শুরুতেই টার্গেট করা হলে মেধা রাষ্ট্রীয় কাজে লাগাতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’- এ প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন। বিএসআরএফের সভাপতি মাসউদুল হকের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদলের সঞ্চালনায় এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
মীর শাহে আলম বলেন, ‘আমি তৃণমূল থেকে উঠে এসেছি, কিন্তু আমরা কাজ তো শুরু করেছি। আমাদের কাজ করবার যোগ্যতা আছে কি না, এটা তো কিছুদিন আপনাদের দেখতে হবে। শুরুতেই যদি আমাকে ধাক্কা মারা হয়, শুরুতেই যদি আমাকে টার্গেট করা হয়, তাহলে তো যেটুকু মেধা মহান আল্লাহ আমাকে দিয়েছে, আপনাদের চাইতে কম অথবা বেশি বা সমান, এটুকু মেধার বিকাশ তো আমি রাষ্ট্রীয় কাজে বা আমার মন্ত্রণালয়ে তো আমি দেখাতে পারব না। এটুকু সুযোগ তো আমাকে করে দিতে হবে কাজ করার।’
এলাকায় নিজের অর্থে নিজের নামের প্রতিষ্ঠান
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়নের ব্যাপারে আমার একটা পাগলামো রয়েছে। আমি এলাকার উন্নয়নের ব্যাপারে অনেক চেষ্টা করি, কাজ করি দীর্ঘদিন যাবৎ। আপনারা জানেন যে, এবার অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। আমি প্রথম চেয়ারম্যান হওয়ার পরে আমার গ্রামে কিন্তু প্রাইমারি স্কুল করি আমার নামে, ৯৭ সাল, যেটি এখন সরকারি।’
তিনি বলেন, ২০০৩ সালে কারিগরি শিক্ষাকে মাথায় রেখে আমি ‘মীর শাহ আলম কারিগরি স্কুল এবং কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করি। এরপর আমার নামে ওখানে কৃষি এবং মৎস্য কলেজ রয়েছে, আমার নামে মাদরাসা রয়েছে, আমার নামে ভেটেরিনারি স্কুল রয়েছে। এরপরে মোকামতলা নতুন উপজেলায় আমার নামে নতুন একটি কলেজ রয়েছে, আমার নামে শিবগঞ্জে আরেকটি কলেজ রয়েছে।
আরও পড়ুন
প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম / আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বন্ধু না, বিএনপির সাধারণ একজন কর্মী
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমি ১৯৯৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিজের সম্পত্তি, পৈতৃক সম্পত্তি দিয়ে, কোথাও সম্পত্তি ক্রয় করে, নিজের অর্থ দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করে দিয়ে, আস্তে আস্তে এই প্রতিষ্ঠানগুলো আমি দাঁড় করিয়েছি। এর মধ্যে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই আমি বিএনপি করার কারণে এমপিওভুক্ত হয়নি। নতুন করে সরকার আসার পরে আবেদন করেছি, চেষ্টা করছি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন এমপিওভুক্ত হয়। কারণ, দীর্ঘদিন এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বেতন পায়নি- কারণ হচ্ছে আমি।
ইচ্ছা ছিল ইতিহাসের পাতায় আমার নাম লেখা থাকবে
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘শিবগঞ্জ উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যে, মোকামতলায় একটি আলাদা উপজেলা করার। আমি এমপি এবং মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মাথায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর ডিও দিয়ে, দুই মাসের মাথায় বাংলাদেশের প্রথম যে পাঁচটি উপজেলা হয়- স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ওখানে দুটি, কক্সবাজারে একটি, লক্ষ্মীপুরে একটি এবং আমার নির্বাচনি এলাকায় একটি নতুন উপজেলা হয়- মোকামতলা উপজেলা। এই উপজেলা তো আজ হোক, কাল হোক- কেউ না কেউ করতোই। আমার ইচ্ছা ছিল যে, এটা আমার সময় যদি হয়, তাহলে ইতিহাসের পাতায় আমার নামটি লেখা থাকবে যে, আমার সময় শিবগঞ্জ ভেঙে নতুন একটি উপজেলা হয়েছে এবং এই ইতিহাসের সাক্ষী হবার কারণেই নতুন উপজেলা করা।’
