বৃষ্টি চলছে তো চলছেই। থামার কোনো লক্ষণ নেই। অব্যাহত ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সমুদ্র উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার। দুর্গত মানুষদের জন্য খোলা হয়েছে ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র।

বন্যার পানিতে ঘেরা নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চকরিয়ার বরইতলী এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম। তিনি বলেন, “জীবনে এমন বন্যা দেখিনি। ভোরের আগে হঠাৎ পানি ঘরে ঢুকে পড়ে। কিছুই সরানোর সুযোগ পাইনি। বিছানা, আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, রান্নার জিনিসপত্র সব নষ্ট হয়ে গেছে। দুই দিন ধরে রান্না করতে পারিনি। রান্নাঘর পানির নিচে। অসুস্থ বৃদ্ধ মাকে হাসপাতালে নিতে পারছি না। কারণ, সব সড়ক ডুবে গেছে।”

একই চিত্র পেকুয়ার রাজাখালী ইউনিয়নের বিধবা হালিমা বেগমের জীবনেও। তিন সন্তানকে নিয়ে দুই রাত ধরে প্রতিবেশীর উঁচু বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

হালিমা বলেন, “প্রাণে বেঁচে গেছি। কিন্তু, ঘরের সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটছে। বাচ্চারা বারবার জানতে চায়, কবে বাড়ি ফিরব? কিন্তু, আমার কাছে কোনো উত্তর নেই।”

মাতামুহুরী উপজেলার আবদুল জলিল বলেন, “চারদিকে শুধু পানি আর পানি। বাজারে যেতে পারছি না, হাসপাতালে যেতে পারছি না, আত্মীয়ের বাড়িতেও যেতে পারছি না। জীবনে এমন দুর্ভোগ দেখিনি।”

চকরিয়া পৌরসভার বাঁশঘাটা গ্রামের আনোয়ারা বেগম বলেন, “মাতামুহুরী নদীতে আমার শত বছরের বসতভিটা বিলীন হয়ে গেছে। এখন মাথা গোঁজারও কোনো ঠাঁই নেই।”

এমন অসংখ্য পরিবারের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকা।

জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ভারী বৃষ্টিতে কক্সবাজারের ১০ উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ৫ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

বন্যাদুর্গত উপজেলার মধ্যে রয়েছে— কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও।

শত শত বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সড়ক ডুবে যাওয়ায় রোগীরা হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছেন না। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা।

পেকুয়ার রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন মাছের ঘের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দেওয়ায় জলাবদ্ধতা আরও বেড়েছে।

পেকুয়ার বামুলাপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, “শুধু সন্তানদের বাঁচাতে পেরেছি। সবকিছু পানির নিচে। খাবারও প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু ত্রাণের অপেক্ষায় আছি।”

নূরজাহান বেগম বলেন, “রান্না করতে পারছি না, বিশুদ্ধ পানির সংকট। বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। শুধু চাই পানি নেমে যাক।”

চকরিয়ার কাকারা, ফাঁসিয়াখালী, লক্ষ্মীছড়া, করাইয়াঘোনা, বোমুবিলছড়ি এবং পৌরসভার একাধিক ওয়ার্ডেও পানি ঢুকে পড়েছে। বন্যার পানিতে চকরিয়া সরকারি কলেজও প্লাবিত হয়েছে। শ্রেণিকক্ষ ও প্রশাসনিক ভবনে হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার জানান, দুই উপজেলায় ১ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৬০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে শুকনো খাবার ও জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, গত দুই দিনে দুই উপজেলায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে দুইজন এবং বন্যার পানিতে ভেসে দুইজন মারা গেছেন। শুক্রবার চকরিয়ার বরইতলী এলাকায় বন্যার পানিতে ভেসে একজন নিখোঁজ হয়েছেন।

পেকুয়ার উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ ও ২৭-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র সহকারী সচিব খানজাদা শাহরিয়ার জানান, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা ১০০টি রোহিঙ্গা পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজার শহরের কলাতলী, সুগন্ধা, হোটেল-মোটেল জোন, বাজারঘাটা, তারাবনিয়ার ছড়া, আলীর জাহাল ও বাস টার্মিনাল এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে। অল্প বৃষ্টিতেই এসব এলাকায় সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।

বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পেও। টানা বৃষ্টি ও উত্তাল সাগরের কারণে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত কার্যত পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। সৈকতকেন্দ্রিক শত শত দোকান, রেস্তোরাঁ ও পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ বা সীমিত আকারে চলছে। ফলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে হোটেল-রিসোর্ট মালিক পর্যন্ত সবাই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

মেরিন ড্রাইভ-কলাতলী হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানান, টানা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কক্সবাজার-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছে। গত চার দিনে জেলার পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে প্রায় ৬০ হাজার পর্যটকের রুম বুকিং বাতিল হয়েছে। বর্তমানে অবস্থানরত প্রায় ১০ হাজার পর্যটকের অনেকেই নির্ধারিত সময়ের আগেই কক্সবাজার ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেছেন, “গত চার দিনের বৈরী আবহাওয়ায় পর্যটকের আগমন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ পুরো পর্যটন শিল্পে।” 

তার দাবি, মাত্র চার দিনেই কক্সবাজারে পর্যটন খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

সাগর উত্তাল থাকার কারণে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে টানা সপ্তম দিনের মতো সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। একইভাবে কক্সবাজার-মহেশখালী ও পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌরুটেও চলাচল বন্ধ থাকায় হাজারো যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন।

উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমায় পানি নামতে শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্র থেকে নিজ নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করলেও পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকায় সব লার্নিং সেন্টার, মক্তব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে পৃথক পাহাড়ধসে অন্তত ১৩ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। ঝুঁকি না কমা পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, জেলার বিভিন্ন স্থানে ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রয়েছে এবং অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানিয়েছেন, শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৭১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও লঘুচাপের প্রভাবে আরো দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি জানান, সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে।