কাজের প্রচণ্ড চাপ, পড়াশোনা বা শুধু স্ক্রল করে সময় কাটানোর কারণে আমরা অনেকেই নিজের ঘুমের সময়টা অবলীলায় কমিয়ে ফেলি। আর এখন তো বিশ্বকাপের সিজন, রাত জাগতেই হয়। কিন্তু রাত জেগে খেলা দেখার পরদিন সকালে হয়তো এক মগ কড়া কফি খেয়ে ক্লান্তি কাটানোর চেষ্টা করেন আপনি। কিন্তু আপনার এই ছোট একটি অভ্যাস শরীরের ভেতরে প্রতিদিন কী ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন আনছে, তার হিসাব কি রাখেন?

সম্প্রতি চিকিৎসাবিজ্ঞানবিষয়ক বিখ্যাত জার্নাল অ্যানালস অব ইন্টারনাল মেডিসিন-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা ঠিক এই জায়গাতেই আলো ফেলেছে। সেখানে দেখা গেছে, প্রতিদিন রাতের ঘুম থেকে মাত্র ৯০ মিনিট সময় কাটছাঁট করলে আপনার ওজন নীরবে বাড়তে শুরু করে। শুধু তা-ই নয়, ঘুম কম হলে আপনার ভেতরে অলসতা ভর করে এবং আপনি আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় নিষ্ক্রিয় বা বসে কাটাতে শুরু করেন।

ঘুমের সঙ্গে শরীরের ওজন এবং মেদ জমার সম্পর্ক নিয়ে আগেও অনেক গবেষণা হয়েছে। কিন্তু আগের সেই গবেষণাগুলোর একটি বড় দুর্বলতা ছিল। সেগুলো মূলত ল্যাবরেটরি বা গবেষণাগারের চার দেয়ালের ভেতরে করা হতো। অংশগ্রহণকারীদের হয়তো তিন বা চার দিনের জন্য ল্যাবে আটকে রেখে রাতে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমাতে দেওয়া হতো। কিন্তু বাস্তব জীবনে তো আর মানুষ এভাবে ল্যাবে বন্দি থেকে হঠাৎ করে ঘুম অর্ধেক কমিয়ে দেয় না!

৪৫ মিনিটের ঘুম মস্তিষ্কের শেখার ক্ষমতা বাড়ায়
হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতিদিন অংশগ্রহণকারীরা গড়ে ১৭ মিনিট বেশি সময় বসে কাটিয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ এবং মেনোপজ হয়ে যাওয়া নারীদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে খারাপ।

এবারের গবেষণাটি তাই একেবারেই আলাদা এবং বাস্তবসম্মত। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি আরভিং মেডিকেল সেন্টারের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও এই গবেষণার প্রধান লেখক মেরি-পিয়েরে সেন্ট-অঞ্জ ঠিক এই বিষয়টিতেই জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, ল্যাবের সেই অল্প কয়েক দিনের চরম ঘুমহীনতার পরীক্ষা আসলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আসল চিত্র তুলে ধরে না। কারণ বাস্তব জীবনে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষই দীর্ঘমেয়াদি মৃদু ঘুমহীনতায় ভোগেন। অর্থাৎ, তারা হয়তো প্রতিদিন এক বা দেড় ঘণ্টা করে ঘুম কমাচ্ছেন, আর সেটি দিনের পর দিন মাসের পর মাস ধরে চলছে। এই গবেষণায় ঠিক সেই বাস্তব পরিস্থিতিটাই তৈরি করা হয়েছিল ল্যাবরেটরির বাইরে, একেবারে স্বাভাবিক জীবনে।

এই অভিনব গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন ৯৫ জন মানুষ। এরা সবাই আগে স্বাভাবিক নিয়মে রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমাতেন। কিন্তু পরীক্ষার খাতিরে টানা ছয় সপ্তাহ ধরে তাদের রাতের ঘুম থেকে ঠিক দেড় ঘণ্টা সময় কেটে নেওয়া হলো।

