একটি মোটরসাইকেল কেনার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। কিন্তু নতুন মোটরসাইকেল কেনার সামর্থ্য সবার হয় না। তাই বলে কি স্বপ্ন থেমে থাকবে? একদমই নয়। যাদের নতুন বাইক কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের সেই স্বপ্ন পূরণের অন্যতম ভরসার নাম রাজধানীর মিরপুর-১৩-এর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের হাট।

প্রতি শুক্রবার দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা। কেউ আসেন নিজের প্রিয় মোটরসাইকেলটি বিক্রি করতে, কেউবা পুরোনো মোটরসাইকেলের বদলে নতুন একটি ব্যবহৃত বাইক নিয়ে ফিরতে, আবার কেউ খুঁজে নেন সাধ্যের মধ্যে ভালো মানের একটি মোটরসাইকেল। সাশ্রয়ী দামে মানসম্মত ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কেনাবেচা ও এক্সচেঞ্জের সুযোগ থাকায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই হাটটি হয়ে উঠেছে।

jagonewsহলিডে বাইক হাট থেকে ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ সোহেল রানা

মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ের সংলগ্ন এলাকায় বসে এই ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের হাট। কম বাজেটে ভালো মানের পুরোনো মোটরসাইকেলের খোঁজে থাকা মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই এটি একটি নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় গন্তব্য। শুধু ক্রেতা-বিক্রেতার মিলনমেলাই নয়, এই হাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নতুন উদ্যোক্তাদেরও একটি বড় পরিসর। অনেকেই এখান থেকে পুরোনো মোটরসাইকেল কিনে সংস্কার বা প্রয়োজনীয় কাজ শেষে আবার একই হাটে কিংবা অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রি করছেন। এভাবেই অনেকে এই মোটরসাইকেল কেনাবেচাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে সফলতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

এই হাটে প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন ব্র্যান্ড, মডেল ও দামের শত শত মোটরসাইকেল উঠে। অনেক বিক্রেতা সরাসরি মালিক হওয়ায় দরদামের সুযোগও থাকে। পাশাপাশি বিভিন্ন বাইকের শোরুমও এখানে তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল নিয়ে আসেন। এছাড়া হাটে কিনে বিক্রি করে এমন ব্যবসা করে এইসব মানুষের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি।

আরও পড়ুন

বর্ষায় যে ভুল করলেই বাইকের ইঞ্জিন নষ্ট হতে পারে

বাইকের মডেল, রেজিস্ট্রেশন, কাগজপত্র, মাইলেজ ও কন্ডিশনের ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করা হয়। হাট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে গাড়ির সব কিছু যাচাই করে সব তথ্য তালিকাভুক্ত করে এবং মোটরসাইকেলের গায়ে কাগজে লিখে রাখা হয়। এতে সহজেই সব কিছু ক্রেতা দেখতে পারেন। এখানে অনেক সময় বেশ পুরাতন মডেলের মোটরসাইকেলও ওঠে। এতে ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি মিলে।

অনেক বিক্রেতা পুরোনো মোটরসাইকেলের বিনিময়ে অন্য মডেলের ব্যবহৃত বাইক নেওয়ার সুযোগও দিয়ে থাকেন। ফলে অতিরিক্ত ঝামেলা ছাড়াই বাইক পরিবর্তন করতে পারেন ক্রেতারা। ছুটির দিনে এই হাট হওয়ার কারণে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি থাকে। এছাড়া অনেকেই বিভিন্ন মডেলের গাড়ি দেখতে ও ঘুরতে আসেন।

তবে কম দামের প্রলোভনে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কাগজপত্রের বৈধতা, মালিকানা এবং বাইকের যান্ত্রিক অবস্থা ভালোভাবে যাচাই করেই কেনার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

jagonewsহলিডে বাইক হাট থেকে ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ সোহেল রানা

হাটে কয়েকজন যুবক ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন মডেলের মোটরসাইকেল দেখতেছে এবং বিক্রেতার থেকে গাড়িটি নিয়ে নানা তথ্য শুনছেন। কাছে গিয়ে কথা হয় হয়, আল মামুন নামে এক যুবকের সঙ্গে। গাজীপুরের টঙ্গী থেকে আসছেন শখের জন্য মোটরসাইকেল কিনতে। গার্মেন্টসে চাকরি করেন। বাজেট দেড় লাখ।

তিনি বলেন, ‘অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল নিজের একটি মোটরসাইকেল থাকবে। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়েই আজ মোটরসাইকেল কিনতে এসেছি। আমার বাজেট দেড় লাখ টাকা। এই টাকা একদিনে জোগাড় হয়নি। চাকরির বেতনের টাকা থেকে একটু একটু করে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয় করেছি। আমার এই স্বপ্ন পূরণে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনও কিছু আর্থিক সহায়তা করেছেন। তাদের এই ভালোবাসা ও সহযোগিতার কারণেই আজ নিজের পছন্দের মোটরসাইকেল কেনার সাহস পেয়েছি। এমন একটি বাইক চাই, যা দেখতে সুন্দর, পারফরম্যান্স ভালো এবং দীর্ঘদিন নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যাবে।’

