এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়াম আজ এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের অপেক্ষায়। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল, মুখোমুখি বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দুটি দল—ফ্রান্স ও স্পেন! যে দল আজ জিতবে, তারা ফাইনালে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড বা আর্জেন্টিনার। এখন প্রশ্ন হলো, হাইভোল্টেজ এই ম্যাচে ফেভারিট কে? কার হাতে উঠবে ফাইনালের টিকিট? চলো, এই দুই দলের শক্তি, দুর্বলতা এবং ট্যাকটিকস একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।

তুমি যদি ফ্রান্সের আক্রমণভাগের দিকে তাকাও, যেকোনো রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ের জন্য সেটা রীতিমতো এক দুঃস্বপ্ন! দিদিয়ে দেশম এই টুর্নামেন্টে এমন এক আক্রমণভাগ সাজিয়েছেন, যাকে আটকানো খুব কঠিন। কিলিয়ান এমবাপ্পে একাই করেছেন ৮ গোল, তাঁর সঙ্গে আছেন বিশ্বসেরা ফুটবলারের খেতাব জেতা উসমান দেম্বেলে। আর এই জুটির পেছনে জাদুকরের মতো খেলছেন মাইকেল ওলিসে। টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৫টি অ্যাসিস্ট তাঁর, নিখুঁত থ্রু বল বাড়িয়েছেন ১৪টি! সঙ্গে আছেন ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে জোড়া গোল করা তরুণ খেলোয়াড় দেসিরে দুয়ে।

বিশ্বকাপে দূর্দান্ত ফর্মে আছেন মাইকেল ওলিসে

অন্যদিকে, স্পেনের মূল শক্তি তাদের মাঝমাঠ এবং পাসিং ফুটবল। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এই বিশ্বকাপে গড়ে ৬৫.৮ শতাংশ সময় বল নিজেদের পায়ে রেখেছে। রদ্রি হলেন এই দলের আসল ইঞ্জিন। মাঝমাঠে খেলার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া থেকে শুরু করে বল হারালে আগ্রাসী প্রেসিং; সবই তিনি নিখুঁতভাবে করছেন। আর ডান প্রান্তে তো ১৯ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল আছেন। ডিফেন্সে কুকুরেয়া ও কুরবাসির তো আছেনই। সেই সঙ্গে গোলপোস্টে আছেন সিমন। এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৮ ম্যাচে মাত্র ১টি গোল হজম করেছে স্পেন। ফলে সিমনের ওপর ভরসা রাখাই যায়।

স্পেনের অন্যতম ভরসার নাম ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল

তা ছাড়া, ইতিহাস কিন্তু কিছুটা স্পেনের পক্ষেই কথা বলছে। এখন পর্যন্ত মুখোমুখি দেখায় স্পেনের ১৮ জয়ের বিপরীতে ফ্রান্স জিতেছে ১৩ বার। খুব বেশি পেছনে যাওয়ার দরকার নেই। গত বছর উয়েফা নেশনস লিগের রোমাঞ্চকর সেমিফাইনালে স্পেন ৫-৪ গোলে ফ্রান্সকে হারিয়েছিল। এর ঠিক ১১ মাস আগে, ২০২৪ সালের ইউরোর সেমিফাইনালেও ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল এই স্পেন।

তবে ফ্রান্স যে স্পেনকে ছাড় দেয়নি, তা-ও নয়। ২০২১ সালের নেশনস লিগ ফাইনালে ২-১ এবং ১৯৮৪ সালের ইউরো ফাইনালে ২-০ গোলে ফরাসিরাই জিতেছিল। আর বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের একমাত্র দেখা হয়েছিল ২০০৬ সালের শেষ ষোলোতে, যেখানে জিনেদিন জিদানের মাস্টারক্লাসে ফ্রান্স জিতেছিল ৩-১ গোলে।

কিন্তু সে তো ইতিহাস। বিশ্বকাপের এই আসরে কে কতটা দাপুটে? ফাইনালের আগে দুই দলের ফর্ম বিচার করলে ফ্রান্সকে একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে হবে। নকআউট পর্বে তারা এখনো কোনো গোল হজম করেনি। শেষ ৩২-এ সুইডেনকে ৩-০, শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়েকে ১-০ এবং কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়ে তারা এখানে এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ফ্রান্সকে এখনো খুব বড় কোনো কঠিন পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হয়নি।

অন্যদিকে স্পেনকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। নকআউট পর্বে পর্তুগালকে ১-০ এবং কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়েছে স্পেন। এই দুই ম্যাচে জয়গুলো এসেছে একেবারে শেষ মুহূর্তে, বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর জাদুতে।

বেলজিয়ামের বিপক্ষে মিকেল মেরিনোর শেষ মূহূর্তের গোলে জয় পেয়েছিল স্পেন

তাহলে আজকের ম্যাচে কী হবে? কে পাবে ফাইনালের টিকিট? সম্ভবত এই ম্যাচের ভাগ্য লেখা হবে কাউন্টার-অ্যাটাক এবং হাই-লাইন ডিফেন্সে।

ম্যাচের চিত্রনাট্য অনেকটা এমন হতে পারে—স্পেন বরাবরের মতোই বলের দখল নিজেদের কাছে রাখবে এবং ছোট ছোট পাসে ফ্রান্সের রক্ষণে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু এটাই হতে পারে স্পেনের জন্য সবচেয়ে বড় ফাঁদ! কারণ, এই বিশ্বকাপে ফ্রান্স আগের মতো শুধু রক্ষণাত্মক খেলছে না, তারা কাউন্টার-অ্যাটাকে রীতিমতো ভয়ংকর।

পরিসংখ্যান বলছে, এই টুর্নামেন্টে ফ্রান্স ইতিমধ্যেই ৩২টি ডিরেক্ট অ্যাটাক করেছে, যা তাদের গত চার আসরের চেয়ে অনেক বেশি। বল কেড়ে নেওয়ার পর ওলিসের থ্রু পাসে এমবাপ্পে বা দেম্বেলের স্প্রিন্ট রুখে দেওয়ার মতো ডিফেন্ডার স্পেনের আছে কি না, সেটাই বড় সন্দেহ। যদিও ওপরে কুকুরেয়া ও কুবারসির কথা বলেছি, কিন্তু স্পেনের ডিফেন্স লাইন সাধারণত বেশ ওপরে উঠে খেলে। এমবাপ্পের মতো গতি দানবকে সেই হাই-লাইনে জায়গা ছেড়ে দেওয়াটা হবে সবচেয়ে বড় ভুল।

এমবাপ্পে ও দেম্বেলে ফর্মে থাকলে বিপদে পড়তে পারে স্পেন

তবে স্পেনের ভরসার জায়গা তাদের কাউন্টার-প্রেসিং। বল হারানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রদ্রি, ইয়ামালরা যেভাবে প্রতিপক্ষকে ছেঁকে ধরে বল কেড়ে নেন, সেটা তারা নিখুঁতভাবে করতে পারলে ফরাসিরা প্রতি-আক্রমণের সুযোগই পাবে না। কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন অবশ্য লামিন ইয়ামালের ওপর বেশি নির্ভশীল ছিল। বারবার বল শুধু তাঁকেই দেওয়া হয়েছে গোল করার জন্য। আজও যদি সেই ট্যাকটিস ব্যবহার করে, তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

যাহোক, খুবই হাড্ডাহাড্ডি একটা ম্যাচ হতে যাচ্ছে। তবে সব দিক বিবেচনা করে আমি ফ্রান্সকেই কিছুটা এগিয়ে রাখব। এর দুটি মূল কারণ আছে। প্রথমত, নকআউট পর্বে স্পেনকে অনেক বেশি মানসিক ও শারীরিক শক্তি খরচ করতে হয়েছে, অন্যদিকে ফ্রান্স সেমিফাইনালে এসেছে বেশ ফুরফুরে মেজাজে। দ্বিতীয়ত, স্পেনের হাই-লাইন ডিফেন্স এখনো এমবাপ্পের গতির মতো কোনো বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি হয়নি।

স্পেনের মাঝমাঠের বড় ভরসার নাম রদ্রি

স্পেন যদি বলের দখল রাখার পাশাপাশি রদ্রির নেতৃত্বে ফ্রান্সের প্রতি-আক্রমণগুলো মাঝমাঠেই আটকে দিতে পারে, তবে স্প্যানিশরা টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোনো বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে চলে যাবে। কিন্তু সামান্য একটু ভুলেই ওলিসে-এমবাপ্পে জুটি স্পেনের রক্ষণভাগকে চোখের পলকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে।

যে দলই ফাইনালে যাক না কেন, আজ ডালাসের মাঠে পজেশন ফুটবলের সঙ্গে গতির এক চূড়ান্ত লড়াই হতে যাচ্ছে, এটা নিশ্চিত। একজন ফুটবল-ভক্ত হিসেবে এমন একটি নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল দ্বৈরথ দেখার জন্যই তো আমরা অপেক্ষা করে থাকি!

সূত্র: দ্য অ্যাথলেটিক