ফলাফল কী দাঁড়াল? টানা ছয় সপ্তাহ এই মৃদু ঘুমহীনতার ভেতর দিয়ে যাওয়ার পর দেখা গেল, অংশগ্রহণকারীদের ওজন গড়ে প্রায় ৪৫০ গ্রাম বেড়ে গেছে। ঘুম কম হওয়ার কারণে তাদের শরীর ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে তারা আগের চেয়ে শারীরিক নড়াচড়া কমিয়ে দিয়েছেন। হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতিদিন তারা গড়ে ১৭ মিনিট বেশি সময় বসে কাটিয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ এবং মেনোপজ হয়ে যাওয়া নারীদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে খারাপ। অলসতা বা ক্লান্তি তাদের ওপর এতটাই ভর করেছিল যে, তারা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ মিনিট অতিরিক্ত সময় শুধু বসে বসেই কাটিয়ে দিয়েছেন।

নিজের নাক ডাকার শব্দে নিজের ঘুম ভাঙে না কেন
টানা ছয় সপ্তাহ এই মৃদু ঘুমহীনতার ভেতর দিয়ে যাওয়ার পর দেখা গেল, অংশগ্রহণকারীদের ওজন গড়ে প্রায় ৪৫০ গ্রাম বেড়ে গেছে। ঘুম কম হওয়ার কারণে তাদের শরীর ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।

আপনি হয়তো ভাবছেন, ছয় সপ্তাহে মাত্র এক পাউন্ড বা ৪৫০ গ্রাম ওজন বাড়া এমন আর কী বড় বিষয়! কিন্তু হিসাবটা একটু দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা করে দেখুন। কানাডার চিলড্রেনস হসপিটাল অব ইস্টার্ন ওন্টারিওর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী জ্যঁ-ফিলিপ চ্যাপুট এই গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও, তিনি এর ভয়াবহ দিকটি ধরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, ছয় সপ্তাহে এক পাউন্ড ওজন খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ যদি এই একই নিয়মে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কম ঘুমাতে থাকেন এবং বসে বসে সময় কাটান, তবে এক বা দুই বছর পর এই ওজনের কাঁটা কোথায় গিয়ে ঠেকবে?

আর ওজন বাড়া মানেই তো শুধু দেখতে মোটা হওয়া নয়। অধ্যাপক সেন্ট-অঞ্জ এবং তাঁর দলের করা আলাদা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ক্ষেত্রে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদ্‌রোগের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। যারা বসে বসে সময় বেশি কাটান বা সেডেন্টারি লাইফস্টাইল মেনে চলেন, এমনিতেই তাদের দীর্ঘমেয়াদি নানা অসুখে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা অনেক বেশি থাকে। তার ওপর যদি ঘুমের ঘাটতি থাকে, তবে সেটি আগুনে ঘি ঢালার মতোই কাজ করে।

রাতে টিভি দেখলে কি ঘুম কমে যায়
অধ্যাপক সেন্ট-অঞ্জ এবং তাঁর দলের করা আলাদা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ক্ষেত্রে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদ্‌রোগের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

ঘুম কম হলে যে স্বাস্থ্য যে খারাপ হয়, তা তো এবার হাতেনাতে প্রমাণিত হলো। কিন্তু অধ্যাপক সেন্ট-অঞ্জ তাঁর ভবিষ্যতের গবেষণার জন্য আরও একটু ভিন্ন পথে হাঁটতে চান। তিনি বলেন, ‘আপনি ঘুম কমিয়ে দিলে যে আপনার স্বাস্থ্যের খারাপ পরিণতি হবে, সেটা বলা খুব সহজ। কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্য তো শুধু খারাপ কিছু করে তার নেতিবাচক ফলাফল দেখা নয়।’

তাঁর মতে, এখন যেহেতু আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে অল্প ঘুম আমাদের শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তাই এরপর আমাদের দেখা উচিত পর্যাপ্ত ঘুম আমাদের শরীরের কতটা উন্নতি করতে পারে। জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ভালো কিছু করা এবং তার ইতিবাচক ফলটুকু উপভোগ করা। তাই আজ রাত থেকে ওয়েব সিরিজের পরের পর্ব কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার অহেতুক স্ক্রলিং বাদ দিয়ে নিজের ওই মহামূল্যবান দেড় ঘণ্টা ঘুমের দিকে একটু মনোযোগ দিন। এতে আপনার শরীর নামে মেশিনটা ভালো থাকবে।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

ঘুম নিয়ে আমাদের যত ভুল ধারণা