মীর শাহে আলম আরও বলেন, ‘আমার উপজেলায় নতুন কিছু ইউনিয়ন ছিল, যেগুলো অনেক বড় বড় ইউনিয়ন, যে ইউনিয়নগুলোকে বিভক্ত করার প্রয়োজন ছিল। সেই ইউনিয়নগুলোকে আমরা বিভক্ত করেছি। আমি নতুন চারটি ইউনিয়ন তৈরি করেছি। ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে হয়তো অনেক প্রশ্ন ছিল, অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে, প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী তিনটি ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করে নতুন করে আবার ওই এলাকার জনগণ যেভাবে চাইছে, সেভাবে নামকরণের ব্যবস্থা হয়েছে।’
সংলাপে নানান বিষয়ে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম/ছবি: জাগো নিউজ
বগুড়া দীর্ঘদিন উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল দাবি করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বগুড়ার যেসব উন্নয়ন ঘাটতি ছিল, এগুলো পূরণ করবার জন্য আমি বগুড়ার মন্ত্রী হিসেবে একটু দৌড়াদৌড়ি করেছি, চেষ্টা করেছি। এটা তো স্বাভাবিক যে, আমি কোথাও গেলে, বললে আমাদের কাজটা হবে।’
পদ-পদবি না থাকলেও জাতীয় রাজনীতিতে অনেক কাজ করেছি
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ঠিক যে জাতীয় রাজনীতিতে আমার কোনো পদ-পদবি ছিল না। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে আমি অনেক কাজ করেছি। আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। আমার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলামের সঙ্গে আমি কাজ করেছি, রিজভী আহমেদের সঙ্গে আমি বহুবার কাজ করেছি এবং জাতীয় রাজনীতিতে আমি প্রকাশ্যে হোক, অপ্রকাশ্যে হোক, আমার বহু ভূমিকা ছিল। যেহেতু আমি ঢাকা শহরেই বসবাস করতাম, ঢাকা শহরই পরিবারসহ আমার বসবাস।’
হেয় করলে পরিবার নিতে পারে না
মীর শাহে আলম বলেন, ‘কয়দিন আগে একটা পত্রিকায় দেখলাম..., আমি ওই প্রসঙ্গে যেতে চাই না। কিছু নিউজ করা হয়, এগুলো আসলে হয় কী, আমরা মাঝে মাঝে হেয় প্রতিপন্ন হলে খুব একটা খারাপ লাগে না। কারণ রাজনীতি করি তো, সবাই আমাদের খুশি করবে তা না, কখনো গালি দেবে, কখনো ভালো বলবে। কিন্তু আমাদের সম্পর্কে নেগেটিভ কিছু গেলে এটা পরিবার নিতে পারে না, আত্মীয়-স্বজনের কাছে এটা খারাপ লাগে।’
আরও পড়ুন
এমপি শফিকুল ইসলাম / প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের বংশ-সন্তানের নামে ৩ ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আজ আমাদের সন্তানরা কিছু করলে এটা বিভিন্নভাবে সমালোচিত হয় এভাবে যে, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলেকে কেন ক্রিকেট বোর্ডে, সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলেকে কেন ক্রিকেট বোর্ডে বা মির্জা ফখরুল ইসলামের ভাই কেন ক্রিকেট বোর্ডে। আমার নিজের সন্তানও ক্রিকেট বোর্ডে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে এসেছিল। যখন সমালোচনা শুরু হয়েছে, আমার সন্তান আমার ওপর খুবই মন খারাপ করেছে। আমি তাকে ডেকে বুঝিয়ে বলেছি, বাবা এটা নিয়ে নানান কথা হবে, তোমার ব্যবসা-বাণিজ্য এখন অনেক দেখতে হবে, তুমি দয়া করে পদত্যাগ করো।’
‘যেদিন বোর্ডে নির্বাচিত হয়েছে, ফার্স্ট বোর্ড মিটিং করেছে, পরদিনই আমার কথামতো গিয়ে আমার ছেলে ক্রিকেট বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেছে। এই নিউজটা আপনারা কেউ হাইলাইট করেন না, যে একজন মন্ত্রী তার সন্তানকে ক্রিকেট বোর্ড থেকে সরিয়ে নিয়ে আসছেন।’
মীর শাহে আলম বলেন, ‘আমাদের সন্তানরা বিরোধীদলে থাকার সময় সরকারের রোষানলে পড়বে, আবার ক্ষমতায় আসার পর সমালোচকদের রোষানলে পড়বে; তাহলে এরা উচ্চ শিক্ষিত হয়ে, উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে, রাজনৈতিকভাবে, ব্যবসায়িকভাবে এরা মেধার বিকাশটা তাহলে ঘটাবে কোথায়? এরা সমাজে অবদানটা রাখবে কীভাবে? এই বিষয়গুলো মনে হয় আপনাদের নোটিশে আনা দরকার।’
