তালুত ও জালুত কে ছিলেন?

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা তালুত ও জালুতের যুদ্ধের গল্প বলেছেন। তালুত ছিলেন বনি ইসরাইলের বাদশাহ যাকে আল্লাহ তাআলা মনোনীত করেছিলেন। জালুত ছিলেন একজন জালিম পরাক্রমশালী বাদশাহ। এখানে আমরা সংক্ষেপে তালুত ও জালুতের পরিচয় তুলে ধরছি।

তালুত

তালুত ছিলেন আল্লাহর নবী ইয়াকুবের (আ.) ছেলে বিন ইয়ামিনের বংশধর। আল্লাহ তাআলা তাকে বনি ইসরাইলের বাদশাহ মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু বনি ইসরাইলের অনেকে  প্রথম দিকে তাকে বাদশাহ মেনে নিতে চায়নি। কারণ প্রথমত তালুত ছিলেন নবী ইয়াকুবের (আ.) ছেলে বিন ইয়ামিনের বংশধর আর বনি ইসরাইলে সাধারণত বাদশাহ হতো নবী ইয়াকুবের (আ.) আরেক ছেলে ইহুদার বংশধরদের মধ্য থেকে। দ্বিতীয়ত তালুত সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন না। কেউ কেউ বলেন, তিনি পানি বহনের কাজ করতেন; আবার কেউ কেউ বলেন, তিনি চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের (ট্যানিং) কাজ করতেন। (আল হিদায়া ইলা বুলুগিন নিহায়াহ)

আল্লাহ তাআলা বলেন, তাদের নবী বলল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য তালুতকে রাজারূপে পাঠিয়েছেন। তারা বলল, আমাদের ওপর কীভাবে তার রাজত্ব হবে, অথচ আমরা তার চেয়ে রাজত্বের অধিক হকদার? আর তাকে সম্পদের প্রাচুর্যও দেয়া হয়নি। সে বলল, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে তোমাদের ওপর মনোনীত করেছেন এবং তাকে জ্ঞানে ও দেহে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ যাকে চান, তাকে রাজত্ব দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। তাদেরকে তাদের নবী আরও বলল, তার রাজত্বের নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকট সিন্দুক আসবে, যাতে থাকবে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে প্রশান্তি এবং মুসার পরিবার ও হারুনের পরিবার যা রেখে গিয়েছে তার অবশিষ্ট, যা বহন করে আনবে ফেরেশতাগণ। নিশ্চয় তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য নিদর্শন, যদি তোমরা মুমিন হও। (সুরা বাকারা: ২৪৭-২৪৮)

জালুত

জালুত ছিলেন কাফের বাদশাহ যিনি অত্যন্ত অত্যাচারী ছিলেন। দৈত্যাকৃতি ও নৃশংসতার জন্য প্রস্ধি ছিলেন। বনি ইসরাইল তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল এবং তৎকালীন নবীর কাছে আবেদন করেছিল যেন আল্লাহ তাআলা একজন বাদশাহ নির্ধারণ করেন যার নেতৃত্বে তারা জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি কি মুসার পর বনি ইসরাইলের প্রধানদের ব্যাপারে জান? তারা তাদের নবীকে বলেছিল, আমাদের জন্য একজন রাজা পাঠান, তাহলে আমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করব’। সে বলল, এমন কি হবে যে, যদি তোমাদের ওপর লড়াই আবশ্যক করা হয়, তোমরা লড়াই করবে না? তারা বলল, আমরা কেন আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করব না, অথচ আমাদেরকে আমরা বিতাড়িত হয়েছি আমাদের ঘর-বাড়ি ও সন্তান-সন্ততি থেকে। তারপর যখন তাদের ওপর লড়াই আবশ্যক করা হল, তখন তাদের মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক ছাড়া তারা বিমুখ হল। আল্লাহ জালিমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত। (সুরা বাকারা: ২৪৬)

কোরআনের বর্ণনায় তালুত ও জালুতের লড়াই

আল্লাহ তাআলা বলেন, অতঃপর যখন তালুত সৈন্যবাহিনী নিয়ে বের হল, তখন সে বলল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করবেন। যে ওই নদী থেকে পানি পান করবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। আর যে পানি পান করবে না, সে আমার দলভুক্ত। তবে যে তার হাত দিয়ে এক আঁজলা পরিমাণ খাবে, সে ছাড়া; কিন্তু তাদের মধ্য থেকে স্বল্পসংখ্যক ছাড়া সবাই নদী থেকে পানি পান করল। তারপর যখন সে ও তার সঙ্গী মুমিনগণ নদী অতিক্রম করল, তারা বলল, আজ আমাদের জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর সাথে লড়াই করার ক্ষমতা নেই। যারা দৃঢ় ধারণা রাখত যে, তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, তারা বলল, কত ছোট দল আল্লাহর হুকুমে বড় দলকে পরাজিত করেছে! আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।

যখন তারা জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর মুখোমুখি হল, তারা বলল, হে আমাদের রব, আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন, আমাদের পা স্থির রাখুন এবং আমাদেরকে কাফের জাতির বিরুদ্ধে সাহায্য করুন।

তারপর তারা আল্লাহর হুকুমে জালুতের বাহিনীকে পরাজিত করল এবং দাউদ জালুতকে হত্যা করল। আর আল্লাহ দাউদকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করলেন এবং তাকে যা ইচ্ছা শিক্ষা দিলেন। আর আল্লাহ যদি মানুষের কতককে কতকের দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে অবশ্যই পৃথিবী বিপর্যস্ত হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ বিশ্ববাসীর ওপর অনুগ্রহশীল।

(সুরা বাকারা: ২৪৯-২৫১)

নবী দাউদ (আ.) কীভাবে জালুতকে হত্যা করলেন?

বাদশাহ তালুতের সাথে যে মুমিন সৈন্যরা নদী পার হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে আল্লাহর নবী দাউদের (আ.) বাবা ঈশাও ছিলেন এবং তার সঙ্গে ছিলেন দাউদসহ তার ১৩ জন ছেলে।

দুই বাহিনী মুখোমুখি হলে জালুত চিৎকার করে তালুতের বাহিনীর কাউকে তার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানালেন। তিনি বললেন, তালুতের বাহিনীর কেউ তার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে বিজয়ী হলে তিনি রাজত্ব ছেড়ে দেবেন। তালুত তার বাহিনীতে ঘোষণা দিলেন, যে ব্যক্তি জালুতকে হত্যা করতে পারবে, তিনি নিজের মেয়েকে তার সঙ্গে বিয়ে দেবেন এবং রাজত্বের অর্ধেকও তাকে দান করবেন।

তখন অল্পবয়সী দাউদ (আ.) অসীম সাহসিকতায় দৈত্যাকৃতির জালুতের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন এবং জালুতকে হত্যা করলেন। (আত-তাফসিরুল কাবির লিত-তাবরানি)

ওএফএফ