ক্লাসে ক্লাসে ঘড়ি ধরে চলছে পাঠদান। প্রাঙ্গণজুড়ে শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত চলাফেরা, কোলাহল। বাইরের এ ছবি দেখে মনে হবে, উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ফিরেছে তার চেনা ছন্দে। কিন্তু গত রোববার যুদ্ধবিমান ভেঙে পড়ে বিধ্বস্ত ভবনটির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই বোঝা গেল, এখনো কতটা ভারী হয়ে চেপে আছে সেই আতঙ্কের স্মৃতি।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মূল ক্যাম্পাসে দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত ভবনটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের অনেকেই একপলক থমকে দাঁড়াচ্ছিল। প্রতিনিয়তই এ পথে হাঁটে তারা। এত দিন ধরে প্রায়ই হয়তো ফিরে তাকাচ্ছে। কিন্তু ভয়ংকর সেই দিনটি বছর ঘুরে সামনে আসায় মনের পর্দায় নতুন করে জেগে উঠছে ২১ জুলাইয়ের বিভীষিকা। বুক ভেঙে যাচ্ছে হারানো প্রিয় সতীর্থ, সহকর্মীদের কথা মনে করে। চোখে-মুখে অবর্ণনীয় বিষাদের ছাপ।
গত বছরের ২১ জুলাই দুপুরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে মাইলস্টোন স্কুলের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হয়। প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাসে মুহূর্তেই নেমে এসেছিল মৃত্যু, ধ্বংস আর আতঙ্কের করাল ছায়া। ভয়াবহ সেই ঘটনায় আগুনে পোড়াসহ নানাভাবে প্রাণ হারায় ৩৫ জন। নিহতদের বড় অংশই ছিল শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী। আহত হয় আরও অনেকে।
একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, সেই দুর্ঘটনার পর থেকে অনেক দিন আকাশে বিমান উড়তে দেখলেই তাদের ভয় করত। সে আতঙ্ক কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে অনেকেরই সময় লেগেছে। প্রথম দিকে অনেকে স্কুলে ফিরতেও ভয় পেত। শ্রেণিকক্ষে বসে অস্বস্তি বোধ করত অনেকেই। সময়ের সঙ্গে সেই ভয় আর অস্বস্তি অনেকটাই কমেছে। আবার ক্লাস চলছে, পরীক্ষা হচ্ছে, জমছে সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সহপাঠীদের স্মৃতি এখনো তাদের কাছে জীবন্ত।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাবাসুম খানম বলছিল, ‘দুর্ঘটনার দিনের কথা মনে পড়লে মনটা খারাপ হয়ে যায়। যারা আমাদের সঙ্গে ছিল, তারা আর নেই।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নুরুন নবী বললেন, দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর পুরো প্রতিষ্ঠান স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা প্রায় তিন মাসের চেষ্টায় পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক করে এনেছি। যারা আহত হয়নি, তারা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে।’
সরকারি ক্ষতিপূরণের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেখভাল করেছে এবং স্কুল কর্তৃপক্ষও এতে যুক্ত ছিল। তবে অভিভাবকদের অনেকেই আর্থিক সহায়তা গ্রহণে রাজি হননি।
এক বছর পরও পুরো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যরা। কখনো ক্যাম্পাসে এলে শত শত শিক্ষার্থীর ভিড় দেখে মা-বাবার মনে হয়, এই বুঝি হারিয়ে যাওয়া সন্তানটি ছুটে এসে হাত ধরবে।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদের বাবা মো. রুবেল মিয়া তেমনই একজন। মাইলস্টোন ক্যাম্পাসে এখনো বড় ছেলের স্মৃতি খুঁজে বেড়ান তিনি। রুবেল মিয়া বলেন, ‘সকালবেলা যে তরতাজা সন্তানকে নিজের হাতে স্কুলে দিয়ে গিয়েছিলাম, দুপুরে তাকে ফিরে পেয়েছি লাশ হিসেবে। স্কুলে যখন আসি, শত শত ছাত্রছাত্রীর মাঝে আমি আমার তানভীরকে খুঁজে বেড়াই।’
দুর্ঘটনায় নিহত সপ্তম শ্রেণির ইংলিশ ভার্সনের শিক্ষার্থী মাহতাব রহমানের পরিবারও এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। মাহতাবের বাবা মিনহাজ রহমান বলেন, ‘ছেলেটার পড়ার টেবিলটা এক বছর ধরে একইভাবে পড়ে আছে। বই সরেনি, খাতা সরেনি। প্রতিদিন ওর মা এসে বইগুলো মুছে দেয়, গুছিয়ে রাখে। মাহতাবকে ছাড়া আমরা কেউ ভালো নেই।’
নিহতদের মধ্যে ছিল চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ১০ বছরের তাসনিম আফরোজ আয়মান। সেদিন সকালের স্মৃতি এখনো তাড়া করে তার মা আয়েশা আক্তার কাননকে। তিনি বললেন, ‘মা হয়ে যদি জানতাম, ২১ তারিখ এমন ঘটনা ঘটবে, তাহলে তো স্কুলেই পাঠাতাম না।’
প্রসঙ্গক্রমে মাইলস্টোনের উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নুরুন নবী বলেন, দুর্ঘটনার পর বিমানবাহিনী ওই এলাকা থেকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সরিয়ে নিয়েছে। প্রশিক্ষণের জন্য যে যুদ্ধবিমান ছিল, সেটি এখন আর এখানে নেই।
যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। নিহতদের স্মৃতি সংরক্ষণে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ আগ্রহী। কিন্তু ঠিক কীভাবে তা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে আসেনি তারা।
ক্যাম্পাসে গেলে চোখে পড়ল ভবনটি ভাঙার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। চারদিকে উঁচু টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে কাঠামোটি। বাইরে থেকে খুব বেশি চোখে পড়ে না। ভবনটির দ্বিতীয় তলা ভাঙার কাজও প্রায় শেষের দিকে।
উপদেষ্টা নুরুন নবী বলেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নির্দেশনায় ভবনটি ভাঙা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘রাজউক থেকে আমাদের ভবনটি ভেঙে ফেলার জন্য বলা হয়েছে। তাই আমরা তা করছি। তবে স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আমরা কিছু একটা করার চেষ্টা করব। এখানে কী করা হবে, তার পরিকল্পনা এখনো করিনি।’
২১ জুলাইয়ের দুঃস্বপ্নের প্রেক্ষাপটে তাঁর শিক্ষায়তনের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলাম। নুরুন নবী বললেন, ‘বিমান দুর্ঘটনায় ১৭২ শিক্ষার্থী আহত হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন অন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে। বাকিরা আমাদের এখানেই পড়াশোনা করছে। আমরা নিয়মিত তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দেখভাল করছি। গত বছরের তুলনায় এ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী কমেনি।’