নির্বাচনি হলকনামায় সম্পদের সব তথ্য আছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তাহলে সব হলফনামা আপনি হাইড করে একটা চিহ্নকে গোল চিহ্ন দিয়ে যদি বলেন যে, আমি প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর আমার সম্পত্তির পরিমাণ আটগুণ বেড়েছে, তখন কিন্তু কষ্ট লাগে।’
আরও পড়ুন
সন্তানদের নামে ইউনিয়নের নামকরণ করিনি, অলৌকিক মিলে গেছে: প্রতিমন্ত্রী
‘আপনি ওখানে সম্পত্তিতে দেখালেন ৩১ শতক, কিন্তু আমার হলফনামায় তো সম্পত্তি দেওয়া আছে এক হাজার ৮৩৫ শতক। তাহলে কোথায় এক হাজার ৮৩৫ শতক আর আপনি হাইলাইট করলেন ৩১ শতক। হ্যাঁ, আমার উপজেলায় আমি মন্ত্রী হওয়ার পর সম্পত্তি কেনা হয়েছে, এ তো আমি অস্বীকার করছি না। আমার কোম্পানির নামে সম্পত্তি আমার সন্তান কিনেছে। নতুন ইন্ডাস্ট্রি করার জন্য সম্পত্তি কেনার প্রয়োজন হলে সম্পত্তি কিনবে না? অবশ্যই কিনবে।’
রাজস্ব বোর্ড আয়ের উৎসের তদন্ত করুক
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব বোর্ড আয়ের উৎসের তদন্ত করুক, ‘কিন্তু সেটার আয়ের উৎসটা কী, সেটা আপনারা দেখেন। সেটা তদন্ত করুক, ট্যাক্স অফিস আছে, তারা দেখবে যে সেটা বৈধ না অবৈধ। ব্যক্তিগত নামে তো কোনো সম্পত্তি কেনা হয়নি; রূপসী রাইস এবং পুষ্টি মিলের নামে, ফাউন্ডেশনের নামে সম্পত্তি কেনা হচ্ছে; বিকজ, সেখানে আমরা নতুন ইন্ডাস্ট্রি করবো, নতুন ব্যবসা করবো। টাকার উৎস কী- যদি নগদে বলি, টাকার উৎস আমি যে ৪২ কোটি টাকা দিয়ে একটা অটো রাইস মিল বিক্রি করলাম, নগদ টাকার উৎস তো এখানেই বের হয়ে আসে। আমি অন্য জায়গায় না-ই গেলাম, আমার অন্যান্য ব্যবসাগুলো আমি বাদই দিলাম, এই যে আমার ১২-১৩টি ব্যবসা- এগুলো না হয় আমি বাদই দিলাম।’
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আমাকে ছাড়া সিদ্ধান্ত নেন না
মীর শাহে আলম বলেন, ‘আমি আমার মন্ত্রণালয়ে কাজ করছি, খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কারণ আমার সৌভাগ্য যে আমার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দলের মহাসচিব। উনি দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি, আমার পরম শ্রদ্ধেয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং শ্রদ্ধেয় স্যার কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত...। আমি বয়সে ওনার অনেক ছোট, নবীন হিসেবে উনি আমাকে ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। যে কোনো বিষয়ে উনি আমাকে ডাকেন অথবা খবর দেন, আমি গিয়ে ওনার কাছে বসলে উনি বলেন যে আমরা এটা এভাবে করতে চাচ্ছি, আমরা সমন্বিতভাবেই পরিচালনা করছি।’
‘আর আমার নিরাপত্তার জায়গাটা হচ্ছে- ফাইল স্বাক্ষরের শেষ জায়গা হচ্ছে মাননীয় মন্ত্রী। আর উনি হচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাহলে আমার নিরাপত্তা, আমার প্রোটেকশনের দেয়ালটা তো এখানে আছে, আমি তো ফাইনাল অথরিটি না আমার মন্ত্রণালয়ের। আমার পরও ফাইলটা তার কাছে যায়। যদি ওখানে কোনো অন্যায় থাকে, নেগেটিভ কিছু থাকে আমার স্বাক্ষরের পর, তাহলে তো মাননীয় মন্ত্রী সেটা ফেরত দিতে পারবেন বা ওটা এলাও করবেন না।’
প্রসঙ্গ: স্থানীয় সরকার নির্বাচন
স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরে নির্বাচন পরিচালনার জন্য এই বাজেটেও টাকা রাখা আছে জানিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে নির্বাচন কমিশনও স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি যেটি, তারা শুরু করেছে। সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, ইউনিয়ন- এই নির্বাচনগুলো করবার জন্য তারাও প্রাথমিক যে প্রস্তুতি তারাও শুরু করেছে। সবমিলিয়ে এই বছর সরকারের যেমন বড় একটি বাজেট বাস্তবায়নে একটা চ্যালেঞ্জ হবে, আমাদের সামনে নির্বাচনগুলো আসবে, এখানেও নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করবার জন্য সরকারের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ হয়েছে।’
আরএমএম/ইএ








