের অনেকেই হয়তো আর ২০৩০ বিশ্বকাপে থাকবেন না। ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির আরেকটি বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ২০২২ ও ২০২৬ সালের দুই ফাইনালেই যারা খেলেছেন, সেই দলের বড় একটি অংশও বদলে যাবে আগামী চার বছরে। অর্থাৎ, যদি স্কালোনি থেকে যানও, তাহলে তাঁকে শুরু করতে হবে একেবারে নতুন একটি অধ্যায়।

ফাইনালের হার শুধু একটি শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার গল্প নয়। এটি হয়তো এমন এক যুগের শেষ দৃশ্য, যে যুগে স্কালোনি, মেসি আর তাঁদের সতীর্থরা আর্জেন্টিনাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসনে।