আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে। ব্যাংকারদের আশঙ্কা, পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় এ খাতে আগের মতো ঋণ বিতরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে, যার প্রভাব পড়তে পারে নতুন উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনে জানায়, ব্যাংকের আমানত ও ঋণের গড় সুদহারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। তবে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না। প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকেই এটি কার্যকর করা হয়েছে।
তবে ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, সুদহার নির্ধারণ একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা কমিটির (এএলকো) অনুমোদন ছাড়া তা পরিবর্তন করা যায় না। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা ব্যাংকগুলোর জন্য সহজ নয়।
ব্যাংক খাতের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এসএমই ঋণকে এই সীমার বাইরে রাখার অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিতে পারে।
এসএমই খাতে অন্যতম শীর্ষ ঋণদাতা ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, “সাধারণভাবে ব্যাংকের ব্যয় ও আয়ের অনুপাত ৪৫ শতাংশ হলেও সিএমএসএমই খাতে তা প্রায় ৬৫ শতাংশ। কারণ এই খাতে গ্রাহকসংখ্যা বেশি, ঋণের পরিমাণ ছোট এবং পরিচালন ব্যয়ও তুলনামূলক অনেক বেশি। তাই মাত্র ৪ শতাংশ স্প্রেডে এই খাতে কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হবে।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, “জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে ব্যাংকগুলোর গড় আমানত সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং গড় ঋণ সুদহার ছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ তখন গড় স্প্রেড ছিল ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা নতুন নির্ধারিত সীমার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত সুদহার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্র্যাক ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ এবং প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইউসিবি সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সুদে বিভিন্ন ধরনের ঋণ বিতরণ করছে। নতুন নির্দেশনা কার্যকর হলে এসব ব্যাংককে সুদহার কাঠামোয় বড় ধরনের সমন্বয় করতে হতে পারে।
এবিবির সাধারণ সম্পাদক ও ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী বলেন, “স্প্রেড কমিয়ে আনার উদ্যোগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঋণ ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে এর ফলে অনেক ব্যাংকের মুনাফা এবং পরিচালন সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা চালুর পর অনেক ব্যাংকে আমানতের তুলনায় ঋণের সুদহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এতে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ব্যবসা ও শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই স্প্রেড সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংকঋণের প্রায় ১৮ শতাংশ কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে বিতরণ হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৯ সালের মধ্যে এ হার ২৭ শতাংশে উন্নীত করা। তবে শিল্প মন্ত্রণালয় ও এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠান থাকলেও এর প্রায় ৬০ শতাংশ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকঋণের বাইরে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন সুদনীতি বাস্তবায়নের সময় এ বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।








