‘স্মার্ট হোটেল ও রিসোর্ট বুকিং প্রজেক্ট’ হলো তাদের প্রধান এবং সবচেয়ে বড় প্রতারণার হাতিয়ার। যেখানে তারা দাবি করছে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট এবং সাজেকের বড় বড় অভিজাত হোটেল ও রিসোর্টের সঙ্গে তাদের চুক্তি রয়েছে। প্রতিবেদকের মতো গ্রাহকদের বলা হচ্ছে, এই বুকিং প্রজেক্টের ‘এজেন্টশিপ’ নিলে পর্যটন মৌসুমের পুরো লভ্যাংশ এজেন্টদের মাঝে বণ্টন করা হবে। অথচ এই নাম দিয়ে তারা লাখ লাখ টাকা অগ্রিম বুকিং বা জামানত হিসাবে নিয়ে নিচ্ছে।

গ্রাম ও মফস্বল অঞ্চলের মানুষের জন্য তারা সাজিয়েছে ‘রেন্ট-এ-কার এবং অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক প্রজেক্ট’। তাদের দাবি, সারা দেশে তাদের নিজস্ব কয়েক হাজার প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস এবং জরুরি অ্যাম্বুলেন্সের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে। এই প্রজেক্টে বিনিয়োগ করলে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘ফিক্সড প্রফিট’ বা মাসিক বেতন দেওয়ারও আশ্বাস মিলছে। এছাড়া ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং মধ্যবিত্তদের টার্গেট করে তারা ‘এয়ার টিকিট ও হজ-ওমরাহ প্যাকেজ প্রজেক্ট’ চালু করেছে। যেখানে বলা হচ্ছে-অতিথি ডটকমের মাধ্যমে ওমরাহ প্যাকেজ বুকিং দিলে বিশাল ছাড় পাওয়া যাবে। এই ট্রাভেল উইং-এ বিনিয়োগ করলে সারা বছর টিকিট বিক্রির লভ্যাংশ থেকে মুনাফা দেওয়া হবে।

এছাড়া তরুণদের ফাঁদে ফেলতে সাইফুল চক্র সামনে রেখেছে নতুন নতুন প্রলোভন। এর একটি হলো-‘ডিজিটাল ট্রেনিং ও আইটি একাডেমি প্রজেক্ট’। তারা অ্যাপ চালনা এবং ডিজিটাল মার্কেটিং শেখানোর নামে ‘এজেন্ট ট্রেনিং ফি’ বাবদ বাধ্যতামূলকভাবে টাকা আদায় করছে। বলা হচ্ছে, এই ট্রেনিং শেষ করলেই আইটি প্রজেক্টের অংশ হিসাবে ঘরে বসে প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করার গ্যারান্টি রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডেসটিনির সময় যেমন ‘গাছ’ দেখিয়ে, নোভেরা প্রোডাক্টসের সময় যেমন ‘কসমেটিকস ও ফুড সাপ্লিমেন্ট’ দেখিয়ে টাকা নেওয়া হয়েছিল, ঠিক একইভাবে সাইফুল ইসলাম সোহেল এবার ‘ডিজিটাল বুকিং ও ট্রাভেল প্রজেক্ট’ দেখিয়ে মানুষের পকেট কাটছেন। তবে একটু খোলা চোখে দেখলেই বোঝা যায়, বাস্তবে এই প্রজেক্টগুলোর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি ভিত্তি নেই। এটি সম্পূর্ণ একটি ‘মানি সার্কুলেশন’ বা অর্থ পাচারের খেলা, যেখানে নতুনদের টাকা দিয়ে পুরোনোদের সামান্য কিছু কমিশন দেওয়া হয়। মূলত এভাবে বিশ্বাস অর্জন করা হয় এবং শেষ মুহূর্তে পুরো টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার নীলনকশা সাজানো হয়।

অনুসন্ধান চলাকালীন সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু সদস্য প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা এই প্রতারণার বিষয়ে ভয়াবহ তথ্য প্রদান করেন। সংশ্লিষ্ট সদস্যদের মধ্যে আশিকুজ্জামান, কামরুল ইসলাম, রিফাত খান এবং নাইম ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, অ্যাপের সেবাগুলো মূলত লোক দেখানো। নতুন মেম্বার বা এজেন্ট ঢুকিয়ে তাদের বিনিয়োগ করা টাকা থেকেই পুরোনোদের কমিশন দেওয়া হয়। তারা আরও জানান, উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হলেও এখন সেই টাকা ফেরত পাওয়া বা প্রতিশ্রুত সেবা পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। চেইন বজায় রাখতে না পারলে লভ্যাংশ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিনিয়োগ করা আসল টাকাও আটকে যায়।

তাদের আরেকটি প্রজেক্ট হলো নতুন ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা তৈরি করা। এ লক্ষ্যে নতুন উদ্যোক্তা হতে একজনকে সর্বনিম্ন তিন লাখ ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের পাশে প্রস্তাবিত অতিথি রিসোর্ট অ্যান্ড থিম পার্কের একটি শেয়ার বাবদ এই টাকা দিতে হচ্ছে তাদের। প্রকল্পটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উদ্যোক্তাদের দুই হাজার ৫০০ টাকার বিনিময়ে বাধ্যতামূলকভাবে ট্রেনিং নিতে হয়। নতুন এজেন্ট ও উদ্যোক্তা কীভাবে তৈরি করতে হবে তা ট্রেনিংয়ে শেখানো হয়। এভাবে যে যত বেশি এজেন্ট/উদ্যোক্তা নিয়োগ করাতে পারবেন, তিনি তত বেশি বোনাস ও পুরস্কার পাবেন। অতিথি ডটকমে উদ্যোক্তারা নতুন গ্রাহক সৃষ্টি করতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে পাবেন আট হাজার টাকা বোনাস এবং রাইসকুকার। তিনজন গ্রাহক সৃষ্টি করতে পারলে পাওয়া যাবে ওয়াশিং মেশিন।

বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের পাশে অতিথি রিসোর্ট অ্যান্ড থিম পার্ক প্রকল্পে শেয়ার রয়েছে ৪৭ হাজার। এর মধ্যে ২০ হাজার শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিটি শেয়ার তিন লাখ ১০ হাজার টাকা করে ১৭ হাজার শেয়ার বিক্রি হয়ে গেছে। সে হিসাবে ১৭ হাজার শেয়ারের দাম ৫২৭ কোটি টাকা। বিনিয়োগকারীরা অবিশ্বাস্য হারে মুনাফাও পাচ্ছেন। আবার অ্যাপস বিক্রি করেও বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছে কোম্পানিটি। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, যদি কোনো কারণে এই প্রতারক চক্র পাততাড়ি গুটিয়ে সটকে পড়ে তাহলে সাধারণ মানুষের শেয়ার কেনার বিপুল অঙ্কের টাকা ঝুঁকিতে পড়বে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলার ঘনশ্যামপুর এলাকায় নির্মাণ করা হবে এই রিসোর্ট। সেখানে অতিথি ডটকমের নামে মাত্র ৩৫ বিঘা জমি ক্রয় করা হয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য ২৫ কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্বজিত গুহ এবং মশিউর রহমান নামে আরও দুই ব্যক্তি সাইফুল ইসলাম সোহেলের প্রতারণা মামলার কেইস পার্টনার। ডেসটিনি ও নোভেরা চ্যাপ্টারের পর সাইফুলের ডিজিটাল রূপান্তরের পেছনে বিশ্বজিত গুহ এবং মশিউর রহমানের হাত রয়েছে বলে জানা যায়। তাদের নিখুঁত পরিকল্পনায় ‘অতিথি ডটকম’ অ্যাপটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে এটি কোনোভাবেই প্রাথমিক দৃষ্টিতে এমএলএম মনে না হয়। সাজানো অ্যাপটির টার্গেট গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষিত বেকার যুবকরা। ডিজিটাল ট্রেডিং এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির কাল্পনিক প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে জামানত বাবদ। তবে নানা অজুহাতে কোন গ্রাহক কী পরিমাণ জামানত দিচ্ছেন সেটি স্পষ্ট করে কাউকেই জানানো হচ্ছে না। এখানেই তাদের ফাঁকফোকর। এই ফাঁক গলিয়েই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক প্রতিষ্ঠানটি। সেই সঙ্গে হাই প্রোফাইল লোকজনদের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিয়ে নিজেকে করেছেন সুরক্ষিত। এ কারণেই তারা বরাবরই থেকে যাচ্ছেন অধরা। এছাড়া কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন তার জেল পার্টনার প্রতারক এমএলএম কোম্পানি নভেরা প্রডাক্টসের দুই পরিচালক বিশ্বজিত গুহ ও মশিউর রহমান। এর সঙ্গে আরও আছেন পুলিশের সাবেক ডিআইজি লায়ন খান সাঈদ হাসান, ডিআইজি আব্দুল জলিল (গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) লায়ন এসএম ফেরদৌস, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) লায়ন আব্দুল হান্নান, সাবেক দুদক পরিচালক তালেবুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব আলী আহম্মেদ মাহমুদ, পুলিশ সুপার নুরুন্নবী মৃধা, খাদ্য বিভাগের ডিসি ড. সিরাজুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার ওয়াহেদুর রহমান, চৌধুরী গ্রুপ অব কোম্পানির এমডি লায়ন নজরুল ইসলাম ও ব্যবসায়ী এসএম শাহীন প্রমুখ। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, সাবেক এসব প্রভাবশালী কর্মকর্তা হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এ সাইনবোর্ডকে কাজে লাগিয়ে তারা বিভিন্ন উপায়ে অর্থ উপার্জন করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। বিপরীতে তাদের ফেসকে ব্যবহার করে অতিথি ডটকম নামের এই এমএলএম কোম্পানিটি বিস্তার লাভ করেছে।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে সাবেক সরকারের আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় একজন নেতার হাত ধরেই গুলশানের লেকশোর হোটেলে যাত্রা শুরু করে এই প্রতারক প্রতিষ্ঠান অতিথি ডটকম।