বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর সোনারচর অভয়ারণ্যে বুনো মহিষ শিকার, জবাই ও পাচার থামছেই না। বন বিভাগের একের পর এক মামলা, অভিযান ও গ্রেফতারের পরও সংঘবদ্ধ চোর সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকাশ্যে আসা ঘটনার বাইরে আরও বহু শিকার ও পাচারের ঘটনা অজানাই থেকে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত সোনারচরকে ২০১১ সালের ২৪ ডিসেম্বর বন্যপ্রাণী ও পাখপাখালির অভয়ারণ্য ঘোষণা করে সরকার। দুই হাজার ২৬ দশমিক ৪৮ হেক্টর আয়তনের এ বনাঞ্চলে বর্তমানে বন বিভাগের হিসাবে ২০০ থেকে ২৫০টি বুনো মহিষ রয়েছে। তবে গত বছরের একটি মামলার এজাহারে এ সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০ উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে ধারাবাহিক শিকার ও পাচারের ঘটনায় মহিষের প্রকৃত সংখ্যা এবং ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্র ও বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সোনারচরের গভীর বনে ফাঁদ, রশি ও বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে বুনো মহিষ ধরে। পরে নির্জন স্থানে নিয়ে জবাই করে মাংস বিক্রি করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে জীবিত মহিষও পাচার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্গম চরাঞ্চল, সীমিত নজরদারি ও নদীপথের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বছরের পর বছর এ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে চক্রটি। সংশ্লিষ্টরা জানান, বন বিভাগের করা তিনটি মামলায় মোট ১৯ জনকে নামীয় আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামিও রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩ মার্চ বুনো মহিষ জবাই ও মাংস বিক্রির অভিযোগে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় একজনকে গ্রেফতার করে তার বাড়ি থেকে মহিষের মাংস ও চামড়ার অংশ উদ্ধার করা হয়। ২০২৬ সালের ২২ মার্চ ফাঁদ পেতে মহিষ শিকার ও মাংস পাচারের অভিযোগে আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। সর্বশেষ ৪ জুন মহিষের মাংসসহ একজনকে আটক করার ঘটনায় আরও তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েকজন আসামি স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের মধ্যে রয়েছেন-চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরআন্ডা ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইদ্রিস, যুবদলের বহিষ্কৃত সভাপতি কামাল শিকদার, স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি আমজাদ মল্লিক এবং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত সদস্য কাইয়ুম শিকদার। মামলার পর কামাল ও কাইয়ুমকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। বন বিভাগের সোনারচর ক্যাম্পের বিট কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ৫ আগস্টের পর চোরচক্রের তৎপরতা বেড়েছে। গত কয়েক মাসে তিনটি মামলা হয়েছে এবং টহল জোরদার করা হয়েছে। চরমোন্তাজ রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, দ্রুত বিচার ও সাজা নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ইউএনও নিরুপম মজুমদার বলেন, নতুন করে বুনো মহিষ চুরি ঠেকাতে বন বিভাগকে টহল বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শাহরিয়ার জামান বলেন, বুনো মহিষ এশিয়ার অন্যতম হুমকিগ্রস্ত বৃহৎ তৃণভোজী প্রাণী। সোনারচরে যদি মাত্র ২০০-২৫০টি মহিষ অবশিষ্ট থাকে, তাহলে অব্যাহত শিকার ও পাচার তাদের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য গুরুতর হুমকি। তাই নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জরিপ, জিপিএসভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং কঠোর অ্যান্টি-পোচিং ব্যবস্থা জরুরি।