হাটে কথা হয় নাজমুল নামের আরেক চাকরিজীবীর সঙ্গে। তিনি থাকেন ঢাকার উত্তরা -১২ নম্বরে। তার অফিস ৩ নম্বরে। সঙ্গে একজনকে নিয়ে মোটরসাইকেল কিনতে এসেছেন। বাজেট এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। ফেসবুকের মাধ্যমে দেখে এই হাটে এসেছেন।

তিনি বলেন, ’আমার অফিস উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে, তাই প্রতিদিন নিয়মিত অফিসে যাতায়াত করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরেই ভাবছিলাম নিজের একটি মোটরসাইকেল কিনব, যাতে সময় বাঁচে এবং যাতায়াত আরও সহজ ও আরামদায়ক হয়। বাজেট ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। যেহেতু প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসার জন্য ব্যবহার করব, তাই বাইকটি যেন নির্ভরযোগ্য, জ্বালানি সাশ্রয়ী এবং দীর্ঘদিন ভালো সার্ভিস দেয়, সেটাই আমার প্রধান লক্ষ্য।

আরও পড়ুন

এক চার্জেই স্কুটার চলবে ১৫০ কিলোমিটারেরও বেশি

তিনি আরও বলেন, ‘আসলে এই হাটের কথা আমি ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পারি। সেখানে বিভিন্ন মোটরসাইকেলের ভিডিও এবং ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা দেখে আমার আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর ভাবলাম, নিজেই এসে মোটরসাইকেলগুলো দেখে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেব। তাই আজ সরাসরি এখানে চলে এসেছি।’

আল আমিন ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকেন। তিনি ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘আমার ব্যবসার কারণে প্রতিদিনই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শহরের বাইরেও যাতায়াত করতে হয়। আগের একটা মোটরসাইকেল ছিল তা নষ্ট হয়েছে। তাই আমি মিরপুরের পুরোনো মোটরসাইকেল হাটে এসেছি। আমার বাজেট এক লাখ টাকার কাছাকাছি। এই বাজেটের মধ্যে ভালো মানের, কাগজপত্র ঠিক আছে এবং ইঞ্জিন পারফরম্যান্স ভালো-এমন একটি মোটরসাইকেল খুঁজছি। তবে এই হাটে সরাসরি বিক্রেতার চেয়ে ব্যবসা করে এমন বিক্রেতাই বেশি। আমি সরাসরি ক্রেতার থেকে কেনার জন্য খোঁজতাছি এমন মোটরসাইকেল।’

হাটে ঘুরাঘুরির ফাঁকে কথা হয় হলিডে বাইক হাট নামের এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, যারা পুরোনো মোটরসাইকেলের হাট পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানের ইনচার্জ মেহেদী হাসান হিমেল। তিনি হাটের ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।

jagonewsহলিডে বাইক হাট থেকে ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ সোহেল রানা

তিনি বলেন, ‘আমাদের এই প্রতিষ্ঠান মূলত পুরোনো মোটরসাইকেলের একটি নির্ভরযোগ্য হাট পরিচালনা করে, যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা নিরাপদ এবং স্বচ্ছ পরিবেশে মোটরসাইকেল কেনাবেচা করতে পারেন।’

মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি, অনেক মানুষ ভালো মানের পুরোনো মোটরসাইকেল কিনতে আগ্রহী থাকলেও নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো হাট না থাকায় তাদের অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হতো। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হতো, কাগজপত্র নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকত, আবার অনেক সময় প্রতারণার ঝুঁকিও ছিল। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করেই আমরা ২০২৫ সালে হলিডে বাইক হাট প্রতিষ্ঠা করি। শুরুতে কম থাকলেও বর্তমানে হাটে একসঙ্গে শত শত মোটরসাইকেল দেখা যায়। ফলে একজন ক্রেতা একই জায়গায় বিভিন্ন ব্র্যান্ড, মডেল ও দামাদামি মোটরসাইকেল করে নিজের পছন্দ মতো বাইক কিনতে পারেন। এতে যেমন সময় বাঁচে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় হয়রানিও অনেক কমে যায়।’

‘আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা। কোনো মোটরসাইকেল হাটে আনার আগে আমরা এর রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা এবং প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করি। যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পরই মোটরসাইকেলটি আমাদের হাটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে ক্রেতারা অনেক বেশি আস্থা নিয়ে কেনাকাটা করতে পারেন।’

আরও পড়ুন

প্রায়ই বাইকে তেল নেওয়ার পরই আগুন লাগছে, সতর্ক হবেন যেভাবে

তিনি আরও বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের মাধ্যমে প্রায় ৭০০টি মোটরসাইকেল সফলভাবে কেনাবেচা হয়েছে। আমাদের সেবার বিনিময়ে মোটরসাইকেল বিক্রি সম্পন্ন হলে বিক্রেতার কাছ থেকে বিক্রয়মূল্যের ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। ক্রেতাদের কাছ থেকে এ ধরনের কোনো কমিশন নেওয়া হয় না।’

ক্রেতা ও বিক্রেতাদের আস্থা এবং ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। ভবিষ্যতেও আমরা আরও উন্নত সেবা, নিরাপদ পরিবেশ এবং স্বচ্ছ লেনদেন নিশ্চিত করে দেশের পুরোনো মোটরসাইকেল বাজারে একটি বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে যেতে চাই বলে জানান হলিডে বাইক হাটের ইনচার্জ।

কেএসকে